হৃদয়ভাঙা এক হার—আর্জেন্টিনার সৌদি–বিপর্যয়কে বর্ণনা করা যায় এই বাক্য দিয়েই। যে দল টানা ৩৬ ম্যাচে অপরাজিত থেকে আকাশসম আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাতারে এসেছে, যে দল ১৯৮৬ সালের পর আবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর, সেই দলই সৌদি আরবের বিপক্ষে এক হারের পরই অনিশ্চয়তার চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে। বিশ্বকাপ দূরের কথা, প্রথম রাউন্ডের বাধা পেরোনোই এখন কঠিন এক পরীক্ষা।

ঠিক এ সময় মেসি, দি মারিয়া, আনহেল কোরেয়া, লাওতারো মার্তিনেজ, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, মার্কোস আকুনিয়া, নিকোলাস তালিয়াফিকোদের পরস্পরের হাত ধরে থাকতে হবে শক্ত করে। আর এই অনিশ্চয়তার চোরাবালি থেকে আর্জেন্টিনা দলকে টেনে তুলতে আরও একটি হাত থাকছেই। সেটি ‘ঈশ্বরের হাত’ নয়, ম্যারাডোনার অপার্থিব হাত। যে দেশের ফুটবলের সঙ্গে ব্যক্তি ম্যারাডোনা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে, সেই দেশের ফুটবল অনিশ্চয়তা আর বিপর্যয়ের সময় তাঁর পরম্পরাকে আঁকড়ে ধরবে না, এটা হতেই পারে না।

মেসি তো আরও বেশি করে ম্যারাডোনার দিকে তাকাবেন এ সময়। ১৯৯০ ইতালি বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা নিজেও যে আর্জেন্টিনা দলকে নিয়ে এমন একটা বিন্দুতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ৩২ বছর আগে মিলানের সান সিরোতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ খেলতে নেমে আর্জেন্টিনা আচমকা হেরে বসল ক্যামেরুনের কাছে। এবারের সৌদি আরবের বিপক্ষে হারের মতোই—ম্যাচের আগে কেউই ভাবতে পারেননি ম্যারাডোনা, ক্যানিজিয়া, বুরুচাগা, বাতিস্তা, ভালদানোদের আর্জেন্টিনা ক্যামেরুনের মতো অখ্যাত ফুটবল–শক্তির কাছে হেরে যাবে।

কিন্তু সেই ম্যাচ হারার পরও আর্জেন্টিনা পরের রাউন্ডে তো গিয়েছিলই, দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিল, কোয়ার্টার ফাইনালে যুগোস্লাভিয়া আর সেমিতে ইতালিকে হারিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপার খুব কাছে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য জার্মানির বিপক্ষে পেনাল্টি গোলে হেরে তা হয়নি, সে না–ই হতে পারে। কিন্তু ১৯৯০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সেই প্রায় অসম্ভবের পথে যাত্রাটা তো আর হালকা কিছু নয়! সেই সংগ্রামের গল্পটা তো আর ফেলনা নয়, ২০২২ সালে মেসির আর্জেন্টিনা সেই সংগ্রামের গল্পকেই তো কৌশলের রসদ বানাবে। সেই রসদের বিরাট একটা অংশই যে ম্যারাডোনা।

আচ্ছা, ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ম্যারাডোনা যদি দূরলোকের বাসিন্দা না হতেন, তা হলে ম্যারাডোনা নিশ্চয়ই গত ২২ নভেম্বর সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচটি গ্যালারিতে হইহই করতে করতেই উপভোগ করতেন!

দল হেরে যাওয়ার পর তাঁর মন খারাপ হতো। তিনি হয়তো আবেগের বশে অনেক কিছুই বলতেন। মেসি–স্কালোনিদের মুণ্ডুপাতও করতেন। সৌদিদের হাইলাইন ডিফেন্সের কৌশলে স্কালোনি কেন ‘ধরা’ খেলেন, কেন আর্জেন্টিনা কোচ সেই কৌশলকে পাশ কাটাতে পাল্টা কিছু দিতে পারলেন না, সেসব বিষয় নিশ্চয়ই সাংবাদিকেরা ম্যারাডোনার কাছে জানতে চাইতেন! ম্যারাডোনাও নিশ্চয়ই মিডিয়াতে ঝড় তোলা সব বক্তব্য রাখতেন। সাংবাদিকেরাও খুব ব্যস্ত সময় কাটাতেন।

মেসি বা স্কালোনি যে ম্যারাডোনাকে ফোন দিতেন না, সেটি কে বলতে পারবে! তখন হয়তো ম্যারাডোনা হয়ে পড়তেন স্নেহশীল। নিজের চোখের দেখা থেকে পরামর্শ দিতের আর্জেন্টিনা থিংক ট্যাংককে। মেক্সিকো বা পোল্যান্ড ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনা ম্যারাডোনার শরণাপন্ন হতেই পারত। কিন্তু দুই বছর আগের এক রাত এসবের কিছুই হতে দেয়নি।

১৯৯০ বিশ্বকাপজয়ী জার্মান অধিনায়ক লোথার ম্যাথাউস কিছু দিন আগে এক টুইটে আক্ষেপ করে ম্যারাডোনার স্মৃতি স্মরণ করে লিখেছিলেন, ‘এই প্রথম বিশ্বকাপে তুমি নেই।’ মেসি এমন কিছু লেখেননি, কিন্তু এটা তো তাঁরও মনের কথা। তবে তিনি সৌদি আরব ম্যাচের আগেই বলে দিয়েছিলেন, ‘ম্যারাডোনা আমাদের সঙ্গে সব সময়ই আছেন।’

শনিবার রাতে লুসাইলে মেক্সিকো আর্জেন্টিনা দলকে নিয়ে কৌশল সাজাবে। কিন্তু সেটি তো রক্ত–মাংসের আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের শক্তি–দুর্বলতা বিচার করে। কিন্তু তাঁদের অদৃশ্য শক্তি, অদৃশ্য প্রেরণাকে কীভাবে সামাল দেবে মেক্সিকো! ম্যারাডোনার কিংবদন্তি যে আর্জেন্টিনার জন্য বাড়তি কিছু নিয়ে অপেক্ষা করে সব সময়ই। ম্যারাডোনা না থেকেও থাকেন তাদের সঙ্গে। তিনি না থেকেও আর্জেন্টিনা দলের কোচ, অধিনায়ক, ম্যানেজার অনেক কিছুই হয়ে ওঠেন। হয়তো সামনের দিনগুলোতেও হবেন।