এক ‘স্মার্ট বলে’ই হয়ে যাবে ভিএআরের কাজ

ইংল্যান্ডের ফুটবলে লিগে স্মার্ট বল ব্যবহার হবে। ছবিটি প্রতীকীরয়টার্স

ফুটবল তো ফুটবলই, সেখানে ‘স্মার্ট বল’ আবার কী জিনিস?

আসলে দেখতে ফুটবলই। পার্থক্যটা প্রযুক্তিতে। আধুনিক প্রযুক্তির সমাহার রয়েছে এই বলে। ইংল্যান্ডে মেয়েদের শীর্ষ লিগে ২০২৬–২৭ মৌসুম থেকে এই স্মার্ট বল ব্যবহার করা হবে। বিশ্বের প্রথম ফুটবল লিগ হিসেবে আধুনিক প্রযুক্তির স্মার্ট বল ব্যবহার করা হবে উইমেনস সুপার লিগে (ডব্লিউএসএল)।

এই বলের মাধ্যমে দল ও খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের বিস্তারিত উপাত্ত (ডেটা) পাওয়া যাবে। পাশাপাশি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) মতো প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে রেফারিদের সাহায্য করতে পারবে এই স্মার্ট বল।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস জানিয়েছে, বর্তমানে ডব্লিউএসএলের দলগুলো অনুশীলনে বিশেষ এই বল পরীক্ষা করে দেখছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী মৌসুম থেকে লিগের প্রতিটি ম্যাচে বলটি ব্যবহার করা হবে।

‘স্পোর্টেবল’ নামে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এই বল তৈরি করেছে। লন্ডনভিত্তিক এই ক্রীড়া প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মূলত রিয়েল টাইম ট্র্যাকিং এবং ‘কানেক্টেড বল’ প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য বিশ্লেষণে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। ফিফা স্বীকৃত এই প্রতিষ্ঠান এই খাতে বর্তমানে শীর্ষস্থানীয়।

স্পোর্টেবল ছেলে ও মেয়েদের ছয় জাতি রাগবি টুর্নামেন্টের সঙ্গে কাজ করছে। দ্য টাইমস জানিয়েছে, এই প্রতিষ্ঠান নাইকি এবং ডব্লিউএসএলের সঙ্গে চার বছরের একটি চুক্তি সই করেছে।

স্মার্ট বল কী

ফিফা অনুমোদিত এই কানেক্টেড বলের ভেতরে থাকবে পেটেন্ট করা বিশেষ সেন্সর। এ ছাড়া খেলোয়াড়দের জন্য থাকছে পরিধানযোগ্য সেন্সর ও জিপিএস সুবিধা, যা অনায়াসেই স্পোর্টস–ব্রার সঙ্গে সেট করে নেওয়া যাবে। মাঠের চারপাশে বসানো ১২ থেকে ১৬টি হালকা ওজনের বিকন বা সংকেতযন্ত্রের মাধ্যমে খেলোয়াড় ও বলের গতিবিধির সরাসরি ত্রিমাত্রিক ম্যাপ তৈরি করা সম্ভব হবে।

স্পোর্টেবল জানিয়েছে, তাদের প্রযুক্তিতে বলের গতি, ঘূর্ণন, গতিপথ এবং খেলোয়াড়দের শারীরিক পরিশ্রমের সব তথ্য মাত্র ৮০০ মিলি সেকেন্ডের কম সময়ে বিশ্লেষণের জন্য তৈরি করা যায়। প্রতিষ্ঠানটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি এসব তথ্য সরাসরি সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে; যা খেলোয়াড়, কোচ, ম্যাচ অফিশিয়াল ও সম্প্রচারকারীদের কাজে লাগে।

নারী ফুটবলে সঠিক তথ্যের অভাব নিয়ে খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকেই প্রায়ই অভিযোগ শোনা যায়। এর বড় কারণ হলো, তথ্যভিত্তিক অধিকাংশ প্রযুক্তি ব্যবস্থা যেমন অত্যন্ত ব্যয়বহুল, তেমনি এগুলো স্থাপন করার প্রক্রিয়াও বেশ জটিল।

তবে স্পোর্টেবলের সেন্সরভিত্তিক এই প্রযুক্তি ব্যবস্থাটি মাত্র দুটি স্যুটকেসে বহন করা যায়। এটি তারহীন হওয়ার সুবিধা হলো, যেসব দলের একাধিক নিজস্ব মাঠ রয়েছে, তারা সহজেই এটি ব্যবহার করতে পারবে। যেমন চেলসি নারী দল তাদের লিগ ম্যাচগুলো কিংসমিডো ও স্টামফোর্ড ব্রিজে খেলে। ফলে এই প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ এবং ম্যাচে পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব।

যুগান্তকারী পদক্ষেপ

স্পোর্টেবলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ডুগাল্ড ম্যাকডোনাল্ড দ্য টাইমসকে বলেন, ‘ডব্লিউএসএলে যা ঘটছে, তা এক অনন্য নজির। আগে এ ধরনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হতো বিচ্ছিন্নভাবে। হয় শুধু অনুশীলনে করা যেত, অথবা ম্যাচে সামান্য করা গেলেও অনুশীলনে সুযোগ ছিল না। কিন্তু স্পোর্টেবল, নাইকি ও ডব্লিউএসএল যা করছে, তা দলের সামগ্রিক দক্ষতা, কৌশল ও শারীরিক সক্ষমতার তথ্যের সমন্বয়ে ক্রীড়াবিশ্বে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।’

২০১৫ সালে নাসার সাবেক প্রকৌশলী পিটার হিউজমেয়ারকে সঙ্গে নিয়ে স্পোর্টেবল প্রতিষ্ঠা করেন ম্যাকডোনাল্ড। তিনি জানান, প্রযুক্তিটি ম্যাচ অফিশিয়াল বা রেফারিদেরও সাহায্য করবে। বর্তমানে ডব্লিউএসএলে গোললাইন প্রযুক্তি কিংবা ভিএআর প্রযুক্তি নেই এবং রেফারিরাও সেখানে পূর্ণকালীন নন।

ম্যাকডোনাল্ড বলেন, ‘আমরা খুব সহজেই ফুটবল মাঠে ভিএআরের মতো নিখুঁত স্বচ্ছতা নিয়ে আসতে পারি। যখন বল ও খেলোয়াড়কে ট্র্যাক করা সম্ভব হয়, তখন অফসাইড ধরা সহজ হয়। বল গোললাইন অতিক্রম করেছে কি না, সেটিও নির্ভুলভাবে বলা সম্ভব। এমনকি আমাদের প্রযুক্তিতে বলের ঘূর্ণন পরিবর্তন হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়, যা দিয়ে হ্যান্ডবল শনাক্ত করা যাবে।’

আরও পড়ুন

দ্য টাইমস জানিয়েছে, প্রযুক্তির এই বিশেষ দিকটি আগামী মৌসুমেই চালু হচ্ছে না। এটি রাখা হয়েছে ভবিষ্যতের জন্য। ম্যাকডোনাল্ডের মতে, মূলত এ উদ্ভাবনী সম্ভাবনাগুলোই ডব্লিউএসএলের জন্য এ অংশীদারত্বকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

ম্যাকডোনাল্ড একটু সতর্কও। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের পক্ষ থেকে সতর্কতাও আছে। আমরা চাইছি অন্তত এক মৌসুমের তথ্য হাতে আসার পর সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে। পুরো এক মৌসুমের তথ্য পর্যালোচনার পর আমরা রেফারিদের সঙ্গে কথা বলতে পারব। তাদের দেখানো যাবে যে প্রযুক্তি বলছে, বল লাইন অতিক্রম করেছে। তখন তাদের মতামত নিয়ে আমরা অভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব। একবার সেটি হয়ে গেলে প্রযুক্তি মাঠের খেলারই একটি অংশ হয়ে যাবে।’

যেসব দল ইতিমধ্যে অনুশীলনে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, তারা থ্রো-ইনসহ মাঠের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতির প্রমাণ পেয়েছে। বিশেষ করে রক্ষণভাগ সামলানো এবং পাল্টা আক্রমণের সময় নির্ধারণে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ বেশ কাজে দিচ্ছে। এ ছাড়া ম্যাচ সম্প্রচার এবং দর্শকদের অভিজ্ঞতায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করতেও এই প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

ম্যাকডোনাল্ড বলেন, ‘আমরা কর্নার কিক বা পেনাল্টি শুট-আউটের ত্রিমাত্রিক ভিজ্যুয়ালাইজেশন চালু করতে যাচ্ছি। এর মাধ্যমে দেখা যাবে ঠিক কীভাবে সাফল্য, কেন ব্যর্থতা। এরপর সেখানে আমরা তথ্য বিশ্লেষণ যোগ করব, যার ফলে মাঠের কোন জায়গা থেকে ফ্রি কিক নিলে গোল হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু, সেটিও নিখুঁতভাবে বলা সম্ভব হবে।’

আরও পড়ুন