বিশ্বকাপের আগে কেন এত চোটে পড়ছেন খেলোয়াড়েরা
কারও বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। কারও আবার মৌসুম শেষ, শঙ্কা আছে বিশ্বকাপে খেলা নিয়েও। কেউ আবার পড়ছেন ছোটখাটো চোটে, তবু বিশ্বকাপ নিয়ে শঙ্কাটা থাকছেই। চোট কাটিয়ে বিশ্বকাপে গিয়ে চেনা ছন্দ ফিরে পাবেন তো?
মোটকথা, আগামী ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপের আগে খেলোয়াড়দের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার নাম এখন চোট।
রদ্রিগোর বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে আগেই। সার্জ নাবরিরও হেঁটেছেন সে পথে। লামিনে ইয়ামাল ও এস্তেভাওয়ের মৌসুম শেষ। আরদা গুলের ও এদের মিলিতাওকেও চলতি মৌসুমে আর মাঠে দেখা যাবে না। তারকাদের পাশাপাশি আর্জেন্টাইন দুই তরুণ হুয়ান ফয়েথ ও ভ্যালেন্তিন কার্বৌনিরও চোটে পড়ে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয়েছে। নতুন করে চোটে পড়ায় শঙ্কা আছে ভিতর রকের বিশ্বকাপে খেলা নিয়েও। সর্বশেষ গত পরশু রাতে চোটে পড়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। তাঁর চোট কতটা গুরুতর, তা অবশ্য এখনো জানা যায়নি। টুর্নামেন্ট শুরু হতে বাকি ৪৬ দিন। লিগ মৌসুম এখনো শেষ হয়নি, চোটের মিছিল তাই আরও দীর্ঘ হওয়াটাই স্বাভাবিক।
প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বকাপের আগে কেন এত চোটে পড়ছেন খেলোয়াড়েরা?
দায় কি শুধু ভাগ্যের
ভিনিসিয়ুস সুজা ব্রাজিলের ন্যাশনাল সোসাইটি অব স্পোর্টস ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড ফিজিক্যাল অ্যাকটিভিটি (সোনাফে ব্রাজিল) সেন্টারের স্পোর্টস ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ। তাঁর মতে, বিশ্বকাপের আগে খেলোয়াড়দের এই চোটের মিছিল আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত খেলার ভয়াবহ প্রভাব।
সুজার মতে, বিশ্বকাপের আগে খেলোয়াড়দের বিশ্রাম ও শরীর পুনরুদ্ধারের সময়কে ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনে ঘরোয়া ও অন্যান্য প্রতিযোগিতার ঠাসা সূচি। মানুষের শরীরের সহনশীলতার যেহেতু একটা সীমা আছে, তাই যখন ঘন ঘন ম্যাচের কারণে শরীরের কোষগুলো আবার সতেজ হওয়ার সময় পায় না, তখন অ্যাথলেটরা একধরনের দীর্ঘস্থায়ী অবসাদের (রেসিডুয়াল ফ্যাটিগ) শিকার হন। এর সঙ্গে পুরোনো চোটের ইতিহাস যোগ হয়ে ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়, কারণ একবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া টিস্যুগুলো প্রচণ্ড চাপের মুখে আবারও ভেঙে পড়ার প্রবল ঝুঁকিতে থাকে।
সুজার মতে, ঠাসা সূচির এই প্রেক্ষাপটে বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফুটবলারদের মধ্যে ‘হ্যামস্ট্রিং’য়ের চোট সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। দ্রুত দৌড়ানো কিংবা হুট করে গতি কমানোর ক্ষেত্রে মাংসপেশিই প্রধান ভূমিকা রাখে। আধুনিক ফুটবলে যেহেতু খুব অল্প সময়ে বারবার স্প্রিন্ট দিতে হয়, তাই পেশির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে ও স্নায়বিক ক্লান্তির কারণে শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়েরা এই চোটে পড়েন।
সুজার এই ব্যাখ্যার পক্ষে একটি উদাহরণও দেওয়া যায়। চলতি মৌসুমে বার্সেলোনাতে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির স্পষ্ট ধারা দেখা যাচ্ছে। ইয়ামাল, রাফিনিয়া, পেদ্রি, ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং, আলেহান্দ্রো বালদে, এরিক গার্সিয়া, রবার্ট লেভানডফস্কি ও ফেরান তোরেস—তাঁরা সবাই ২০২৫–২৬ মৌসুমে হ্যামস্ট্রিং চোটে পড়েছেন।
দুই তরুণ তারকা এস্তেভাও ও ইয়ামালের চোটে পড়ার কারণ হিসেবে তাঁদের শারীরিক অপরিপক্বতা এবং অতিরিক্ত ম্যাচ খেলাকে সামনে টেনে আনেন সুজা। তাঁর মতে, মাংসপেশির চোট নিরাময়ে যে সময় প্রয়োজন, সেখানে সংক্ষিপ্ত পথ খোঁজার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের মতে, শরীরে অতিরিক্ত চাপের অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট।
এসিএল চোটের অভিশাপ
মাঠে অতিরিক্ত ‘ওয়ার্কলোড’ই শুধু খেলোয়াড়দের দুশ্চিন্তার কারণ নয়, ম্যাচে দ্রুতগতি ও ঠাসা সূচিও চোটের ওপর চরম প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে মাঠ খারাপ হয়ে যাওয়া। পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব ও অনুশীলনের প্রচণ্ড চাপের কারণে খেলোয়াড়দের পক্ষে মাঠের লড়াইয়ে শতভাগ ফিট থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে হাঁটুতে চোট, বিশেষ করে এসিএল (অ্যান্টেরিয়র ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট) বা ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে রদ্রিগো এই ভয়াবহ চোটের শিকার হয়েছেন, আর আর্জেন্টিনার অনুশীলনে একই ধরনের চোটে পড়েন হোয়াকিন পানিচেল্লি। তালিকায় আরও আছেন পোর্তোর সামু আঘেহাওয়া, মোনাকোর তাকুমি মিনামিনো ও মোহাম্মদ সালিসু।
এ ধরনের চোট নিরাময়ে সাধারণত দ্রুত অস্ত্রোপচার এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের প্রয়োজন হয়, যা বিশ্বকাপের আগে দলগুলোর প্রস্তুতিকে আরও জটিল করে তুলবে। হাঁটুর চোটের ক্রমবর্ধমান হার বুঝিয়ে দিচ্ছে, আধুনিক ফুটবলের দাবি মেটাতে গিয়ে খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা কতটা নাজুক হয়ে পড়েছে।
শারীরিক সক্ষমতার শেষ সীমায় ফুটবলাররা
মাঠে খেলোয়াড়দের মাংসপেশির চোট এখন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দল থেকে ছিটকে যাচ্ছেন তারকারা। সার্জ নাবরির ঘটনাই এর বড় উদাহরণ—রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ম্যাচে চোট পেয়ে বায়ার্ন তারকার বিশ্বকাপ স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। লামিনে ইয়ামাল ও এস্তেভাওয়ের তরুণ শরীরেও ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, যা বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে তাঁদের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে।
চোটের এই থাবা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না গোলকিপাররাও। আলিসন বেকার ও মার্ক-আন্দ্রে টের স্টেগেন লড়াই করছেন ফিটনেস ফিরে পেতে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, পুরো সুস্থ হওয়ার আগেই মাঠে ফেরার চাপ বা তাড়াহুড়া পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে হ্যামস্ট্রিং ছিঁড়ে যাওয়া। ফুটবলে বর্তমান সূচি ও ব্যবস্থাপনা খেলোয়াড়দের শারীরিক সহনশীলতার সীমাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তা এতে স্পষ্ট।
ক্লাব ফুটবলের চাপ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। টটেনহামের আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর পরিস্থিতি এর একটি বড় দৃষ্টান্ত। অবনমনের শঙ্কায় থাকা ক্লাবের প্রয়োজন বনাম জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে রোমেরোর মতো পিষ্ট হয়েছেন বা হচ্ছেন অনেকেই। চোটে পড়া রোমেরোকে এখন বিশ্বকাপের আগে ফিট হয়ে ওঠার কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে।
রোমেরোদের এই তালিকা বেশ দীর্ঘ—মিকেল মেরিনো লড়ছেন স্ট্রেস ফ্র্যাকচারের সঙ্গে, ইয়োস্কো গাভারদিওল ভুগছেন পা ভাঙা নিয়ে, রোমেলু লুকাকুর হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট এবং মাতিয়াস ডি লিটের পিঠে সমস্যা তাঁদের বিশ্বকাপে খেলাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
যে বিশ্বকাপটি অন্যতম রোমাঞ্চকর হওয়ার কথা ছিল, তা এখন চোটের কালো মেঘে ঢাকা পড়ছে। আধুনিক ফুটবলের এই হাড়ভাঙা খাটুনি খেলোয়াড়দের শরীরকে এমন এক জায়গায় নিয়ে ঠেকিয়েছে, যা আগে কখনো দেখা গিয়েছে কি না, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে।