এস্তেভাওয়ের চোটে কি নেইমারের বিশ্বকাপে খেলার দরজা খুলল
বিশ্বকাপের আগে শেষ আন্তর্জাতিক উইন্ডোটা ব্রাজিলের জন্য অনেকটাই ছিল এক পা পিছিয়ে দেড় পা এগিয়ে যাওয়ার মতো।
ম্যাসাচুসেটসে ফ্রান্সের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে ২-১ গোলের হারে বেশ হতাশ করে কার্লো আনচেলত্তির দল। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে অনেকটা সময় ফ্রান্স ১০ জন নিয়ে খেললেও তার সুবিধা নিতে পারেনি ব্রাজিল। ছয় দিন পর ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ব্রাজিলের ৩-১ গোলের জয়টি স্বস্তির মনে হলেও মাঠের পারফরম্যান্স ছিল মিশ্র। স্কোরলাইন যতটা দাপুটে দেখাচ্ছে, ব্রাজিলের খেলা ততটা নিখুঁত ছিল না।
তবে এই প্রীতি ম্যাচগুলোর ইতিবাচক দিক হলো কয়েকজন খেলোয়াড়ের ব্যাপারে ব্রাজিল কোচ আনচেলত্তির দ্বিধার অবসান ঘটেছে। বোতাফোগোর মিডফিল্ডার দানিলো দুর্দান্ত খেলায় ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলে তাঁর জায়গা প্রায় নিশ্চিত। জুভেন্টাস সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার ব্রেমার ও জেনিত সেন্ট পিটার্সবার্গের লেফট ব্যাক দগলাস সান্তোসও ব্রাজিল দলে অবস্থান পাকা করেছেন।
জাতীয় দলের মিশন শেষে খেলোয়াড়েরা ক্লাবে ফিরেছেন। ওদিকে বিশ্বকাপের জন্য ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দলে অন্তত ২২ জনের বিষয়ে মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছেন আনচেলত্তি। আরও দুজন—এনদ্রিক এবং ইগর থিয়াগোও মোটামুটি নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে গতকালই বড় এক ধাক্কা খেয়েছেন আনচেলত্তি। হ্যামস্ট্রিংয়ের গুরুতর চোটে পড়েছেন চেলসির ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার এস্তেভাও। তাঁর বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ না হয়ে গেলেও ব্যাপারটি সুতোর ওপর ঝুলছে।
গত মার্চে এসিএল চোটে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়েন ব্রাজিল তারকা রদ্রিগো। আনচেলত্তির দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত এই খেলোয়াড় বেশ কিছুদিন ধরেই ছন্দে ছিলেন না। কিন্তু এস্তেভাওকে হারানো হবে ব্রাজিলের জন্য বড় এক ক্ষতি। ১৮ বছর বয়সী এই তরুণ গত এক বছরে ‘সেলেসাও’দের হয়ে আলো ছড়িয়েছেন, মাঠের ডান প্রান্তে তাঁর গতি ও ধারাল আক্রমণ দলের বড় ভরসা হয়ে উঠেছিল। আনচেলত্তির অধীনে এখন পর্যন্ত ব্রাজিলের হয়ে সর্বোচ্চ ৫টি গোলও তাঁর। ফলে তাঁর অনুপস্থিতি দলে বড় এক শূন্যতা তৈরি করবে।
এস্তেভাওকে না পেলে আনচেলত্তিকে তাঁর শুরুর একাদশে বড় পরিবর্তন আনতে হবে। সে ক্ষেত্রে রাফিনিয়া চলে যেতে পারেন ডান প্রান্তে। বাঁ দিকে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র আর মাতেউস কুনিয়ার ওপরে দেখা যেতে পারে জোয়াও পেদ্রোকে। তবে আনচেলত্তি যদি ভিনিসিয়ুসকে আগের মতোই মাঝমাঠের কেন্দ্রবিন্দুতে খেলাতে চান, তাহলে বাঁ প্রান্তের দায়িত্ব পড়তে পারে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির কাঁধে। আরেকটি পথও খোলা আছে—আক্রমণভাগে বাকি চারজনকে ঠিক রেখে আনচেলত্তি দলে নিতে পারেন লুইস এনরিকেকে। জেনিতের ২৫ বছর বয়সী এই উইঙ্গার জাতীয় দলের হয়ে নিজের ১৩ ম্যাচে বারবার নজর কেড়েছেন।
৩৪ বছর বয়সী নেইমার ২০২৬ মৌসুমে সান্তোসের প্রথম ১০ ম্যাচেই খেলতে পারেননি। মাঠে ফিরেছেন ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে। এরপর তাঁর পারফরম্যান্সে একমাত্র যে বিষয়টি নিয়মিত দেখা গেছে, তা হলো—অধারাবাহিকতা।
দলে এস্তেভাওয়ের বিকল্প হতে পারেন বোর্নমাউথের রায়ান। এ ছাড়া লুকাস পাকেতা ও রিচার্লিসনও বিবেচনায় আছেন, যদিও গত কয়েক মাসে জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার লড়াইয়ে তাঁরা কিছুটা পিছিয়ে পড়েছেন।
এরপরও একজনকে ঘিরে একটি বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে এবং তাঁকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায়ও নেই। নেইমার!
নেইমারকে নিয়ে অন্তহীন নাটক যেন শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। আগামী ১৮ মে আনচেলত্তি ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণা না করা পর্যন্ত কিংবা পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার আগপর্যন্ত (যেটি আগে ঘটে) এই বিতর্ক চলবেই।
সান্তোসে ফেরার পর নেইমারের প্রথম মৌসুমটা ছিল অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা। চোটের কারণে ১৭ ম্যাচ খেলতে পারেননি, সঙ্গে ছিল মাঠের বাইরের কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডও। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে; মৌসুমে শেষ দিকে একের পর এক ম্যাচজয়ী পারফরম্যান্স দিয়ে সান্তোসকে অবনমন থেকে টেনে তোলেন এই নেইমারই।
নেইমার গত বছরের শেষটা করেছিলেন হাঁটুর অস্ত্রোপচার দিয়ে। গত জানুয়ারিতে সান্তোসের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর পর বলেছিলেন, ‘যে স্বপ্নগুলো এখনো সত্যি হয়নি, আমি এখন সেগুলোর পেছনে ছুটতে চাই।’
বিশ্বকাপের দল ঘোষণা করার আগে নেইমার বড়জোর ৬টি ক্লাব ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবেন। প্রস্তুতির জন্য এ সময়টা বড্ড কম। যদি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে এস্তেভাও চোটে না পড়তেন, তবে হয়তো নেইমারকে বাতিলের খাতায় ফেলাই যেত।
৩৪ বছর বয়সী নেইমার ২০২৬ মৌসুমে সান্তোসের প্রথম ১০ ম্যাচেই খেলতে পারেননি। মাঠে ফিরেছেন ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে। এরপর তাঁর পারফরম্যান্সে একমাত্র যে বিষয়টি নিয়মিত দেখা গেছে, তা হলো—অধারাবাহিকতা।
ভাস্কো দা গামার বিপক্ষে জোড়া গোল করেন নেইমার, এর মধ্যে দ্বিতীয় গোলটি ছিল অবিশ্বাস্য—বাঁ পায়ে চোখধাঁধানো লব। চলতি মাসে আতলেতিকো মিনেইরোর বিপক্ষেও দারুণ খেলেন। কিন্তু সান্তোসের অন্য ম্যাচগুলোতে নেইমারের মেজাজ ছিল খিটখিটে, নিজের চিরচেনা ছন্দের ধারেকাছেও ছিলেন না।
সব মিলিয়ে নেইমারের বর্তমান যে পারফরম্যান্স, তাতে এস্তেভাও ছিটকে গেলেও ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে তাঁর জায়গা পাওয়ার পক্ষে জোরাল কোনো যুক্তি নেই। তবে সব যুক্তি ছাপিয়ে এক অদ্ভুত বিতর্ক এখনো ডালপালা মেলছে।
অরল্যান্ডোতে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে যখন সুযোগ তৈরি করতে ধুঁকছিল ব্রাজিল, গ্যালারি থেকে তখন সমস্বরে নেইমারের নামে স্লোগান দেন দর্শক। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভাও জানিয়েছেন, আনচেলত্তির সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপে তিনি নেইমারকে নিয়ে কথা বলেছেন। এরপর গত এপ্রিলের শুরুতে দুটি জরিপের ফল এই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছে। একটি জরিপে দেখা গেছে, ৪৭ শতাংশ মানুষ নেইমারকে জাতীয় দলে ফেরত চান। অন্য জরিপে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৩ শতাংশে।
মানুষ অন্ধ নয়। সবাই জানেন, নেইমার আর আগের সেই নেইমার নেই। ব্রাজিলের হয়ে নেইমার সর্বশেষ খেলেছেন ২০২৩ সালে। এরপর থেকেই তাঁর শারীরিক সামর্থ্য ও খেলার কমেছে। কিন্তু তাঁর শূন্য সম্ভাবনা থেকে গোল করার সেই অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা? ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা যা খুব কম খেলোয়াড়েরই থাকে? ব্রাজিলের বিশাল জনসমষ্টি এবং বর্তমান দলের অনেক খেলোয়াড়ই এখনো সেই জাদুকরি নেইমারকেই নিজেদের পাশে পেতে চান।
তবে ভিন্নমতও আছে। ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী সাবেক অধিনায়ক কাফু গত সপ্তাহে বলেছেন, ‘আমরা জানি সে কী করতে পারে, কিন্তু (ছন্দ ফিরে পেতে) তার টানা ম্যাচ খেলা প্রয়োজন।’
ব্রাজিলের আরেক কিংবদন্তি জিকোও কাফুর সুরেই সুর মিলিয়ে স্পোর্ট–টিভিকে বলেন, ‘আমার মতো নেইমারকে খুব কম মানুষই ভালোবাসে, কিন্তু সে তো ধারাবাহিকতা খুঁজে পাচ্ছে না। এখন কোচের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা—নেইমার ৭০ শতাংশ ফিট নাকি ৫০ শতাংশ, কোন অবস্থায় জাতীয় দলকে সাহায্য করতে পারবেন।’
কার্লো আনচেলত্তি অবশ্য শুরু থেকেই সবকিছু পরিষ্কার করে দিয়েছেন। বারবার একই কথা বলতে বলতে তিনিও যেন ক্লান্ত। তাঁর সোজা কথা—নেইমার পুরোপুরি ফিট হলেই কেবল তাঁকে জাতীয় দলে বিবেচনা করা হবে, এর আগে নয়। গত এপ্রিলের শুরুতে ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘লেকিপ’-কে এই ইতালিয়ান কোচ বলেন, ‘সে সঠিক পথেই আছে। তবে এটা পরিষ্কার: আমি কেবল সেই খেলোয়াড়দেরই বেছে নেব, যারা শারীরিকভাবে প্রস্তুত।’
গত বুধবার রাতে সান্তোসের হয়ে কুরিতিবার বিপক্ষে পুরো ৯০ মিনিট খেলেন নেইমার। গত ১১ দিনের মধ্যে এটি ছিল তাঁর চতুর্থ ম্যাচ এবং প্রতিটি ম্যাচেই তিনি পুরো সময় মাঠে ছিলেন। যে দীর্ঘ চোট কাটিয়ে তিনি ফিরেছেন, তাতে এটি ছোট কোনো অর্জন নয়; যদিও নিশ্চিত হওয়া গেছে যে আগামী সপ্তাহান্তে বাহিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে তাঁকে বিশ্রাম দেওয়া হবে।
এরপর আনচেলত্তি বিশ্বকাপের দল ঘোষণা করার আগে নেইমার বড়জোর ৬টি ক্লাব ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবেন। প্রস্তুতির জন্য এ সময়টা বড্ড কম। যদি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে এস্তেভাও চোটে না পড়তেন, তবে হয়তো নেইমারকে বাতিলের খাতায় ফেলাই যেত।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, দরজাটা এখনো কিছুটা খোলা আছে। আর সেই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকার দায়িত্বটা কেবল নেইমারের নিজের।