প্রিমিয়ার লিগে কি আরতেতা–যুগের শুরু হলো
৮,০৬০ দিন—আর্সেনালে দুটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জয়ের মাঝে এতগুলো দিন কেটে গেছে। এর মধ্যে পৃথিবীতে কত কিছু বদলে গেল! আরেকটি শিরোপার জন্য লড়তে লড়তে শেষ পর্যন্ত হতাশায় ক্লাব ছেড়ে যান কিংবদন্তি কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার। ব্যর্থতার দায় নিয়ে চলে গিয়েছিলেন উনাই এমেরিও। মিকেল আরতেতার দিনও কাটছিল ব্যর্থতায়।
প্রিমিয়ার লিগে টানা তিনবার দ্বিতীয় হওয়ার পর মনে হচ্ছিল, আরতেতা হয়তো শিরোপা জয়ের ভাগ্য নিয়ে আসেননি। পাশাপাশি একটি প্রক্রিয়া বা দার্শনিক ভাবনার ভেতর দিয়ে দলকে গড়ে তুলে সাফল্য লাভের যে চিরায়ত নিয়ম, সেটি নিয়েও জাগছিল সন্দেহ। কিন্তু সেই সন্দেহ দূর হয়ে গেল গতকাল রাতে। বোর্নমাউথের মাঠে ম্যানচেস্টার সিটির ড্র ২২ বছর পর আর্সেনালের লিগ শিরোপা জয় নিশ্চিত করেছে।
এই শিরোপা আর্সেনালের প্রাপ্যই ছিল। হয়তো আরও বেশি প্রাপ্য ছিল আরতেতার। পেপ গার্দিওলার কোচিং স্কুল থেকে বেরিয়ে একাধিকবার ব্যর্থতার পর অবশেষে সাফল্য, হয়তো অনেক দিন পর শান্তিতে ঘুমাতে পেরেছেন এ স্প্যানিশ কোচ কিংবা উত্তেজনায় ঘুমই আসেনি! তবে ঘুম হোক বা না হোক, আরতেতার আর্সেনাল যে এখন প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন, সেটি মোটেই স্বপ্ন নয়।
পেপ গার্দিওলা ১০ মৌসুমে ম্যানচেস্টার সিটিকে ৬ শিরোপা জিতিয়ে লিগটাকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছিলেন। লিভারপুল বাগড়া না দিলে এ সময়ে সিটির সাফল্য হতো প্রায় শতভাগ। গার্দিওলার দল উপহার দিয়েছে প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলও। কিন্তু সেই দিন হয়তো শেষ হতে চলল। এরই মধ্যে গার্দিওলার সিটি ছাড়ার খবর শোনা যাচ্ছে। পাশাপাশি ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো টানা দুই মৌসুম শিরোপাবঞ্চিত থাকলেন গার্দিওলা।
টানা তিন মৌসুম দ্বিতীয় হওয়ার পর এবার সবার ওপরে উঠেছে আর্সেনাল। ২০০৪ সালে ওয়েঙ্গারের ‘ইনভিন্সিবলস’ দলের শিরোপা জয়ের পর এই প্রথম আবার লিগ চ্যাম্পিয়ন হলো গানাররা। সাম্প্রতিক সময়ে লিভারপুলের ৩০ বছর পর শিরোপা জয়, নাপোলির ৩৩ বছর পর লিগ পুনরুদ্ধার এবং আর্জেন্টিনার ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জেতার পাশেই আর্সেনালের এই অর্জনকে রাখা যায়। এখন ৩০ মে পিএসজিকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে সাফল্যময় মৌসুমটাকে পূর্ণতা দেওয়ার অপেক্ষায় আর্সেনাল।
ওয়েঙ্গারের প্রিমিয়ার লিগজয়ী দলটি ছিল প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসের অন্যতম সেরা। গতি, নৈপুণ্য, আগ্রাসন আর শক্তির দুর্দান্ত মিশেলে গড়া ছিল সেই স্কোয়াড। কিন্তু সেই দলকেও সিংহাসনচ্যুত করেছিল জোসে মরিনিওর চেলসি, যারা ছিল ঠিক উল্টো ধাঁচের। আরতেতার দল অবশ্য ওয়েঙ্গারের দলের মতো রোমাঞ্চকর ফুটবল খেলে না, কিন্তু অতিরিক্ত বাসপার্কিং মানসিকতার রক্ষণাত্মকও তারা নয়। দুটির মধ্যে ভারসাম্য রেখেই শেষ পর্যন্ত দলকে সাফল্য এনে দিয়েছেন আরতেতা।
মৌসুমটি আরতেতার জন্য ছিল নিজেকে প্রমাণের, ‘প্রায় জিতেও না জেতা’ দলের তকমা ঝেড়ে ফেলার। দলকে তিনি তৈরিও করেছেন সেভাবে। গুরুত্ব দিয়েছেন শক্ত রক্ষণ আর সেট পিস কাজে লাগানোর দিকে। ভালোভাবে রক্ষণ সামলাতে পারলে এবং কর্নার বা ফ্রি–কিক থেকে গোল করতে পারলে প্রিমিয়ার লিগের মতো টুর্নামেন্টে বাড়তি সুবিধা মেলে। সেই সুবিধাকেই এ মৌসুমে কাজে লাগিয়েছে আর্সেনাল।
এ মৌসুমে আর্সেনাল কতটা সংগঠিত এবং অপ্রতিরোধ্য ছিল, তার প্রমাণ মিলবে কিছু পরিসংখ্যানে। এই মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে সবচেয়ে কম (২৬) গোল হজম করেছে। সবচেয়ে বেশি ১৯টি ক্লিন শিটও তাদের। আবার ১-০ ব্যবধানে সবচেয়ে বেশি ৮টি জয়ও আর্সেনালের।
সেট পিস আর কর্নার থেকেও দুর্দান্ত সফলতা পেয়েছে দলটি। লিগে সেট পিস থেকে সবচেয়ে বেশি ২৪টি এবং কর্নার থেকে ১৮টি গোল করেছে। ২০১১-১২ মৌসুমের পর ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে সেট পিস থেকে আর্সেনালের এই মৌসুমে ৩৫ গোলের চেয়ে বেশি গোল করতে পেরেছে শুধু রিয়াল মাদ্রিদ (৩৮, ২০১২-১৩) ও আতলেতিকো (৩৭, ২০১৪-১৫)।
২০২৫-২৬ মৌসুমে এখনো আর্সেনালের সামনে দুটি ম্যাচ বাকি। প্রিমিয়ার লিগে ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে এবং চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে পিএসজির বিপক্ষে। ফলে রিয়াল মাদ্রিদ ও আতলেতিকোর সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে তাদের সামনে।
ফুটবলে সাফল্যের ধারা সব সময় এক রকম থাকে না। কখনো আক্রমণাত্মক খেলা দলগুলো আধিপত্য দেখায়, আবার কখনো শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ আর সংগঠিত খেলাই হয়ে ওঠে সাফল্যের মূলমন্ত্র। সাম্প্রতিক সময়ে গার্দিওলা এবং ইয়ুর্গেন ক্লপরা নিজেদের দল গড়েছেন দৃষ্টিনন্দন ফুটবলের ভিত্তিতে। অন্যদিকে আরতেতা কিছুটা ভিন্ন পথ নিয়েছেন। রক্ষণকে জমাট রেখে আক্রমণকে পাখির চোখ করেছেন। মূলত বাস্তবতার নিরিখেই কৌশল সাজান আরতেতা।
তবে ২২ বছর পর লিগ শিরোপা পুনরুদ্ধারই শেষ কথা নয়, বরং শুরুও হতে পারে। আরতেতার সামনে এখন সুযোগ আছে সাফল্যের একটি ধারা তৈরি করার। ক্লপ নেই, গার্দিওলাও চলে যাচ্ছেন। প্রিমিয়ার লিগে নিজের ছাপ ও উত্তরাধিকার তৈরির এটাই সুযোগ, যা সৃষ্টি করতে পারে প্রিমিয়ার লিগে আরতেতা–যুগেরও।