ওই দেখো, কিংবদন্তির চোখে শূন্যতা ও হাহাকার

গ্রিজমানের চোখে–মুখে শুধুই হতাশারয়টার্স

সেমিফাইনাল ফিরতি লেগে শেষ বাঁশি বেজেছে। আরও একবার স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণায় পুড়ছে আতলেতিকো মাদ্রিদ। এবার চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনালে আর্সেনালের কাছে হেরে থেমেছে আতলেতিকোর যাত্রা। আর আতলেতিকোর জার্সিতে নিজের শেষ ইউরোপিয়ান ম্যাচের পর সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে হাততালি দিচ্ছেন আঁতোয়ান গ্রিজমান।

তবে তাঁর দুই হাত ও চোখের অভিব্যক্তিতে যেন হাজার মাইলের ব্যবধান। মনে হচ্ছিল, হাততালি দেওয়া মানুষটিকে পড়তে পারছে না তাঁরই দুটি চোখ। কোথায় যেন তালটা কেটে গিয়ে দুই চোখে অদ্ভুত এক শূন্যতা ও হাহাকারের দখল।

বিষাদময় যাত্রা শেষে চোখ দুটিরই–বা আর কী করার আছে! হয়তো তাঁর সামনে ভেসে উঠছিল, আতলেতিকোতে কাটানো স্মরণীয় মুহূর্তগুলো কিংবা কাছাকাছি গিয়েও শেষ ধাপটা পেরোতে না পারার যন্ত্রণাময় স্মৃতিগুলো। তবে চোখে যা–ই ভাসুক, সেসবের অনুচ্চারিত ভাষাগুলো ছিল বেদনার। অদ্ভুত এক ক্লান্তিও যেন ভর করে ছিল গ্রিজমানের চোখে, যেন অনেক চেষ্টা করেও মিলছে না আকাঙ্ক্ষা ও প্রাপ্তির হিসাব। পার্থক্যটা যে বিশাল।

গ্রিজমান তাঁর সময়ের অন্যতম সেরা ফুটবলারদের একজন। ফ্রান্সকে ২০১৮ বিশ্বকাপ জিতিয়ে ছুঁয়েছেন সাফল্যের চূড়াও। চাইলে ইউরোপের যেকোনো সফল ক্লাবে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে পারতেন। কিন্তু নিজের সেরা সময়েও বেছে নিয়েছিলেন অর্জনের দিক থেকে পিছিয়ে থাকা আতলেতিকোকে। এরপর যে চেষ্টা করেননি তা নয়, বার্সেলোনার মতো সফল ক্লাবে গিয়ে মোহভঙ্গ হয় তাঁর। আবার ফিরে যান আতলেতিকোয়। দুই মেয়াদেই আতলেতিকোর প্রাণভোমরাও তিনি।

কিন্তু সেসবও এখন অতীত হতে চলল। চলতি মৌসুম শেষে ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলে ইতি টেনে গ্রিজমান চলে যাবেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব অরল্যান্ডো সিটিতে। লা লিগায় এখনো চারটি ম্যাচ বাকি আছে তাঁর। কিন্তু ইউরোপিয়ান অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে গতকাল রাতেই।

আরও পড়ুন

আতলেতিকোয় গ্রিজমানের ট্রফি ক্যাবিনেট তাঁর সেই শূন্য দৃষ্টির মতোই বেশ ফাঁকা ফাঁকা। দুই দফায় মাদ্রিদের ক্লাবটিতে ১০ মৌসুম খেলে একটি ইউরোপা লিগ, একটি উয়েফা সুপার কাপ ও একটি স্প্যানিশ সুপারকাপ জিতেছেন। প্রত্যাশার তুলনায় এই প্রাপ্তি বলতে গেলে কিছুই নয়। বিশেষ করে লিগ ও চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে না পারার দগদগে ক্ষত আরও অনেক দিন পোড়াবে গ্রিজমানকে। আতলেতিকোর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল কিন্তু গ্রিজমানেরই (২১২)। পাশাপাশি গোল করানোতেও গ্রিজমান তৃতীয় (৯৪)।

কিন্তু আতলেতিকোতে গ্রিজমানের মহিমাকে পরিসংখ্যান ও ট্রফি দিয়ে বোঝার সুযোগ নেই। আতলেতিকোতে তাঁর লিগ্যাসি তৈরি হয়েছে অন্যভাবে। গ্রিজমান সেই আদর্শ ফুটবলার, যিনি একই সঙ্গে মান ও পরিশ্রমকে নিজের মধ্যে ধারণ করেছেন। লম্বা সময় ইউরোপিয়ান ফুটবলে আতলেতিকোর অন্যতম ব্র্যান্ডও গ্রিজমান। একটি প্রজন্মের কাছে গ্রিজমানই যেন আতলেতিকো।

ইউরোপিয়ান মঞ্চে আতলেতিকোর হয়ে আর দেখা যাবে না গ্রিজমানকে
রয়টার্স

মাঝারি শক্তির দলকে নিয়ে চেষ্টা করেছেন রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনার মতো পরাশক্তিকে টেক্কা দিতে। ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায়ও দলকে সামনে থেকে পথ দেখানোর চেষ্টা করেছেন। হ্যাঁ, সাফল্যের মানদণ্ডে হয়তো অনেক পিছিয়ে থাকবেন গ্রিজমান। কিন্তু ক্লাবটির প্রতি যে দায়বদ্ধতা ও ভালোবাসা তিনি দেখিয়েছেন, তা আতলেতিকোর ইতিহাসে অমরত্ব পেয়ে গেছে।

মাদ্রিদের এই ক্লাবে গ্রিজমানের অবদান নিয়ে কোচ দিয়েগো সিমিওনের কথাগুলো তাই একেবারেই অত্যুক্তি নয়, ‘তোমার কঠোর পরিশ্রম ও বিনয়ের জন্য আমি তোমাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তুমি একজন অনুকরণীয় মানুষ, এমন সমাজে যেখানে তরুণদের জন্য তোমার মতো রোল মডেল প্রয়োজন। তুমি আমাদের যা দিয়েছ, যা দিচ্ছ আর ভবিষ্যতেও যা দেবে, সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।’

আরও পড়ুন

গ্রিজমান সেই বিরল খেলোয়াড়দের একজন, যিনি তাঁর চারপাশের সবাইকে আরও ভালো করে তুলতে সাহায্য করেন। এমনকি মাঝে বার্সেলোনায় গিয়ে আবার আতলেতিকোয় ফেরার পরও নিজের অবস্থান হারাননি ৩৫ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। গ্রিজমান যেভাবে ফিরে এসে ক্ষমা চেয়ে আবারও সমর্থকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, তা আধুনিক ফুটবলে বিরল এক দৃষ্টান্ত।

আতলেতিকো গ্রিজমানের হৃদয়ে কতখানি জায়গা দখল করে আছে, তা সম্প্রতি উয়েফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন গ্রিজমান, ‘আমি বলেছিলাম, লা রিয়াল (রিয়াল সোসিয়েদাদ) ছাড়ার পর আর কোনো ক্লাবের প্রতি একই অনুভূতি থাকবে না। কিন্তু যখন আমি আতলেতিকোতে যোগ দিই, তখন সেই অনুভূতি যেন দ্বিগুণভাবে ফিরে আসে। সেই অনুভূতিটা ভালোবাসার চেয়েও অনেক গভীর কিছু। ক্লাবের রং, ব্যাজ এবং ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা। কারণ, সমর্থকেরা ফুটবল ও কঠোর পরিশ্রমকে ভালোবাসে। মনে হয়, এ কারণেই আমি খুব দ্রুত ক্লাব ও সমর্থকদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাই।’

আতলেতিকোয় যোগ দেওয়ার পরই প্রভাব রাখতে শুরু করেন গ্রিজমান। প্রথম লিগ মৌসুমেই ২২টি গোল করেন, যা নেইমারের সঙ্গে যৌথভাবে লিগে তৃতীয় সর্বোচ্চ। সেই মৌসুমে তিনি স্প্যানিশ সুপার কাপ জেতেন এবং চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালেও পৌঁছান আতলেতিকোর সঙ্গে।

পরের মৌসুমটি ছিল আরও অসাধারণ। স্প্যানিশ লিগে মৌসুম–সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন এবং ২০১৬ সালে ব্যালন ডি’অর র র‍্যাঙ্কিংয়ে তৃতীয় হন। চ্যাম্পিয়নস লিগে তখন পর্যন্ত নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যান। ১৩টি ম্যাচেই শুরুর একাদশে ছিলেন এবং ৭ গোল করেন। তাঁর হাত ধরেই আতলেতিকো পৌঁছায় স্বপ্নের ফাইনালে।

মাঝারি শক্তির দলকে নিয়ে গ্রিজমান চেষ্টা করেছেন রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনার মতো পরাশক্তিকে টেক্কা দিতে। ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায়ও দলকে সামনে থেকে পথ দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

তবে শেষ পর্যন্ত শিরোপা অধরাই থেকে যায়। ফাইনালে রিয়ালের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্রয়ের পর পেনাল্টি শুটআউটে হেরে যায় আতলেতিকো। তবে এখানে একটি আক্ষেপের গল্পও আছে। সেদিন ৪৮ মিনিটে গ্রিজমান যদি পেনাল্টি মিস না করতেন, তাহলে গল্পটা ভিন্ন হলেও হতে পারত। সেই ক্ষত পুষে রেখেছিলেন গ্রিজমান। চেয়েছিলেন বিদায়বেলায় শিরোপা জিতে সেই ক্ষতে প্রলেপ দিতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হলো না।

এই অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা হয়তো গ্রিজমানের মনে সব সময় থেকে যাবে। কিন্তু এসব অপ্রাপ্তির জন্য নয়, আতলেতিকো গ্রিজমানকে মনে রাখবে একজন গল্পকথক হিসেবে। প্রায় এক দশক ধরে মাঠে আতলেতিকোর অসাধারণ গল্পগুলো যে গ্রিজমানের পায়েই রচিত হয়েছে। সেই গল্পগুলোই একদিন হয়তো ‘মিথ’ হয়ে উঠবে, প্রেরণা হবে অন্য কারও মহাতারকা হয়ে ওঠার। আর গ্রিজমান? চাইলে গতকাল রাতে তাঁর মাঠ ছাড়ার ছবিটিকে স্মরণ রাখতে পারেন যেকোনো আতলেতিকো সমর্থক। নতুন প্রজন্মকে সেই সমর্থক ছবিটি দেখিয়ে হয়তো বলতে পারেন, ওই দেখো, কিংবদন্তির চোখে শূন্যতা ও হাহাকার।