মেসির উত্তরসূরি নাকি মেসির সতীর্থ, কার রাত আজ

আজ মুখোমুখি ইয়ামাল–মার্তিনেজউয়েফা

ইশ, বার্সেলোনার বিপক্ষে ম্যাচটি যদি এক সপ্তাহ আগে হতো! কে জানে, ইন্টার মিলান সমর্থকেরা এমন কিছু ভেবে হাহুতাশ করছেন কি না। এক সপ্তাহ আগেও লড়াইটা একরকম সমতাতেই ছিল। দুই দলের সামনে ক্রমেই উজ্জ্বল হচ্ছিল ‘ট্রেবল’ জয়ের সম্ভাবনা। চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করার পর তো দুই দলেরই আত্মবিশ্বাস রীতিমতো টগবগ করে ফুটছিল।

কিন্তু সপ্তাহ না পেরোতেই মিলান শহরের নীল অংশজুড়ে কেবল হতাশা। নাহ, ইন্টারের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের সম্ভাবনা এখনো হওয়ায় মিলিয়ে যায়নি। হাতছাড়া হয়ে যায়নি লিগ শিরোপাও। তবুও বাতাস ভারী হওয়ার মতো যথেষ্ট উপাদান আশপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের পতন্মুখ পারফরম্যান্স তো আছেই, পাশাপাশি প্রতিপক্ষ বার্সেলোনার ছন্দে থাকাও এখন ইন্টার–সমর্থকদের কপালে ভাঁজ ফেলেছে।  

বার্সার মাঠ অলিম্পিক স্টেডিয়ামে ইন্টার–বার্সার আজ রাত ১টায় ম্যাচটি চ্যাম্পিয়নস লিগে শেষ চারের সূচি নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই উত্তাপ ছড়াচ্ছিল। শুরুতে দুই দলকে একই সমতাতেও রাখা হয়েছিল, কিন্তু গত কদিনে পাল্লাটা হেলে গেছে বার্সার দিকেই। এর পেছনে অবশ্য যৌক্তিক কারণও আছে। এই কদিনে বার্সা যেখানে ট্রেবল জয়কে সামনে রেখে তেতে উঠেছে, সেখানে ট্রেবল সম্ভাবনার কবর রচনা করে সব হারানোর শঙ্কায় ইন্টার।

আরও পড়ুন

১৬ এপ্রিল বায়ার্ন মিউনিখের সঙ্গে রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর ২–২ গোলে ড্র করে দুই লেগ মিলিয়ে ৪–৩ অগ্রগামিতায় চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে ইন্টার। এটুকু পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই ছিল। বায়ার্নের মতো ফেবারিটকে হারিয়ে সেমিতে যাওয়া মোটেই সহজ ছিল না। মৌসুম শুরুর আগে এই ম্যাচ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতে বলা হলে বেশির ভাগ রায় নিশ্চিতভাবে বায়ার্নের পক্ষেই যেত। ফলে সেই জয় বেশ উজ্জীবিত করে তুলেছিল ইন্টারকে।

কিন্তু সেই প্রেরণা ইন্টার পরের ম্যাচে অনূদিত করতে পারেনি। বোলোনিয়ার বিপক্ষে লিগ ম্যাচে ইন্টার হেরে যায় ১–০ গোলে। বোলোনিয়া সিরি আ–র অন্যতম সফল দল, তাদের কাছে হারাটা হতাশার হলেও অঘটন ছিল না। সমর্থকদের প্রত্যাশা ছিল ইতালিয়ান কাপের ফাইনালে হয়তো ঘুরে দাঁড়াবে ইন্টার। কিন্তু সেই ফাইনালে আরও বড় ধাক্কা খায় নেরাজ্জুরিরা। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এসি মিলানের কাছে ১–০ গোলে হেরে হাতছাড়া হয়ে যায় কাপ শিরোপা, একই সঙ্গে শেষ হয় ট্রেবল জয়ের স্বপ্নও।  

বার্সার দুই সেরা তারকা ইয়ামাল ও রাফিনিয়া
এএফপি

ট্রেবল–স্বপ্ন ভাঙার ক্ষত সারার আগে ইন্টারের লিগ শিরোপাও পড়েছে হুমকিতে। রোমার বিপক্ষে হারের পর নাপোলির সঙ্গে পয়েন্ট টেবিলে সমতাটা আর থাকেনি, ৩ পয়েন্ট ব্যবধানে পিছিয়ে দুইয়ে নেমে গেছে ইন্টার। ৩৪ ম্যাচ শেষে শীর্ষে থাকা নাপোলির পয়েন্ট এখন ৭৪ আর সমান ম্যাচে ইন্টারের পয়েন্ট ৭১। এই হলো গত এক সপ্তাহের ধাক্কার পর ইন্টারের বর্তমান অবস্থা। এখন এই পরিস্থিতি মেনে নিয়েই বার্সেলোনার বিপক্ষে আজ রাতে সেমিফাইনাল প্রথম লেগে বার্সার মুখোমুখি হবে ইন্টার।

ইন্টারের এই দুর্দশাকে চিরন্তন ধরে নিলে কিন্তু বিপদে পড়তে হতে পারে বার্সাকে। চ্যাম্পিয়নস লিগে ইন্টার কোনো আগন্তুক দল নয়। হয়তো ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের ট্রফি ক্যাবিনেটে ধুলা পড়েছে, হয়তো ১৫ বছর ধরে শিরোপার দেখা নেই। কিন্তু ২০১০ সালে শেষ যেবার জিতেছিল, সেবার সেমিফাইনালে পেপ গার্দিওলার পরাক্রমশালী বার্সাকেই ধরাশায়ী করেছিল তারা। ফলে সব প্রতিকূলতার বিপরীতে ইন্টারকে আজ আশা জোগাবে সেই ম্যাচটি। সেবার জোসে মরিনিওর গড়া কীর্তিই আজ রাতে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করতে পারে সিমোনে ইনজাগির শিষ্যদের।

আরও পড়ুন

শুধু ইতিহাস নয়, ইন্টার চাইলে নিজেদের ওপরও আস্থা রাখতে পারে। সাম্প্রতিক সময়টা ভালো না গেলেও চলতি মৌসুমে বেশ মুগ্ধতা জাগানো ফুটবল খেলেছে তারা। দলের হয়ে দুর্দান্ত ছন্দে আছেন অধিনায়ক ও স্ট্রাইকার লাওতারো মার্তিনেজ।

চ্যাম্পিয়নস লিগে টানা ৫ ম্যাচে গোল করেছেন বিশ্বকাপজয়ী এই আর্জেন্টাইন। বার্সেলোনার বিপক্ষে আজ গোল করতে পারলে দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে টানা ছয় ম্যাচে গোল করার কীর্তি গড়বেন মেসির সতীর্থ মার্তিনেজ। এর আগে এই কীর্তি গড়েছিলেন এডিনসন কাভানি।

তবে ব্যক্তিগত লক্ষ্যে নয়, মার্তিনজের চোখ থাকবে দলীয় সাফল্যে। ইন্টারকে চতুর্থ চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা জেতানোর ক্ষেত্রে পথ দেখাতে পারলে সেটি নিশ্চিতভাবে মার্তিনেজের ব্যক্তিগত অর্জনের পাল্লাকেই সমৃদ্ধ করবে। ম্যাচটি ইন্টার কোচ ইনজাগির জন্যও মাইলফলকের। এই ম্যাচ দিয়ে ৭ম ইতালিয়ান কোচ হিসেবে চ্যাম্পিয়নস লিগের নিজের ৫০তম ম্যাচে ডাগআউটে দাঁড়ানোর কীর্তি গড়বেন ইনজাগি। এমন ম্যাচ নিশ্চয়ই গোমড়া মুখে শেষ করতে চাইবেন না তিনি।

লাওতারো মার্তিনেজই ইন্টারের ভরসা
এএফপি

গত এক দশক ধরে চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা জয়ের স্বাদ পায়নি বার্সেলোনা। মেসি–নেইমারদের হাত ধরে সর্বশেষ ২০১৫ সালে শিরোপা গিয়েছিল কাতালুনিয়ায়। এরপর অপেক্ষাতেই কেটেছে প্রহর। আরেকটি ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের ট্রফির স্পর্শ দলটির জন্য মরীচিকা হয়ে থেকেছে। এখন ইন্টার যদি অনুপ্রেরণা নিতে ২০১১ সালে ফিরে যায়, তবে বার্সা হাত পাততে পারে ২০২৫–এর কাছেই।

চলতি মৌসুমটা দুর্দান্ত কাটছে বার্সার। বিশেষ করে ২০২৫ সালে এসে বার্সা যেন আরও অপ্রতিরোধ্য। চ্যাম্পিয়নস লিগ কোয়ার্টার ফাইনালে দ্বিতীয় লেগে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের বিপক্ষে না হারলে এ মৌসুমে অপরাজিতই থাকতে পারত তারা। তবে অপরাজিত যাত্রা থামলেও বার্সাকে থামানো কিন্তু বেশ কঠিনই।

এ মৌসুমে তিনবার মুখোমুখি হয়েও বার্সাকে হারাতে পারেনি রিয়াল মাদ্রিদ। তিনটিতেই হেরেছে মাদ্রিদের ক্লাবটি। যেখানে সর্বশেষ ম্যাচে রিয়ালকে হারিয়েই কোপা দেল রে শিরোপা জিতেছে বার্সা। এখন রিয়ালকে হারানোর ছন্দ ধরে রেখেই নতুন করে শিরোপা পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখছে হান্সি ফ্লিকের দল।

গত এক দশক ধরে চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা জয়ের স্বাদ পায়নি বার্সেলোনা। মেসি–নেইমারদের হাত ধরে সর্বশেষ ২০১৫ সালে শিরোপা গিয়েছিল কাতালুনিয়ায়।

বার্সার ঘুরে দাঁড়ানোর নেপথ্য নায়ক ফ্লিক। জার্মান এই কোচ রীতিমতো জাদুকরি স্পর্শে বদলে দিয়েছেন গোটা দলকে। কৌশলগত দিক থেকে দলকে কার্যকর করে তোলার পাশাপাশি হার না মানার মন্ত্রও তিনি দলের ভেতর ছড়িয়ে দিয়েছেন। সেই মন্ত্রই এখন ম্যাচের পর ম্যাচে বের করে আনছে ইয়ামাল–রাফিনিয়াদের সেরাটা। ইন্টারের যেমন মেসির সতীর্থ মার্তিনেজ আছে, তেমনি বার্সার ইয়ামাল। তবে ইয়ামালের সঙ্গে চোখ থাকবে রাফিনিয়ার ওপরেও। দুজনেই ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়ে এগিয়ে আছেন। তবে ব্যালন ডি’অর নিয়ে না ভেবে তাঁরা হয়তো দলকে ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা এনে দিতেই বেশি উন্মুখ থাকবেন।

ইয়ামাল বা রাফিনিয়ায় শুধু নন, বার্সার হয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন যে কেউ। এ দুজনের অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের কারণে পেদ্রি, ফেরান তোরেসরা খানিকটা আড়ালেই পড়ে গেছেন, নয়তো নিজেদের সেরা সময় পার করছেন তাঁরাও। এই ম্যাচের আগে বার্সার একমাত্র আক্ষেপ রবার্ট লেভানডফস্কির না থাকা। তবে লেভাকে ছাড়াই রিয়ালকে হারিয়েছে বার্সা। ফলে দলের মূল স্কোরারকে ছাড়াই যে জেতা যায়, সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই আজ মাঠে নামবে তারা।  

আরও পড়ুন

ম্যাচের আগে সব মানদণ্ডে এগিয়ে থাকলেও বার্সাকে সর্বোচ্চ সতর্কতা নিয়েই মাঠে নামতে হবে। কারণ, সবকিছুই যখন ঠিক থাকে তখন তৈরি হয় বিপর্যয়ের আশঙ্কা। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসও অনেক  সময় ধস নামাতে পারে। আহত বাঘ ইন্টারের সামনে তেমন ধস যেন আজ না নামে, সেই প্রস্তুতি নিয়েই আজ নামতে হবে বার্সাকে।