এমন আকস্মিক বিদায় ঘোষণায় যতটা না যুক্তি থাকে তার চেয়ে বেশি থাকে আবেগ। পিকের বিদায়টাও তাই! নয়তো দুই মাস আগে নতুন মৌসুম শুরুর আগেই তো বিদায়ের বার্তাটা দিয়ে দিতে পারতেন। সেটিই বরং যৌক্তিক হতো এবং স্বস্তিরও। তবে তা হয়নি। অস্বস্তির কালিতেই শেষ পর্যন্ত লেখা হয়েছে পিকের বিদায়ী বার্তা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেন? বিদায়ের কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি তাঁর বার্তাতেও। তবে কারণ অবশ্য অনুমান করতে কষ্ট হয় না। পিকের বিদায়ের মঞ্চটা প্রস্তুত হয়েছিল আরও আগে।

গত দুই মৌসুমে চোট ও ছন্দহীনতা মিলিয়ে বেশ ভুগেছেন পিকে। তবে এর মাঝে এক সময়ের সতীর্থ জাভি হার্নান্দেজ বার্সেলোনার কোচ হয়ে ন্যু ক্যাম্পে আসেন। অনেকের ধারণা ছিল, নতুন রূপে পুরোনো বন্ধুকে হয়তো আরও কিছুদিন খেলে যাওয়ার লাইসেন্স দেবেন জাভি।

তবে নতুন মৌসুম শুরু হতেই পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে। দুই মাস না পেরোতে বার্সায় যে পিকে গুরুত্ব হারিয়েছেন তা স্পষ্ট হয়। রোনাল্ড আরাউহো, হুলেস কুন্দে, আন্দ্রেস ক্রিস্টিনসেন এবং এরিক গার্সিয়াকে পিকের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন কোচ জাভি হার্নান্দেজ। জাভির দলে ডিফেন্ডারদের তালিকায় পিকের অবস্থান ছিল মূলত ৫ নম্বরে। ফলে মৌসুমের বেশির ভাগ ম্যাচে বেঞ্চ গরম করে কাটিয়ে দিয়েছেন নিজের সময়ের অন্যতম সেরা এই ডিফেন্ডার।

দলে এমন ব্রাত্য হয়ে থাকা মেনে নিতে পারেননি পিকে। মৌসুম শেষ করার ধৈর্যও ধরতে পারেননি। বার্সার চ্যাম্পিয়নস লিগ স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার কদিন পর বলে দিলেন, আর নয় এবার বুটজোড়া তুলে রাখবেন তিনি।

বিদায়টা যে এভাবে হতে পারে সে ইঙ্গিত অবশ্য আগেই দিয়েছিলেন পিকে। বলেছিলেন, প্রয়োজনে তিনি অবসর নেবেন তবু বেঞ্চ গরম করবেন না।

তবে পিকের এই বার্তা আমলে নেয়নি বার্সা এবং দলের কোচ জাভি। এ মৌসুমের বেশিরভাগ ম্যাচে তাঁকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখেন জাভি। লা লিগায় ১২ ম্যাচের মাত্র ৩টিতে শুরুর একাদশে ছিলেন পিকে। ৭ ম্যাচে মাঠে নামানো হয়নি তাঁকে। আর চ্যাম্পিয়নস লিগে মাত্র ২ ম্যাচে শুরু থেকে খেলার সুযোগ পান পিকে। এখানেও পিকেকে ২ ম্যাচে ৯০ মিনিটের পুরোটা কাটাতে হয় বেঞ্চে।

এই আচরণে পিকেকে হয়তো বিদায়ের পথটাই দেখিয়ে দিচ্ছিল বার্সা কর্তৃপক্ষ। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে স্প্যানিশ সংবাদ মাধ্যম স্পোর্ট বলেছিল, বার্সা আশা করছে নিজের কথা রেখে বিদায় বলে দেবেন পিকে। কিন্তু কেন? বলছি, গত দলবদলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে খেলোয়াড় দলে ভিড়িয়েছে ক্যাম্প ন্যুর দলটি। এই চাপ থেকে মুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে পিকের বিদায় বড় ধরনের স্বস্তি হবে বলে দাবি করেছিল স্পোর্ট। সংবাদ মাধ্যমটিকে সে সময় বার্সার এক সূত্র বলেছিল, ‘দেখা যাক, সে কথা রাখে কি না?’

হ্যাঁ, পিকে কথা রেখেছেন। বার্সাকে চূড়ায় তোলার ক্ষেত্রে দারুণ অবদান রাখা পিকে দলের অর্থনৈতিক দুঃসময়ে হয়তো আর বোঝা হয়ে থাকতে চাননি। কিংবা যে ক্লাবের হয়ে নিজেকে ডিফেন্ডারদের শীর্ষ সারিতে তুলেছেনে, সেখানে আর ব্রাত্য হয়ে থাকতে চাননি। অবশ্য এমনও হতে পারে যে, বিদায় বলতে বাধ্য করা হয়েছে পিকেকে। তবে কারণ যেটাই হোক, পিকের বিদায় এখন বাস্তবতা। আলমেরিয়ার হয়ে বার্সার আগামী ম্যাচের পরেই বুটজোড়া আর পরা হবে না তাঁর।

তবে পিকের এমন বিদায়ের পেছনে তাঁর পারফরম্যান্সের ঘাটতিও বড় কারণ। ছন্দহীনতা মূলত পিকেকে বেঞ্চে ঠেলে দিয়েছিল। জাভি যে তাঁকে একেবারে সুযোগ দেননি তাও নয়। চ্যাম্পিয়নস লিগে যে ম্যাচে ইন্টার মিলানের সঙ্গে ড্র করে বার্সা প্রতিযোগিতা থেকে বিদায়ের ধ্বনি শুনেছিল, সে ম্যাচে গোল খাওয়ার পেছনে বড় দায়টা ছিল পিকের। বিশেষ করে প্রথম গোলটিতে।

সেদিন আলেসান্দ্রো বাস্তোনির ক্রসটা চাইলে আটকানোর চেষ্টা করতে পারতেন কিংবা পিছিয়ে গিয়ে নিকোলা বারেল্লাকে কাভার করার চেষ্টা করতে পারতেন। তবে কিছু না করে শুধু তাকিয়ে দেখেছেন যেন। ইন্টারকে ম্যাচে ফেরার সুযোগ করে দিয়েছে সেটি। সেই ম্যাচের পর ব্যাপকভাবে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন পিকে। সমর্থক তো বটে দলের স্ট্রাইকার রবার্ট লেভানডফস্কিও সেই ম্যাচের পর ডিফেন্সের সমালোচনা করেছিলেন। যার বেশির ভাগটা পড়ে পিকের ঘাড়েেই।

সেই ম্যাচের পর  জাভির আস্থা নিশ্চিতভাবে আরও কমে গিয়েছিল। ইন্টার ম্যাচের পর লা লিগায় আার কোনো ম্যাচে শুরুর একাদশে ছিলেন না পিকে। চ্যাম্পিয়নস লিগে ভিক্তোরিয়া প্লজেনিয়ার বিপক্ষে ‘দুধভাত’ ম্যাচে তাঁকে ৯০ মিনিট খেলিয়েছেন জাভি। আর যা শেষ পর্যন্ত পিকেকে চালিত করেছে অবসরের আকস্মিক এই সিদ্ধান্তের দিকে। তবে দুই পক্ষ আরেকটু বিচক্ষণতার পরিচয় দিলে বিদায়টা এমন অস্বস্তিকর না হয়ে আরও সুন্দরও হতে পারত। ‍একটি যুগের বিদায় বলে কথা।