ফুটবলের যে ৭টি পরিসংখ্যান সব সময় ম্যাচের ‘সত্য’ বলে না

অনুশীলনের জন্য জড়ো করা ফুটবলরয়টার্স

গোল, পয়েন্ট, গোল ব্যবধান, লাল কার্ড, জয়ের সংখ্যা—ফুটবলে এসব পরিসংখ্যান যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা দর্শকমাত্রই জানেন। তবে একটি ফুটবল ম্যাচ ঘিরে এর বাইরে আরও অনেক বিষয় সমর্থকদের আলোচনায় উঠে আসে। মুখে মুখে ফেরে ম্যাচের নানা পরিসংখ্যান।

তবে সব পরিসংখ্যান দিয়ে আসলে ম্যাচের আসল চিত্র ফুটে ওঠে না। ফুটবলে চর্চা হয়, এমন অনেক পরিসংখ্যান আসলে খেলায় বড় কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। তেমনই কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে আলোচনা করা হলো এখানে।

১. প্রত্যাশিত গোল

এই পরিসংখ্যানে একটি সুযোগ থেকে গোল হওয়ার গাণিতিক সম্ভাবনা বের করা হয়। ইংরেজিতে xG ব্যবহার হয় এই পরিসংখ্যানের জন্য। তবে এক্সপেকটেড আসলে শুধু সম্ভাবনাই দেখায়, বাস্তবতা নয়। কোনো খেলোয়াড় গোলপোস্টের সামনে ৫টি সুবর্ণ সুযোগ (উচ্চ xG) মিস করতে পারেন, আবার একজন খেলোয়াড় হয়তো জিরো অ্যাঙ্গেল থেকে অসম্ভব এক গোল (নিম্ন xG) করে দিলেন। দিনশেষে স্কোরবোর্ডে গোলের সংখ্যাই আসল, গোল হওয়ার সম্ভাবনা নয়।

২. সফল পাসের সংখ্যা

অনেকে একটি দলের শক্তিমত্তা অথবা দুর্বলতা বোঝাতে কোন দল কত পাস দিয়েছে, সে তথ্যে চোখ বুলান। কিন্তু ফুটবল ম্যাচে পাসের সংখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ পাসের মান। একটি দল নিজেদের রক্ষণভাগে ১০০০টি পাস দিয়ে গোলশূন্য থাকতে পারে, যেখানে অন্য দল মাত্র ৩টি পাসে কাউন্টার অ্যাটাকে গিয়ে গোল দিতে পারে।

যেমন স্পেনের ক্লাবগুলো পাসিং ফুটবল বেশি খেলে। এর মানে এমন নয় যে তারা বেশি জেতেও। যেমন গত ১১ মার্চ চ্যাম্পিয়নস লিগ শেষ ষোলোর প্রথম লেগে রিয়াল মাদ্রিদের চেয়ে ১৫২টি পাস বেশি দিয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি (৫০৮ বনাম ৩৩৬)। কিন্তু ম্যাচে সেদিন একটি গোলও করতে পারেনি সিটি, রিয়াল জিতেছে ৩-০ ব্যবধানে। পাস যদি প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙতে না পারে, তা সময় অপচয়ের খাতায় পড়ে।

বল বেশি সময় দখলে রাখলেই সফলতা নিশ্চিত নয়
এএফপি

৩. পজেশন বা বল দখল

এতে বোঝা যায়, ম্যাচের কত শতাংশ সময় বল কোন দলের পায়ে ছিল। তবে বল দখল করে রাখা মানেই ম্যাচ জেতা নয়। অনেক দল সচেতনভাবে বল প্রতিপক্ষকে ছেড়ে দেয় এবং নিরেট রক্ষণভাগ তৈরি করে প্রতি-আক্রমণে ম্যাচ জিতে নেয়। যেমন ২০১০ বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের কাছে স্পেনের হার। স্পেনের পজেশন ছিল প্রায় ৭৫%, কিন্তু ম্যাচ জিতেছিল সুইজারল্যান্ড।

৪. অতিক্রান্ত দূরত্ব

পুরো ম্যাচে একজন খেলোয়াড় বা দল মোট কত কিলোমিটার দৌড়াল, সেটি দেখা যায় এই পরিসংখ্যানে। বাস্তবতা হচ্ছে ফুটবলে ‘ব্লাইন্ড রানিং’য়ের চেয়ে ‘স্মার্ট রানিং’ বেশি জরুরি। যে দল বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হন্যে হয়ে তা খুঁজছে, তারা স্বাভাবিকভাবেই বেশি দৌড়াবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা ভালো খেলছে। বরং নিয়ন্ত্রিত ফুটবল খেললে দৌড়ানোর প্রয়োজন কমে যায়।

আরও পড়ুন

৫. বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া শট


টেলিভিশনে দূরপাল্লার গোল দেখতে দারুণ লাগে, কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, এর সফলতার হার অত্যন্ত কম। একটি দল যদি সারাক্ষণ বক্সের বাইরে থেকে শট নিতে থাকে, তবে বুঝতে হবে, তারা বিপক্ষ দলের বক্সে ঢুকতে পারছে না বা রক্ষণ ভাঙতে পারছে না। বক্সের ভেতরে শট নেই, কিন্তু বাইরে থেকে প্রচুর শট থাকার অর্থ তারা হতাশ হয়ে লক্ষ্যহীন শট নিচ্ছে।

৬. গোলকিপারের ক্লিন শিট

ম্যাচে কোনো দল গোল না খেলে ‘ক্লিন শিট’ রেখেছে বলা হয়। তবে একজন গোলকিপার ক্লিন শিট পেলেন মানেই তিনি দুর্দান্ত খেলেছেন, তা নয়। যদি রক্ষণভাগ কোনো শটই বক্সে আসতে না দেয়, তবে গোলকিপার দাঁড়িয়ে থেকেও ক্লিন শিট পেতে পারেন। আবার একজন দুর্বল ডিফেন্সের গোলকিপার ১০টি সেভ করেও একটি গোল খেয়ে বসলে তাকে ‘ব্যর্থ’ মনে হতে পারে, যা ভুল।

ক্লিন শিটের সফলতা নির্ভর করে প্রতিপক্ষের আক্রমণের ওপর
এএফপি

৭. বলে স্পর্শ

একজন খেলোয়াড় ম্যাচে কতবার বল স্পর্শ করেছেন, সেটা অনেকেই বিশ্লেষণের সময় বিবেচনায় নিয়ে থাকেন। ম্যানচেস্টার সিটির আর্লিং হলান্ডের নাম এ ক্ষেত্রে প্রায়ই আসে। গোল পাননি, এমন অনেক ম্যাচেই তিনি বলে স্পর্শ করেছেন মাত্র ১০-১২ বার।

তবে বলে স্পর্শ কম মানেই খারাপ খেলা আর বেশি মানেই ভালো খেলা নয়। একজন স্ট্রাইকার কতবার বল ছুঁলেন, তার চেয়ে বড় কথা হলো, যখন ছুঁলেন তখন তিনি কতটা ভয়ংকর ছিলেন। দেখা গেল, পুরো ম্যাচে ১০ বার বল ছুঁয়েই তিনি দুটি গোল করে ফেলেছেন। সুতরাং বলে স্পর্শের পরিসংখ্যানে বোঝার উপায় নেই, কতটা ভালো বা কতটা খারাপ।

আরও পড়ুন