‘সুইস ঘড়ি’ নাকি মেসির পায়ের জাদু, কানসাসে থামবে কার সময়
সুইজারল্যান্ডের ঘড়ি কখনো ভুল সময় দেখায় না।
এই প্রবাদটা যতটা না বিজ্ঞাপনের ভাষা, ততটাই জাতীয় চরিত্রের সনদ। নিখুঁত কাঁটা, নিঃশব্দ যন্ত্র, প্রতিটি সেকেন্ড গোনা এবং ভুলহীন।
অথচ ২০১৪ সালের জুলাইয়ের এক রাতে সাও পাওলো স্টেডিয়ামে সুইসের সেই বিখ্যাত সময়জ্ঞান ব্যর্থ হয়েছিল ঠিক ১১৮তম মিনিটে। গ্যালারি তখন প্রায় নিস্তব্ধ, ক্লান্ত পায়ে অতিরিক্ত সময়ের শেষ প্রান্তে হাঁটছে দুটো দল, ঘড়ির কাঁটা যখন প্রায় থেমে যাওয়ার কথা। তখনই আচমকা জেগে উঠেছিলেন আনহেল দি মারিয়া। একটা শট, একটা গোল, আর সুইজারল্যান্ডের নিখুঁত প্রতিরোধ ভেঙে আর্জেন্টিনা পা রাখল কোয়ার্টার ফাইনালে।
বাংলাদেশ সময় আগামীকাল সকাল ৭টায় আরও একবার মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ড।
এবার কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে সেমিফাইনালে ওঠার লড়াই। ১২ বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে। তবে বদলায়নি শুধু দুটো জার্সির রং, বদলাননি তিনজন মানুষও। যাঁদের একজন লিওনেল মেসি, অন্য দুজন সুইজারল্যান্ডের অধিনায়ক গ্রানিত জাকা ও ডিফেন্ডার রিকার্দো রদ্রিগেজ।
২০১৪-র সেই রাতের সাক্ষী এই তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত যিনি, তাঁকে নিয়ে জাকা বলছেন, ‘ওঁর সঙ্গে এই সময়টায় থাকতে পারা সৌভাগ্যের ব্যাপার। ২০১৪-তে যখন হেরেছিলাম, তখনই বুঝেছিলাম, তাঁর তুলনা হয় না। শুধু ও নয়, পুরো দলটাই সেই মানের।’ কার কথা বলা হচ্ছে, বোঝা কঠিন নয় নিশ্চয়ই। লিওনেল মেসি।
রদ্রিগেজও বললেন, ‘আর্জেন্টিনা দুর্দান্ত দল। দুর্দান্ত সব খেলোয়াড়, দারুণ কোচ। আর সেরাজন তো আছেই।’ ‘সেরাজন’ বলতে যে কাকে বোঝানো হলো, সেটারও কোনো ব্যাখ্যা লাগে না নিশ্চয়ই।
মেসি এখন ৩৯। শরীর আর আগের মতো বাধ্য নয়, গতি কমেছে, কিন্তু বিশ্বকাপ এখনো তাঁকে কেন্দ্র করেই ঘোরে। যেমন পৃথিবী ঘোরে সূর্যকে ঘিরে, জেনেও যে সূর্য একদিন নিভে যাবে। মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোয় ১১ মিনিট বাকি থাকতে ২-০ পিছিয়ে থেকেও ৩-২ গোলে জয়—সেই ম্যাচের নায়কও তিনিই। ওই ম্যাচের পর বলেছিলেন, ‘এই দল হার মানে না, শেষ পর্যন্ত লড়ে যায়।’ কথাটার মধ্যেই এই আর্জেন্টিনার চরিত্র ফুটে ওঠে।
এটাই হয়তো মেসির শেষ বিশ্বকাপ। কিন্তু বয়স আবেগ কমায় না, শুধু সময়সীমা টেনে দেয়। ২৭ বছর বয়সে যিনি ব্রাজিলে খেলেছিলেন বিশ্বকাপ জেতার তীব্র তেষ্টা নিয়ে, ৩৯-এ পৌঁছে সেই একই মানুষের একই লক্ষ্য। আবার বিশ্বকাপ জেতা।
কিন্তু গল্পটা শুধু মেসিতে আটকে থাকলে অন্যায় হবে। এই সুইজারল্যান্ড আর সেই প্রতিরক্ষা-সর্বস্ব, রক্ষণাত্মক ছকে বাঁধা দল নয়। মুরাত ইয়াকিনের দল সেই বাছাইপর্ব থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টে একবারও পিছিয়ে পড়েনি, একবারও হারেনি। এই দলটা আলজেরিয়াকে হারিয়ে, কলম্বিয়ার সঙ্গে টাইব্রেকারে জিতে ৭২ বছর পর কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে এসেছে এক দারুণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে। আর্জেন্টিনার কোচ স্কালোনি নিজেও সতর্ক করেছেন প্রতিপক্ষ নিয়ে, ‘অসাধারণ বিশ্বকাপ ঐতিহ্য আর দুর্দান্ত সব খেলোয়াড় নিয়ে ওরা এসেছে, আরেকটা কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।’
ঐতিহ্যের কথা যখন এলই, মনে করিয়ে দেওয়া ভালো, প্রথম চারটা বিশ্বকাপের তিনটাতেই কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছিল সুইসরা। সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে এবারের দারুণ ফর্ম। কোচ মুরাত ইয়াকিন তাই এখন আর কাউকে ভয় পেয়ে খেলতে রাজি নন, ‘চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে খেলাটা একটা বিরল সুযোগ। আর আমরা এটাও বুঝে গেছি, আর্জেন্টিনা অজেয় নয়। কৌশলগত দিক থেকে এটা দারুণ একটা লড়াই হতে যাচ্ছে।’
আসলেই তো। কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের আত্মঘাতী কোলে বাঁচা, মিসরের বিপক্ষে দুই গোল হজম করেও ম্যাচ জেতা—আর্জেন্টিনার পথটা মসৃণ ছিল না, বরং কাঁটা বিছানো।
তবে এত কিছুর পর স্কালোনির জন্য সবচেয়ে ভালো খবর হচ্ছে, তাঁর প্রায় পুরো স্কোয়াড এখন সুস্থ, চোটমুক্ত। প্রশ্ন শুধু, মেসির পাশে হুলিয়ান আলভারেজের পরিশ্রমী দৌড় নাকি লাওতারো মার্তিনেজের শারীরিক উপস্থিতি? বাঁ প্রান্তে অভিজ্ঞ তাগলিয়াফিকো নাকি তরুণ মেদিনা? মাঝমাঠে ম্যাক আলিস্টার-দি পল জুটি বলের নিয়ন্ত্রণ রাখবেন, ফাঁক খুঁজবেন মেসির জন্য।
ওদিকে জাকা-ফ্রয়েলার জুটি নিচু ব্লক বানাবেন, মাঝমাঠের রাস্তা বন্ধ করে বল ঠেলে দেবে দুই প্রান্তে, যেখানে ড্যান এনদোয়ে আর রুবেন ভারগাসের গতি অপেক্ষা করছে আর্জেন্টিনার ওঠা ফুলব্যাকদের ফাঁকা জায়গার জন্য, বল শেষে পৌঁছাবে ব্রিল এমবোলোর পায়ে। মাঝমাঠের এই নিঃশব্দ যুদ্ধেই আসলে লেখা হবে ম্যাচের ভাগ্য।
বিশ্বকাপের ইতিহাস অবশ্য আর্জেন্টিনার পক্ষে কথা বলে। ১৯৬৬ সালে শেফিল্ডে ২-০, ২০১৪ সালেসাও পাওলোয় অতিরিক্ত সময়ের নাটক—দুবারই জিতেছে আলবিসেলেস্তেরা। সব মিলিয়ে সাত সাক্ষাতে আর্জেন্টিনার পাঁচ জয়, দুই ড্র। ২০১২ সালে সুইজারল্যান্ডের বার্নে ৩-১ গোলের জয়ে মেসি করেছিলেন আর্জেন্টিনার জার্সিতে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক।
ওই ম্যাচটার স্মৃতি নিয়েই হয়তো কানসাসে আবার সুইসদের মুখোমুখি হবেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।