১৯৫৪ বিশ্বকাপ
‘বার্নের অলৌকিক’ ম্যাচ এবং জার্মান সাম্রাজ্যের শুরু
১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর সেই ধূসর বিকেলে বিশ্বকাপ নামে যে মহাযাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই যাত্রার কোথাও পেলে-গারিঞ্চার সাম্বার ছন্দ, কোথাও ম্যারাডোনার ঈশ্বরপ্রদত্ত জাদুকরি ছোঁয়া, আবার কোথাও জিনেদিন জিদান কিংবা লিওনেল মেসির অমরত্বের পথে হেঁটে যাওয়া—সব মিলিয়েই তো এই ফুটবল-পুরাণ। ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে সেই সব রোমাঞ্চকর স্মৃতি ফেরানোর আয়োজন—ফিরে দেখা বিশ্বকাপ।
ফিরে আসা এবং রূপকথা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত তখনো টাটকা। যুদ্ধাপরাধের দায়ে ১৯৫০ বিশ্বকাপে নিষিদ্ধ থাকা জার্মানি ১৯৫৪ আসরে যখন ফিরল, তখন তাদের কেউ গোনায় ধরেনি। ড্রয়ের সময় তারা শীর্ষ বাছাইও ছিল না। অথচ সেই সাধারণ দলটিই কিনা ফাইনালে হারিয়ে দিল সেই সময়ের ফুটবলের অবিসংবাদিতভাবে সেরা দল হাঙ্গেরিকে! প্রথম পর্বে যে হাঙ্গেরির কাছে ৮-৩ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছিল জার্মানি, সেই হাঙ্গেরিকে ফাইনালে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়া—ফুটবল ইতিহাসে সে জন্য ওই ম্যাচটাকে বলা হয় ‘মিরাকল অব বার্ন’। এই জয় দিয়েই শুরু হলো ফুটবলে জার্মান সাম্রাজ্যের, যারা এরপর প্রতিটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে এবং জিতেছে আরও তিনটি শিরোপা।
জগাখিচুড়ি নিয়ম
ফরম্যাট ছিল বেশ অদ্ভুত। চার গ্রুপে ভাগ করা হয় ১৬ দলকে, যাদের মধ্যে আটটি বাছাই এবং অন্য আটটি অবাছাই। প্রতিটি গ্রুপের বাছাই দল দুটি শুধু অন্য দুটি অবাছাই দলের সঙ্গে খেলবে। আর কোনো ম্যাচ ড্র হলে ৩০ মিনিট সময় অতিরিক্ত খেলা হবে। গ্রুপে চারটি করে ম্যাচের পর দুটো সেরা দল পরের রাউন্ডে যাবে। শীর্ষ দুই দলের অবস্থান সমান হলে টস হবে।
তবে দুই আর তিনের বেলায় টস না রেখে প্লে-অফ খেলার নিয়ম করা হয়। এসব অদ্ভুত নিয়মের এখানেই শেষ নয়, চার গ্রুপ থেকে আটটি কোয়ালিফাই করা দল দুই গ্রুপে ভাগ হলো। অদ্ভুতভাবে, এক গ্রুপে চার গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন, অন্য গ্রুপে চার গ্রুপ রানার্সআপ।
গোলবন্যার বিশ্বকাপ
১৯৫৪ বিশ্বকাপ এখনো ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি গোল হওয়া আসর। ম্যাচপ্রতি গড়ে গোল হয়েছিল ৫.৩৮টি। আর সবচেয়ে বেশি গোলের ম্যাচ? কোয়ার্টার ফাইনালে অস্ট্রিয়া-সুইজারল্যান্ড। স্কোরলাইন ৭-৫! যেটা এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের এক ম্যাচে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড। লুসানের সেই কোয়ার্টার ফাইনালে ১৯ মিনিটেই সুইজারল্যান্ড ৩-০ গোলে এগিয়ে যায়। এরপর অস্ট্রিয়া টানা পাঁচ গোল করে। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই স্কোর দাঁড়িয়েছিল ৫-৪! দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১ গোল হয়েছিল প্রথম পর্বে হাঙ্গেরি ৮-৩ জার্মানি ম্যাচে!
মাথায় টিউমার
কোয়ার্টার ফাইনালে সেই অস্ট্রিয়া-সুইজারল্যান্ড ম্যাচেই ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। প্রতিপক্ষের একজনের কনুইয়ের আঘাতে কিছুক্ষণের জন্য জ্ঞান হারান সুইস ডিফেন্ডার ও অধিনায়ক রজার বোকে। পরে অসংলগ্ন কথা বলতে বলতেই খেলে গেলেন পুরো ম্যাচ। ম্যাচ শেষে ডাক্তার পরীক্ষা করে জানালেন—মাথায় টিউমার, অবিলম্বে অস্ত্রোপচার না হলে কয়েক মাসের মধ্যে মৃত্যু। অপারেশন সফল হলো। তবে বোকে আর কখনো সুইস জার্সি গায়ে দিতে পারেননি, বেঁচে ছিলেন আরও চল্লিশ বছর। মৃত্যু ১৯৯৪ সালে, ৭৩ বছর বয়সে।
ওভেনের উত্তাপে উলের জার্সি
স্কটল্যান্ডের বিশ্বকাপ অভিষেক ছিল ভুলে যাওয়ার মতো। সুইস গ্রীষ্মে প্রচণ্ড গরমে কাহিল হয়ে গিয়েছিল তাদের অবস্থা। উলের তৈরি মোটা ও লম্বা হাতার জার্সি নিয়ে সুইজারল্যান্ডে খেলতে এসেছিল স্কটিশরা। প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উলের জার্সি পরে খেলতে নেমে মাঠে আক্ষরিক অর্থেই যেন গলে গিয়েছিলেন স্কটিশ ফুটবলাররা। উরুগুয়ের কাছে তারা হেরেছিল ৭-০ গোলে। ডিফেন্ডার টমি ডোচার্টি পরে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমাদের ফেডারেশন ভেবেছিল সুইজারল্যান্ডে পাহাড় আছে মানেই সেখানে ঠান্ডা। আমার মনে হয় ওরা ভেবেছিল আমরা অ্যান্টার্কটিকায় অভিযানে যাচ্ছি!’
তুরস্কের লটারি ভাগ্য
বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে স্পেন ও তুরস্ক দুটি ম্যাচ খেলে সমান পয়েন্টে শেষ করল। রোমে নিরপেক্ষ মাঠে তৃতীয় ম্যাচ। কিন্তু শুরুর কিছুক্ষণ আগে ফিফার টেলিগ্রাম এল—হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত লাসলো কুবালাকে স্পেনের হয়ে নামানো যাবে না, নিবন্ধন নিয়মিতভাবে সম্পন্ন হয়নি। কুবালা তখন জার্সি পরে মাঠে নামার জন্য প্রস্তুত। স্পেন প্রতিবাদ জানিয়েই খেলল, আধিপত্য দেখাল। কিন্তু অতিরিক্ত সময়েও ২-২ সমতা। নিয়ম অনুযায়ী একটি হ্যাটে দুটি কাগজ রাখা হলো—স্পেন ও তুরস্ক। ফ্রাঙ্কো জেম্মা নামের এক বালককে ডাকা হলো একটি তুলতে। সে তুলল তুরস্কের নাম। অবিশ্বাস্য সৌভাগ্যে উচ্ছ্বসিত তুর্কিরা ছেলেটিকে সুইজারল্যান্ড নিয়ে গেল মাসকট হিসেবে। তবে ছেলেটির ভাগ্য তুরস্ককে প্রথম রাউন্ডের বাইরে নিয়ে যেতে পারেনি।
বার্নের যুদ্ধ
২৭ জুন বার্নে হাঙ্গেরি-ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনাল ইতিহাসে পরিচিত ‘ব্যাটেল অব বার্ন’ নামে। হাঙ্গেরি জিতল ৪-২ গোলে, কিন্তু গোলের চেয়ে মারামারির কথাই বেশি মনে রেখেছে ইতিহাস। ৭১ মিনিটে রেফারি আর্থার এলিস ব্রাজিলের নিলটন সান্তোস ও হাঙ্গেরির ইয়োজসেফ বোজসিককে একসঙ্গে বের করে দিলেন মারামারির কারণে। পাঁচ মিনিট পরে ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার হুম্বের্তোকেও বের করা হলো প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারকে ঘুষি মারার অপরাধে।
ম্যাচের পর ব্রাজিলের মাওরো রাফায়েল মরিনহো হাত বাড়ালেন হাঙ্গেরির জিলতান জিবোরের দিকে—বন্ধুত্বের ইঙ্গিতে। জিবোর ডান হাত মেলাতেই বাঁ হাত দিয়ে চোয়ালে ঘুষি। শুরু হলো মারামারি—খেলোয়াড়, সাবস্টিটিউট, কোচিং স্টাফ সবাই মিলে। আহত পুসকাস মাঠে ঢুকে বোতল ছুড়ে মারলেন ব্রাজিলিয়ান এক মিডফিল্ডারের মুখে। রক্তাক্ত ওই খেলোয়াড়কে সরিয়ে নেওয়া হলো। ব্রাজিলের কোচ জেজে মোরেইরা প্রতিপক্ষের কোচ গুস্তাভ সেবেসের মাথায় বুট ছুড়ে মারলেন। সেলাই লাগল সেবেসের কপালে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার, এ ঘটনায় কারও শাস্তি হয়নি, একজনেরও না।
এবং দ্য মিরাকল অব বার্ন
হাঙ্গেরি দলটা তখন ছিল আক্ষরিক অর্থেই অপ্রতিরোধ্য—কিংবদন্তি ফেরেঙ্ক পুসকাসের নেতৃত্বে টানা ৩১ ম্যাচ অপরাজিত ফাইনালের আগপর্যন্ত। পুসকাসের সঙ্গে তাঁর সতীর্থ ককসিস, হিদেকুটি, চিবরদের নিয়ে গড়া দলটা বিশ্বকাপে ফাইনালে ওঠার পথে চার ম্যাচে দিয়েছিল ২৫ গোল! মজার ব্যাপার হলো, সেই আসরের প্রতিটি ম্যাচেই হাঙ্গেরি শুরুতে ২-০ গোলে এগিয়ে যেত। ফাইনালেও তারা তাই করেছিল। কিন্তু জার্মানরা সেদিন দেখিয়েছিল, রেফারির শেষ বাঁশি বাজার আগে হাল ছাড়তে নেই। প্রথমার্ধেই জার্মানি ২-২ সমতা ফেরায়।
বিরতির সময় বার্নের ওয়াঙ্কডর্ফ স্টেডিয়ামে নামল মুষলধারে বৃষ্টি। মাঠ মুহূর্তেই কর্দমাক্ত। আর এখানেই পাশার দান উল্টে দিলেন জার্মান জুতোর কারিগর আডলফ ‘আডি’ ড্যাসলার। বিশ্বযুদ্ধের পর দুই ভাই আডি আর রুডি আলাদা হয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘অ্যাডিডাস’ ও ‘পিউমা’। আডি ড্যাসলার জার্মান দলের জন্য এমন এক বুট বানিয়েছিলেন, যার নিচের স্পাইকগুলো আবহাওয়া অনুযায়ী বদলে নেওয়া যেত। বৃষ্টির কাদাটে মাঠ দেখে কোচ সেপ হারবার্গারের নির্দেশে জার্মান খেলোয়াড়েরা লম্বা স্পাইক লাগিয়ে মাঠে নামলেন। হাঙ্গেরির খেলোয়াড়েরা তখন ভেজা ঘাসে বারবার পিছলে পড়ছিলেন। ৮৪ মিনিটে হাঙ্গেরির গোলকিপার গুলা গ্রোশিচ মাঠে পিছলে পড়লেন, জার্মানি দিল তৃতীয় গোল। শেষ বাঁশি বাজল ৩-২।
বিশ্বজয়ী জার্মান দলটাকে নিয়ে বার্ন থেকে ট্রেন যখন সীমান্তের প্রথম স্টেশন জেসটেটেনে পৌঁছাল, ৬ হাজার জার্মান ভক্ত ট্রেনের লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন প্রিয় নায়কদের দেখতে। মিউনিখের মেয়র সেদিন স্কুল, কলেজ, ব্যাংক, অফিস সব ছুটি ঘোষণা করেছিলেন। সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে বরণ করে নিয়েছিলেন তাঁদের নায়কদের।