এমবাপ্পে–ইয়ামালের টানাটানিতে ব্যালন ডি’অর কার
ব্যালন ডি’অর ট্রফি এখন চাইলে বাংলাদেশে সিনেমার একটি জনপ্রিয় গান অনুকরণ করে বলতে পারে, ‘বিধি তুমি বলে দাও, আমি কার। দুটি মানুষ একটি ট্রফির দাবিদার।’
লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সোনালি সময়ে কিন্তু পরিস্থিতি এমনই ছিল। সেটা ২০০৮ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত। ব্যালন ডি’র জয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল দুই কিংবদন্তির। ব্যালন ডি’অর ট্রফির প্রাণ থাকলে হয়তো তখন ঠিক–ই ২০০০ সালে বাংলাদেশে মুক্তিপ্রাপ্ত সেই সিনেমার গানের অনুকরণে এমন কিছুই গাইত। মেসি সেভাবে সরাসরি কখনো কিছু না বললেও রোনালদো সেই সময় এই ট্রফি জয়ে সব সময়ই নিজের দাবির পক্ষে সরব ছিলেন।
লামিনে ইয়ামাল ও কিলিয়ান এমবাপ্পের বদৌলতে সেই সময়টা বুঝি আবার ফিরে এল!
মেসি–রোনালদোর যৌবন গত হওয়ার পর অবশ্য সেরার প্রশ্নে তাঁদের নামই আগে উঠে আসে। এবার ব্যালন ডি’অর জয় নিয়েও টানাটানি লেগে গেছে দুজনের। বেচারা ট্রফিটা তাই অনুচ্চারে বিধির কাছে প্রশ্ন তুলতে পারে, ‘আমি কার?’
এবার ব্যালন ডি’অর জয়ে মনোনীতদের সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করা হয় গত সপ্তাহে। এর পর থেকেই এই পুরস্কার কার জেতা উচিত, তা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হচ্ছে।
মনোনীতদের মধ্যে এমবাপ্পে ও ইয়ামালও আছেন। হ্যারি কেইনের সঙ্গে তাঁরা এ পুরস্কার জয়ে অন্যতম দাবিদারও। কিন্তু কেইন সেভাবে এই ট্রফি জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে কথা না বললেও নিজ নিজ দাবির পক্ষে সরব হয়েছেন এমবাপ্পে ও ইয়ামাল।
ঠিক যেভাবে মেসি ও রোনালদো বার্সেলোনা এবং রিয়াল মাদ্রিদে থাকতে এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝাঁজ পাওয়া যেত, তেমন। কাকতালীয় বিষয়, বর্তমান দুই প্রতিদ্বন্দ্বীও বার্সা ও রিয়ালের। তার মধ্যে রিয়াল তারকা এমবাপ্পে মুখ খোলেন সবার আগে। কেউ কেউ অতীত স্মরণ করে মিলিয়ে নিতে পারেন রিয়ালে রোনালদোর দিনগুলোকেও। সাধারণত রোনালদোই ব্যালন ডি’অর দেওয়ার মৌসুম এলে এ নিয়ে নিজের দাবির পক্ষে কথা বলতেন বেশি।
চ্যাম্পিয়নস লিগে ইন্টার মিলানের বিপক্ষে ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনে এমবাপ্পে বলেছেন, ‘খেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় (বিশ্বকাপে) আমি অনেক ইতিহাস গড়েছি। ব্যালন ডি’অর জয়ের জন্য এটি দারুণ একটি বছর।’ পরে ফরাসি দৈনিক ‘লেকিপ’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও একই কথা বলেন ফরাসি তারকা।
সেই সময়ে সাধারণত দেখা যেত, পাঁচবার ব্যালন ডি’অরজয়ী রোনালদো এ ট্রফি জয়ে নিজের দাবি জোরাল করলে মেসি তেমন প্রতিক্রিয়া দেখাতেন না। কিন্তু ফরাসি তারকা এমবাপ্পে তাঁর দাবি উপস্থাপনের পর সরব হয়েছেন বার্সার স্প্যানিশ তারকা ইয়ামাল।
সম্প্রতি স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম ‘মুভিস্টার প্লাস’–এ একটি সাক্ষাৎকার দেন ইয়ামাল। গতকাল তার সেই সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ প্রকাশ করা হয়। সেখানে ইয়ামাল বলেন, ‘আমার মতে, এমবাপ্পে আর আমি—আমরাই বিশ্বের সেরা দুই খেলোয়াড়। সত্যি বলতে, আমার মনে হয়, বিশ্বের সেরা হিসেবে হয়তো আমাদের দুজনেই আছি এবং আমি যা জিতেছি, সেটির ওপর ভিত্তি করে এই বছর এটি আমারই প্রাপ্য। বিষয়টি আমার কাছে একদম পরিষ্কার এবং যারা ম্যাচগুলো দেখে, তারাও তা জানে।’
দুজনের এই দাবির পক্ষেই কিন্তু যথেষ্ট যুক্তি আছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক।
সর্বশেষ বিশ্বকাপেই এই টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটি অনেকের ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যান এমবাপ্পে। মোট ২২টি গোল করেছেন। ফ্রান্সকে সেমিফাইনালে তোলার পথে ১০ গোল করে ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে জেতেন দ্বিতীয় গোল্ডেন বুট। বিশ্বকাপের আগে রিয়ালের হয়ে মৌসুমে ৪২ গোল করার পাশাপাশি ৭টি গোলও করান এই ফরোয়ার্ড। তবে রিয়াল বড় কোনো ট্রফি জিততে পারেনি।
গত বছরের ব্যালন ডি’অর জয়ে দ্বিতীয় হওয়া ইয়ামাল স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ে দারুণ ভূমিকা রাখেন। বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা জয় এবং চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠায়ও রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বার্সার হয়ে গত মৌসুমে ৪৫ ম্যাচে ২৪ গোল করার সঙ্গে ১৮ গোলও করান এই উইঙ্গার।
তবে শক্ত দাবিদার আছেন আরও দুজন। গতবার ব্যালন ডি’অরজয়ী পিএসজি তারকা উসমান দেম্বেলে মনে করেন, ফরাসি ক্লাব চ্যাম্পিয়নস লিগ ধরে রাখায় এই ট্রফি পিএসজির কোনো খেলোয়াড়ের হাতেই থাকা উচিত। কেইনের কথা তো আগেই বলা হলো। তাঁর পারফরম্যান্সটাও জেনে নিন—বুন্দেসলিগায় ৩১ ম্যাচে ৩৬ গোল। ইউরোপে শীর্ষ পাঁচ লিগে কেউ তাঁর চেয়ে বেশি গোল করতে পারেননি। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৬৪ গোল। এর সঙ্গে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে ৬ গোল, দল টুর্নামেন্ট শেষ করেছে তৃতীয় হয়ে।
আগামী ২৬ অক্টোবর লন্ডনে দেওয়া হবে এবারের ব্যালন ডি’অর ট্রফি। গত মৌসুমে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে ভোট দেন নির্বাচিত আন্তর্জাতিক সাংবাদিকেরা। ফিফা পুরুষ র্যাঙ্কিংয়ের সেরা ১০০টি দেশ এবং নারী র্যাঙ্কিংয়ে সেরা ৫০ দেশের প্রতি দেশ থেকে একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে এই প্যানেল গঠিত হয়।
প্রত্যেক ভোটার তাঁদের সেরা ১০ জন প্রার্থীর একটি তালিকা করেন, যেখানে অধঃক্রম বা কমতে থাকা ক্রমানুসারে পয়েন্ট দেওয়া হয়। তাঁরা মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ভোট দেন—ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, দলীয় অর্জন ও খেলোয়াড়সুলভ আচরণ বা ফেয়ার প্লে।
এবার তাহলে ব্যালন ডি’অর কার? ইয়ামাল–এমবাপ্পে তো ইতমধ্যেই টানাটানি শুরু করেছেন।