চ্যাম্পিয়নস লিগের ড্র: কার সামনে সহজ পথ, কার জন্য কঠিন পরীক্ষা
চ্যাম্পিয়নস লিগের লিগ পর্বের ড্রয়ে সব দলের ভাগ্য এক রকম হয়নি। কেউ পেয়েছে তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ, কারও সামনে আবার শুরুতেই একের পর এক কঠিন পরীক্ষা। ছয়বারের চ্যাম্পিয়ন লিভারপুল যেমন পেয়েছে স্বস্তিদায়ক সূচি, তেমনই বার্সেলোনা ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে শুরু থেকেই সামলাতে হবে ইউরোপের শীর্ষ শক্তিগুলোকে। ড্র শেষে কোন দল খুশি হতে পারে; আর কার কপালে জুটেছে কঠিন পথ?
যে সব দল খুশি হতে পারে
১. লিভারপুল
ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় এর আগে কোনো দলকে কোচ হিসেবে পরিচালনা করেননি আন্দনি ইরাওলা। লিভারপুলের নতুন কোচের জন্য তাই চ্যাম্পিয়নস লিগে অভিষেকটা হতে পারত কঠিন পরীক্ষা; কিন্তু ড্রয়ের পর আপাতত স্বস্তিতে থাকারই কথা তাঁর।
পট–১ থেকে পিএসজি, রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা ও বায়ার্ন মিউনিখের মতো বড় দলকে এড়িয়েছে লিভারপুল। এই পটের দলগুলোর মধ্যে তাদের প্রতিপক্ষ ইন্টার মিলান ও আতলেতিকো মাদ্রিদ। এই দুই ম্যাচ ছাড়া বাকি ছয় ম্যাচে লিভারপুল পরিষ্কার ফেবারিট।
ক্লাব ব্রুগা, ভিয়ারিয়াল, ফেনেরবাচে, লাঁস ও লাস্কের বিপক্ষে ম্যাচগুলোতে পয়েন্ট পাওয়ার ভালো সুযোগ আছে ছয়বারের চ্যাম্পিয়নদের। তবে অস্ট্রিয়ায় লাস্কের মাঠে ম্যাচটি একটু সতর্ক হয়ে খেলতে হবে। সেল্টিকের বিপক্ষে প্লে-অফে প্রথম লেগে চার গোলের ঘাটতির পরও ঘুরে দাঁড়িয়ে লিগ পর্বে জায়গা করে নিয়েছে দলটি।
২. আতলেতিকো মাদ্রিদ
চ্যাম্পিয়নস লিগে বারবার স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে আতলেতিকো মাদ্রিদের। এবার ট্রফি জিততে চাইলে এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর কী হতে পারে! কারণ, এবারের ফাইনাল হবে তাদেরই ঘরের মাঠ মেত্রোপলিতানো স্টেডিয়ামে।
বায়ার্ন মিউনিখ, লিভারপুল ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মতো দল আছে আতলেতিকোর প্রতিপক্ষ হিসেবে। তারপরও শেষ ষোলোতে ওঠার পথটা বেশ স্বস্তিরই মনে হচ্ছে।
মাদ্রিদে ইউনাইটেডকে হারানোর মতো সামর্থ্য আতলেতিকোর আছে। পিএসভি, ফেনেরবাচে, ভাইকিং ও স্টুটগার্টের বিপক্ষে ম্যাচগুলোতেও তিন পয়েন্ট পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে নরওয়েতে বোডো/গ্লিমটের বিপক্ষে ম্যাচটি কঠিন হতে পারে। গত মৌসুমের লিগ পর্বের শেষ ম্যাচে মেত্রোপলিতানোতেই আতলেতিকোকে ২–১ গোলে হারিয়েছিল নরওয়ের দলটি।
৩. সাবাহ এফকে
আপাতদৃষ্টিতে আজারবাইজানের চ্যাম্পিয়ন সাবাহর ড্রকে দুঃস্বপ্নই মনে হবে। অভিষেক মৌসুমেই তাদের প্রতিপক্ষ বার্সেলোনা, বরুসিয়া ডর্টমুন্ড, আর্সেনাল ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।
কিন্তু ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ক্লাবটির জন্য এই ড্র–ই হয়তো স্বপ্নের মতো। চ্যাম্পিয়নস লিগে অভিষেকেই ইউরোপের চার সাবেক চ্যাম্পিয়নের বিপক্ষে খেলার সুযোগ পাচ্ছে তারা।
বার্সেলোনা ও ডর্টমুন্ডকে যেতে হবে আজারবাইজানে। তবে সাবাহর নিজেদের মাঠ উয়েফার মানদণ্ড পূরণ না করায় ম্যাচ হবে বাকুর তোফিক বাহরামভ স্টেডিয়ামে; আর আর্সেনাল ও ইউনাইটেডের বিপক্ষে খেলতে সাবাহ যাবে যথাক্রমে এমিরেটস ও ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে।
নাপোলি ও ভিয়ারিয়ালের মতো দলও আছে তাদের সূচিতে। এতে ফলাফল যা-ই হোক, সাবাহর জন্য স্মরণীয় একটি মৌসুম অপেক্ষা করছে।
৪. রিয়াল মাদ্রিদ
রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হিসেবে আবার ফিরেছেন জোসে মরিনিও। ড্রয়ে পেয়েছেন নিজের সাবেক দুই ক্লাব ইন্টার মিলান ও রোমাকে। এর মধ্যে ইন্টারের বিপক্ষে ম্যাচটির আবেগ আলাদা। ২০১০ সালে রিয়ালের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ইন্টারকে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতিয়েছিলেন মরিনিও। এবার সেই মাঠেই ইন্টারকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পাবেন তিনি।
ইন্টারের বিপক্ষে ঘরের ম্যাচটি বাদ দিলে আর্সেনালের মাঠে খেলাই রিয়ালের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হতে পারে। ম্যাচটি ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের জন্যও বাড়তি আগ্রহের। রিয়ালে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত না নিলে এই মৌসুমে হয়তো প্রিমিয়ার লিগের চ্যাম্পিয়নদের জার্সিতে তাঁকে দেখা যেত।
রোমায় ফিরতি যাত্রাও থাকছে মরিনিওর। তবে পিএসভি আইন্দহভেন, আরবি লাইপজিগ, শাখতার দোনেৎস্ক, লাস্ক ও এইকে এথেন্সের বিপক্ষে রিয়ালের বড় সমস্যায় পড়ার কথা নয়। শাখতারের বিপক্ষে ম্যাচটি হবে মরিনিওর আরেক পুরোনো ঠিকানা স্টামফোর্ড ব্রিজে। সব মিলিয়ে ড্র নিয়ে খুশিই হওয়ার কথা রিয়ালের।
যে সব দলের জন্য কঠিন হতে পারে
১. বার্সেলোনা
২০২৫ সালে সেমিফাইনাল আর ২০২৬ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে থামতে হয়েছে বার্সেলোনাকে। হান্সি ফ্লিকের দল এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে ট্রফি জিততে চায়। টানা দুই মৌসুম লা লিগা জেতা বার্সেলোনা সর্বশেষ চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছিল ২০১৫ সালে।
কিন্তু এবার শুরু থেকেই কঠিন পথ। পট–১ থেকে ম্যানচেস্টার সিটি ও পিএসজি—দুই দলই পড়েছে তাদের সঙ্গে। পট–২ থেকে পেয়েছে উনাই এমেরির অ্যাস্টন ভিলা। পট–৩-এর প্রতিপক্ষ গালাতাসারাই, যাদের মাঠে খেলা মানেই কঠিন পরিবেশ। আর পট–৪ থেকে তুলনামূলক কঠিন দুই প্রতিপক্ষ কোমো ও সাবা।
লামিনে ইয়ামালদের নকআউট পর্বে যাওয়ার সামর্থ্য অবশ্যই আছে, কিন্তু এবার সেই পথটা মোটেও সরল নয়।
২. ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড
দুই বছর পর ইউরোপের সেরা ক্লাব প্রতিযোগিতায় ফিরেছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। প্রিমিয়ার লিগে অনিশ্চিত শুরুর পর এবার চ্যাম্পিয়নস লিগেও মাইকেল ক্যারিকের দলকে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে।
পট–১ থেকে বায়ার্ন মিউনিখ পাওয়াই বড় ধাক্কা। গত মৌসুমে সেমিফাইনালে খেলা বায়ার্ন যে কোনো দলের জন্যই কঠিন প্রতিপক্ষ। তার ওপর আতলেতিকো মাদ্রিদের মাঠ মেত্রোপলিতানোতে খেলতে হবে ইউনাইটেডকে। দিয়েগো সিমিওনের দলের মাঠের পরিবেশ সামলানো সহজ নয়।
বাকি ম্যাচগুলোর কোনটিতে ইউনাইটেড নিশ্চিতভাবে তিন পয়েন্ট পাবে, সেটিও বলা কঠিন। ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে জয়ের সুযোগ আছে; কিন্তু সেই ম্যাচ হবে স্পেনে। সাবার বিপক্ষে অন্তত ঘরের মাঠে খেলবে ইউনাইটেড। তবে কোমোর মাঠে ম্যাচটি কঠিন হতে পারে।
৩. ভিয়ারিয়াল
গত মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগ ভিয়ারিয়ালের জন্য ছিল হতাশাজনক। ২০২২ সালে সেমিফাইনাল এবং ২০২১ সালে ইউরোপা লিগ জেতা দলটি লিগ পর্বের আট ম্যাচে পেয়েছিল মাত্র এক পয়েন্ট। ৩৬ দলের মধ্যে শেষ করেছিল ৩৫তম হয়ে।
নতুন কোচ ইনিও পেরেজের সামনে এবারও কঠিন পরীক্ষা। পিএসজি, লিভারপুল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ডর্টমুন্ড ও নাপোলি—এই পাঁচ দলের বিপক্ষে ভিয়ারিয়ালকে আন্ডারডগ হিসেবে নামতে হবে। ফেনেরবাচের মাঠে খেলাটাও সহজ হওয়ার কথা নয়।
পট–৪-এর সাবা ও স্লাভিয়া প্রাগের বিপক্ষে অন্তত ভালো ফল করে গত মৌসুমের এক পয়েন্টের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়াই এখন ভিয়ারিয়ালের প্রথম লক্ষ্য হতে পারে।
৪. অ্যাস্টন ভিলা
প্রিমিয়ার লিগে মৌসুমের শুরুটা ভালো হয়নি অ্যাস্টন ভিলার। তার ওপর গ্রীষ্মে মরগান রজার্স, এজরি কনসা ও ইউরি টিলেমানসের মতো গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের হারিয়েছে তারা। এর মধ্যেই চ্যাম্পিয়নস লিগে পেয়েছে পট–১-এর দুই বড় দল পিএসজি ও বার্সেলোনাকে। পট–২-এর ডর্টমুন্ড ও ক্লাব ব্রুগাও সহজ প্রতিপক্ষ নয়। গালাতাসারাইয়ের মাঠে দীর্ঘ ও কঠিন সফর করতে হবে। আর নরওয়ের ভাইকিংও ভিলার জন্য অচেনা প্রতিপক্ষ।
ফলে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় উনাই এমেরির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা যা এবার অ্যাস্টন ভিলার ভরসা। তবে কঠিন এই লিগ পর্ব পেরোতে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ভাগ্যেরও প্রয়োজন হবে।