ম্যারাডোনা–মেসি থেকে জাভি: বার্সায় কিংবদন্তি হওয়া কি অভিশাপ

বার্সায় জাভি ও মেসি কারও বিদায় সুখকর হলো নাএএফপি

ডিয়েগো ম্যারাডোনা, লিওনেল মেসি, রোনাল্ড কোমান, জাভি হার্নান্দেজ...এই কিংবদন্তিদের মাঝে কিছু সাদৃশ্য আছে। তবে সবচেয়ে বড় সাদৃশ্য হচ্ছে তাঁরা সবাই কোনো না কোনো সময় বার্সেলোনার হয়ে খেলেছেন। এ মিলের বাইরে আরও একটি মিল আছে—বার্সেলোনা থেকে তাঁদের কারও বিদায়ই সুখকর হয়নি, কোচ বা খেলোয়াড় কোনো ভূমিকাতেই নয়। কোনো অদ্ভুত কারণে এ কিংবদন্তিদের অনেকেই বার্সা ছেড়েছেন হতাশা, রাগ এবং বেদনা নিয়ে। কিংবদন্তি হয়েও শেষ পর্যন্ত পাননি কিংবদন্তির মর্যাদা।

ফ্রাস্ট্রেশন (হতাশা)—ডিয়েগো ম্যারাডোনার আত্মজীবনী ‘এল ডিয়েগো’র একটি অধ্যায়ের নাম। এই অধ্যায়ের পুরোটাজুড়ে ম্যারাডোনা লিখেছেন বার্সেলোনায় তাঁর কাটানো হতাশাজনক সময়ের বৃত্তান্ত। ১৯৮২ সালের জুনে সে সময়ের বিশ্ব রেকর্ড গড়ে ৫০ লাখ পাউন্ডে বোকা জুনিয়র্স থেকে বার্সেলোনায় নাম লেখান ম্যারাডোনা। বার্সায় গিয়ে সিজার লুইস মেনোত্তির অধীনে রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে কোপা দেল রের শিরোপা জেতেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। জেতেন কোপা দে লা লিগা এবং সুপারকোপার শিরোপাও।

আরও পড়ুন

১৯৮৩ সালের জুনে এল ক্লাসিকোতে রিয়ালের মাঠে গিয়ে গোল করে বার্সাকে জয় এনে দেন ম্যারাডোনা। সেদিন রিয়ালের সমর্থকেরাও ‘শত্রুতা’ ভুলে অভিবাদন জানিয়েছিল বাঁ পায়ের জাদুকরকে। ২০০৫ সালে রোনালদিনিওর আগে ম্যারাডোনাই ছিলেন একমাত্র বার্সা খেলোয়াড়, যিনি রিয়ালের মাঠে গিয়ে অভিবাদন পেয়েছিলেন।

কিন্তু বার্সাকে এমন জাদুকরি সময় উপহার দেওয়া ম্যারাডোনার সময়টা সেখানে মোটেই সুখকর হয়নি। কাতালানদের ‘অদ্ভুতদর্শন’ আচার-আচরণ কখনোই পছন্দ হয়নি তাঁর। তবে বার্সায় ম্যারাডোনার সবচেয়ে বড় সমস্যার নাম ছিলেন সে সময়ের ক্লাব সভাপতি হোসে লুইস নুনিয়েজ। আত্মজীবনীতে যাঁকে ম্যারাডোনা সম্বোধন করেছেন, ‘প্রচারসর্বস্ব’ মানুষ বলে।

বার্সেলোনায় খেলার দিনগুলোতে ম্যারাডোনা
সংগৃহীত

সাবেক এই ক্লাব সভাপতিকে নিয়ে ম্যারাডোনা লিখেছেন, ‘সংবাদমাধ্যমে মুখ দেখানোর জন্য তিনি যেকোনো কিছু করতে পারতেন।’ বনিবনা না হওয়ায় মাত্র দুই বছরের মাথায় শেষ হয়ে যায় ম্যারাডোনার বার্সেলোনা-অধ্যায়। হতাশা নিয়েই শেষ পর্যন্ত দলবদলের আরেকটি নতুন রেকর্ড গড়ে (৬০ লাখ ৯০ হাজার পাউন্ড) নাপোলিতে যোগ দেন ম্যারাডোনা।

ম্যারাডোনা অবশ্য বার্সায় সাফল্যের চূড়া স্পর্শ করেননি। কিন্তু মেসি? কারও কারও মতে, যিনি সর্বকালের সেরা ফুটবলার। বার্সায় মেসির শ্রেষ্ঠত্ব নিরঙ্কুশ। তাঁর হাত ধরেই সোনালি যুগের দেখা পেয়েছিল বার্সা। কাতালুনিয়ার ক্লাবটিই ছিল মেসির ধ্যানজ্ঞান। বার্সার হয়ে সম্ভাব্য সব শিরোপার দেখাও পেয়েছিলেন মেসি। চারবার জিতেছেন চ্যাম্পিয়নস লিগ। ব্যক্তিগত মাইলফলকেও সবাইকে ছাপিয়ে যোজন যোজন এগিয়ে গিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি।

আরও পড়ুন

কিন্তু সেই মেসির বিদায় হয়েছে মর্মান্তিকভাবে। বিদায়ের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেও মেসি জানতেন, তাঁর চুক্তি নবায়ন হতে যাচ্ছে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে রহস্যজনকভাবে বদলে যায় সব সমীকরণ। দুপুরে যে চুক্তিকে সময়ের ব্যাপার মনে হচ্ছিল, রাত হতে না হতেই তা অসম্ভব হয়ে ওঠে। এরপর চোখের জলে ভেসে বার্সা ছেড়ে যান মেসি। ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে মেসির ফের বার্সায় ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেবারও মেসিকে ফেরানোর যথেষ্ট উদ্যোগ নিতে পারেনি ক্লাবটি। ফলে মেসিরও শেষ পর্যন্ত আর ফেরা হয়নি আঁতুড়ঘরে।

এর আগে ২০১৪ সালেই কিংবদন্তিদের সঙ্গে বার্সার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন দানি আলভেজ। বার্সার এই কিংবদন্তি খেলোয়াড় সে সময় বলেছিলেন, ‘যে মানুষগুলো বার্সা পরিচালানা করেন, তাঁরা জানেন না নিজেদের খেলোয়াড়দের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হয়।’ এরপর ২০১৭ সালে নেইমারের বিদায় নিয়েও অনেক জল ঘোলা করেছিল বার্সা। এই ব্রাজিলিয়ান তারকার বিদায়ও হয়নি সুখকর। এমনকি নেইমার বার্সা ছাড়ার পর দুই পক্ষের বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল।

বার্সেলোনা থেকে বিদায় নেওয়ার সময় কান্নায় ভেসেছেন মেসি
এএফপি

একইভাবে ১৯৯৭ সালে রহস্যজনকভাবে ক্লাব ছাড়তে হয়েছিল আরেক ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিওকে। বিদায়ের এক মাস আগেও চুক্তি নবায়ন হওয়ার ব্যাপারে সবকিছু চূড়ান্ত হয়েছিল। কিন্তু কদিন পরই বার্সা সভাপতি ও আইনজীবীরা রোনালদোকে জানান, চুক্তি সম্ভব নয়। এভাবে চুক্তি প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ার কারণ অস্পষ্টই থেকে গেছে ‘দ্য ফেনোমেনন’ খ্যাত এই কিংবদন্তির কাছে।

এরপর রোনাল্ড কোমানের অভিজ্ঞতাও ছিল হতাশাজনক। খেলোয়াড় হিসেবে বার্সার হয়ে চারটি লিগ ও ১টি চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা কোমান কোচ হয়ে এসেছিলেন ২০২০ সালে। ব্যর্থতার দায়ে পরের বছরই চাকরি হারান তিনি। বার্সায় নিজের কোচিংয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে কোমান বলেছিলেন, ‘বার্সার কোচ হওয়া মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বড় আঘাত। সেখানে শুধু চাপ আর চাপ।’

আরও পড়ুন

এবার একই পরিণতি জাভিরও। অথচ গত জানুয়ারিতে জাভি নিজেই মৌসুম শেষে সরে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কোচ সন্ধানে ব্যর্থ হয়ে সেই জাভির কাছেই ফিরে এসেছিল ক্লাবটি। জাভিও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে চেয়েছিলেন কোচ হিসেবে অপূর্ণতা ঘোচাতে। কিন্তু ক্লাব কিংবদন্তিদের ‘অপমানের’ ধারা অব্যাহত রেখে জাভিকেও শেষ পর্যন্ত বরণ করতে হলো মেসি–ম্যারাডোনার পরিণতি। বার্সেলোনা বরখাস্ত করেছে তাঁকে। মৌসুম শেষেই বিদায় নিতে হচ্ছে জাভিকে।

আরও পড়ুন

জাভির প্রতি এমন আচরণ মানতে পারছেন না বার্সেলোনার প্রতিদ্বন্দ্বী সেভিয়ার কোচ কিকে সানচেজ ফ্লোরেসও। বার্সেলোনার বিপক্ষে ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনে বার্সা কর্তৃপক্ষের সমালোচনায় সানচেজ বলেছেন, ‘আমার এটা বলা উচিত নয়। কিন্তু কী বাজেভাবেই না বার্সা তাদের কিংবদন্তিদের সঙ্গে আচরণ করে! কী একটা বাজে ধারা। এটা খুবই খারাপ চর্চা। কোমান, মেসি আর এখন জাভির সঙ্গে এমনটা হলো। আমার প্রত্যাশা, ক্লাবগুলো তাদের কিংবদন্তিদের সঙ্গে ভালো আচরণ করবে। সেটা অসাধারণ একটা ব্যাপার হবে।’

তবে বার্সা তাদের ধারা বদলায়নি। আর না হলে সেখানে কিংবদন্তিদের কেনই বারবার এভাবে অপদস্থ হয়ে বিদায় নিতে হবে? ক্লাবের এমন আচরণ ক্ষুব্ধ করেছে সমর্থকদেরও। সব মিলিয়ে একজন কিংবদন্তি হিসেবে জাভির এমন বিদায় খুব বাজে এক দৃষ্টান্ত হয়েই থাকল!