৬ ম্যাচ, ৭ শট, ৭ গোল: বার্সেলোনা ছেড়ে পিএসজিতে গিয়ে এ কী রূপ নিলেন তোরেস

সব মিলিয়ে পিএসজির হয়ে ৩২৫ মিনিট মাঠে ছিলেন তোরেস, গোলমুখে সাতটা শট নিয়েছেন, সাতটাই গোল!ইনস্টাগ্রাম

ছয়টা ম্যাচ, সাতটা শট, সাতটা গোল!
একজন নাম্বার নাইনের কাছে দল আর কী চাইতে পারে। তার ওপর সেই নাম্বার নাইন যদি দলের মূল স্ট্রাইকার না হন, যদি তিনি খেলেন স্রেফ বদলি নেমে, তাহলে এই পরিসংখ্যানটা কীভাবে দেখবেন? দুর্দান্ত নয় কি? পিএসজির সেই নাম্বার নাইনের নাম ফেরান তোরেস।

আরও পড়ুন

বিশ্ব ফুটবলে ঠিক ওই অর্থে তিনি বড় তারকা হয়ে উঠতে পারেননি। অথচ স্পেনকে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ট্রফি এনে দেওয়া গোলটা তাঁর। দুই মাস আগে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালের একমাত্র গোল তাঁকে এনে দিয়েছিল ম্যাচসেরার পুরস্কারও। কী কাকতাল, ওই ম্যাচেও তিনি স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের প্রথম পছন্দ ছিলেন না। বদলি নেমেছিলেন ৬২ মিনিটে।

প্রতি ৪৭ মিনিটে একটা করে গোল তোরেসের।
ইনস্টাগ্রাম

বিশ্বকাপে ওই রকম একটা কীর্তির পরও কিন্তু স্পেন দলে রদ্রি বা ইয়ামালদের যে তারকাখ্যাতি, ফেরান তোরেস তার ধারেকাছে যেতে পারেননি। কিছুটা অলক্ষ্যেই তাই নতুন মৌসুমে দলবদল করে বার্সেলোনা থেকে পাড়ি জমিয়েছিলেন প্যারিসে। পিএসজিও তাঁকে নিয়ে কোনো ঢাকঢোল পেটায়নি, জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান করে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দেয়নি। আসলে লুইস এনরিকে তাঁকে নিজের দলে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে নেননি, নিয়েছিলেন বিকল্প হিসেবে। কিন্তু তোরেস শুধু বিকল্প হয়ে থাকতে চাননি যে!

আরও পড়ুন

প্যারিসে পা রাখার পর তাই তিনি খুব বেশি সময় নিলেন না। লিগ আঁ-তে রেনের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই বদলি নেমে জোড়া গোল, চ্যাম্পিয়নস লিগে পিএসজির জার্সিতে অভিষেকেই হ্যাটট্রিক, কী অবিশ্বাস্য শুরু! বার্সেলোনায় তিনি যে তোরেস ছিলেন, প্যারিসে গিয়ে যেন হয়ে উঠেছেন সেটারই এক আপগ্রেড ভার্সন। আরও ধারালো, আরও নির্দয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই লুইস এনরিকের দলে তাই তিনি হয়ে উঠেছেন আক্রমণের অন্যতম প্রধান অস্ত্র।

সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে পিএসজির হয়ে এই মৌসুমে ছয়টা ম্যাচে মাঠে নেমেছেন তোরেস।
ইনস্টাগ্রাম

গত রাতে মার্শেইয়ের বিপক্ষে ক্লাসিকো ম্যাচটাই দেখুন না। গোল পাচ্ছিল না পিএসজি। কোচ এনরিকের তখন এমন কাউকে দরকার, যে গোল করতে পারবে, ম্যাচ বদলে দিতে পারবে। ৫৯ মিনিটে বদলি নামানো হলো তোরেসকে। ৬৬ মিনিটে গোল করে এগিয়ে দিলেন পিএসজিকে। ছয় মিনিট পরই অবশ্য সমতায় ফেরে মার্শেই, গোল করেন অ্যাঞ্জেল গোমেস। কিন্তু সেই সমতা টিকল মাত্র তিন মিনিট। ৭৫ মিনিটে মার্কিনিওস গোল করে আবার এগিয়ে দেন পিএসজিকে। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবধানেই জয়।

জয়টা শুধু পিএসজিকে তিন পয়েন্টই দেয়নি, দিয়েছে মৌসুমের শুরুর দিকের জড়তা কাটিয়ে জেগে ওঠার আত্মবিশ্বাসও। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা তিন জয় বলছে, পিএসজি আবার ছন্দ খুঁজে পাচ্ছে। আর সেই ছন্দের কেন্দ্রে তোরেস।

সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে পিএসজির হয়ে এই মৌসুমে ছয়টা ম্যাচে মাঠে নেমেছেন। তিনটায় শুরুর একাদশে, কোনোটিতেই পুরো সময় খেলেননি। বাকি তিনটায় বদলি হিসেবে। সব মিলিয়ে ৩২৫ মিনিট মাঠে ছিলেন, গোলমুখে সাতটা শট নিয়েছেন, সাতটাই গোল! প্রতি ৪৭ মিনিটে একটা করে গোল তোরেসের। ফরাসি ওয়েবসাইট ‘ফুট মার্কাতো’ জানাচ্ছে, পিএসজিতে দুর্দান্ত শুরুর বিচারে তোরেসের চেয়ে একমাত্র এগিয়ে আছেন জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ। পিএসজিতে প্রথম ছয় ম্যাচে তাঁর গোল ছিল আটটি। তোরেস কি আরও একজন ইব্রা হতে যাচ্ছেন?

পিএসজিতে দুর্দান্ত শুরুর বিচারে তোরেসের চেয়ে একমাত্র এগিয়ে আছেন জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ।
ইনস্টাগ্রাম

তুলনাটা এখন আর শুধু কথার কথা নয়, সংখ্যাই বলছে। তবে তোরেস নিজে সংখ্যার মোহে ভাসতে চান না। তাঁর সহজ-সরল কথা, ‘সুযোগ পেলে কাজে লাগাতে হয়। কখনো ভাগ্য সহায় হয়, কখনো হয় না। চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয় বারবার।’

কিন্তু এই পরিসংখ্যান শুধু ভাগ্যের ছোঁয়া পাওয়ার গল্প নয়। বক্সে অবস্থান নেওয়া, সতীর্থদের মুভমেন্ট পড়া, ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেওয়া আর শেষ ছোঁয়ার যথার্থতা—সব মিলিয়ে নিখুঁত এক স্ট্রাইকার, যেমনটা একজন কোচ চান।

আরও পড়ুন

তোরেসের এমন পারফরম্যান্স তাই দোটানায় ফেলে দিয়েছে এনরিকেকেও। আক্রমণভাগে উসমান দেম্বেলে, খিচা কাভারাস্কেইয়া, দেজিরে দুয়ের মতো তারকার ছড়াছড়ি পিএসজিতে। সেখানে বেঞ্চের বিকল্প হিসেবে প্যারিসে পা রাখা তোরেস এখন শুরুর একাদশের জন্য তীব্র দর-কষাকষি শুরু করেছেন। ৪ গোল নিয়ে এখন তিনি লিগ আঁ-তে দলটির শীর্ষ গোলদাতাও। তাঁকে উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠছে।

৪ গোল নিয়ে এখন তোরেস লিগ আঁ-তে পিএসজির শীর্ষ গোলদাতা।
ইনস্টাগ্রাম

লুইস এনরিকেও তা বুঝছেন। নতুন এই ফরোয়ার্ডকে নিয়ে সন্তুষ্টির কথা লুকাননি তিনি। বলেছেন, ‘নতুন যারা এসেছে, সবাই দলকে সাহায্য করছে। বিশেষ করে ফেরান অসাধারণ খেলছে। ডিফেন্সের পেছনে ফাঁকা জায়গা বের করা এবং তা কাজে লাগানোর চমৎকার ক্ষমতা রয়েছে তার। মাঝমাঠে যখন ওর মতো খেলোয়াড় থাকে, খেলা সহজ হয়ে যায়। ও এখন নিজের সেরা ছন্দে আছে।’

আর তোরেস? শুরুর একাদশে নিয়মিত না থাকা নিয়ে কথা বলতে তিনি খুব একটা আগ্রহী নন। বলার দরকারও নেই অবশ্য। সংখ্যাই তো তাঁর হয়ে কথা বলছে, এনরিকেকে চাপ দিচ্ছে। সেই চাপ খুব বেশি দিন উপেক্ষা করা মনে হয় সম্ভব হবে না পিএসজি কোচের জন্য।

আরও পড়ুন