মেসিরা বিশ্বকাপ জেতার পর গত চার বছরে ফুটবল দুনিয়ায় কী পরিবর্তন ঘটেছে

কাতারের লুসাইলে ট্রফি নিয়ে মেসিদের উৎসবরয়টার্স

২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর। কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই আর্জেন্টিনা–ফ্রান্স মহাকাব্যিক ফাইনালই হয়তো ছিল অনেকের শেষবার চোখ ভরে ফুটবল দেখা। এরপর কেটে গেছে প্রায় চার বছর। দুয়ারে কড়া নাড়ছে ২০২৬ বিশ্বকাপ। আবারও ফুটবলের চেনা উন্মাদনায় ডুব দেওয়ার আগে পেছনে ফিরে তাকালে অনেকেই হয়তো চমকে উঠবেন। কারণ, এই চার বছরে ফুটবলের চেনা মানচিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। কারও ক্যারিয়ার শিখরে উঠেছে, আবার কেউ পড়ে গেছেন গভীর খাদে।

আরেকটি বিশ্বকাপের রোমাঞ্চে গা ভাসানোর আগে চলুন জেনে নেওয়া যাক লুসাইল থেকে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের এই দীর্ঘ যাত্রায় ঠিক কী কী বদলে গেল ফুটবল মানচিত্রে।

মেসির মায়ামি অধ্যায়

ডিসেম্বরে বিশ্বকাপ জেতার পর মেসি ২০২২-২৩ মৌসুমের বাকি সময় কাটান পিএসজিতে। এরপর ২০২৩ সালের জুলাইয়ে শুরু হয় তাঁর ক্যারিয়ারের নতুন অধ্যায়। ৩৬ বছর বয়সে সাতবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী তারকা ফরাসি চ্যাম্পিয়নদের ছেড়ে যোগ দেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে। বিশ্বজুড়ে শিরোনাম হয় এই দলবদল।

কিন্তু বয়স যেন মেসিকে থামাতে পারেনি। মায়ামির হয়ে ১০৪ ম্যাচে তিনি করেছেন ৯০ গোল। শুধু তা–ই নয়, ক্লাবটির ইতিহাসের প্রথম তিনটি বড় শিরোপাও এসেছে তাঁর নেতৃত্বে—২০২৩ সালের লিগস কাপ, ২০২৪ সালের সাপোর্টার্স শিল্ড এবং ২০২৫ সালের এমএলএস কাপ।

এর সঙ্গে বিশ্বকাপ জয়ের সুবাদে হাতে তুলেছেন ক্যারিয়ারের অষ্টম ব্যালন ডি’অরও।

পিএসজি ছেড়ে মেসি এখন ইন্টার মায়ামিতে খেলছেন
ছবি: এএফপি

রিয়ালে এমবাপ্পে, ইউরোপের সেরা পিএসজি

বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক করা কিলিয়ান এমবাপ্পে ২০২৪ সালের জুনে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন। অর্ধযুগ ধরে স্প্যানিশ ক্লাবটিতে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি, তাঁকে নিতে চেয়েছিল রিয়ালও। নানা কারণে সেটি বিলম্বিত হলেও শেষমেশ দুই পক্ষেরই আশা পূরণ হয়েছে। তবে কে জানত, এরপর এমবাপ্পে, রিয়ালের হতাশার সময় আসবে। গত দুই মৌসুমে রিয়াল কোনো ট্রফিই জিততে পারেনি। আর যে পিএসজিতে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে পারছেন না বলে এমবাপ্পে ক্লাব ছাড়তে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন, সেই দলটিই টানা দুই বছর ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

মেসির উত্তরসূরি হিসেবে আবির্ভাব ইয়ামালের

অনেক দিন ধরেই ইউরোপীয় ফুটবল নতুন এক বিস্ময়বালকের অপেক্ষায় ছিল। মনে হচ্ছিল, সেই জায়গা হয়তো এমবাপ্পের দখলেই থাকবে। কিন্তু ২০২৩ সালের এপ্রিলে বার্সেলোনার ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর সব হিসাব পাল্টে দেন। নাম লামিনে ইয়ামাল।

এখন ১৮ বছর বয়সী এই উইঙ্গারকে অনেকেই মেসির উত্তরসূরি হিসেবে দেখছেন। ইতিমধ্যে বার্সেলোনার হয়ে তিনটি লা লিগা জিতেছেন। স্পেনকে এনে দিয়েছেন ২০২৪ ইউরোর শিরোপা। ২০২৫ সালের ব্যালন ডি’অরে রানার্সআপ হয়েছেন ইয়ামাল। তাঁর উল্কার গতির উত্থান দেখে অনেকেরই বিশ্বাস, ব্যালন ডি’অর জেতা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ২০২৬ বিশ্বকাপে তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে স্পেন।

ইয়ামালকে বিস্ময় বালক হিসেবে খুঁজে পেয়েছে ফুটবল
রয়টার্স

প্রায় শিরোপাহীন রোনালদো

২০২২ বিশ্বকাপের পর সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সৌদি আরব যাত্রা। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ছাড়ার পর ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার দুই সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে তিনি যোগ দেন আল নাসরে। সৌদি প্রো লিগে যোগ দেওয়া প্রথম সুপারস্টারও ছিলেন তিনি। পরে তাঁর পথ ধরে নেইমার, করিম বেনজেমা, সাদিও মানেসহ অনেকেই সৌদি আরবে গেছেন।

তবে ফুটবলের নতুন দিগন্ত প্রসারণে ও প্রচারণায় বড় ভূমিকা রাখলেও রোনালদো প্রায় শিরোপাহীনই থেকে যাচ্ছিলেন। কাতার বিশ্বকাপের পর পুরোটা সময় সৌদির লিগে থেকে শুধু সর্বশেষ মৌসুমেই আল নাসরের হয়ে লিগ মৌসুম জিততে পেরেছেন। এর আগে তাঁর সর্বশেষ বড় ট্রফি ছিল ২০২০-২১ মৌসুমে জুভেন্টাসের হয়ে ইতালিয়ান কাপ। রোনালদোর চোখ এখন ১০০০ ক্যারিয়ার গোলে। বিশ্বকাপের আগে তাঁর গোলসংখ্যা ৯৭৩।

আল নাসরে খেলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো
সৌদি প্রো লিগ

নেইমারের পতনের গল্প

মেসি ও রোনালদো যখন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের লিগকে দুনিয়ায় পরিচিত করাতে ভূমিকা রেখেছেন, নিয়মিত করেছেন গোলও—তখন নেইমার বলতে গেলে কিছুই করেননি। ২০২২ বিশ্বকাপের পর থেকে চোট আর ফর্মহীনতার কারণে মাঠের বাইরেই বেশি ছিলেন। গত সাড়ে তিন বছরে তিনি ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে খেলেছেন মাত্র ৬৩ ম্যাচ।

২০২৩ সালের আগস্টে যোগ দিয়েছিলেন সৌদি আরবের ক্লাব আল হিলালে। কিন্তু চোটের কারণে দেড় বছরে খেলতে পেরেছেন মোটে ৭ ম্যাচ। ৩৪ বছর বয়সী এই ব্রাজিলিয়ান তারকা ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ফিরে যান শৈশবের ক্লাব সান্তোসে। সেখানে কিছুটা নিয়মিত খেলে জাতীয় দলের কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে রাজি করাতে সক্ষম হন যে তিনি এখনো ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়ার যোগ্য।

নেইমার বেশির ভাগ সময় ছিলেন মাঠের বাইরে
এএফপি

নতুন দুই ব্যালন ডি’অর জয়ী

২০০৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ব্যালন ডি’অর প্রায় পুরোপুরি মেসি ও রোনালদোর দখলে ছিল। এই সময়ের মধ্যে মাত্র দুবার অন্য কেউ পুরস্কারটি জিততে পেরেছিলেন। কিন্তু দুই মহা তারকার ক্যারিয়ার যখন শেষ অধ্যায়ে, তখন নতুন মুখের আবির্ভাব ঘটেছে। ২০২৪ সালে ম্যানচেস্টার সিটির স্প্যানিশ মিডফিল্ডার রদ্রি ব্যালন ডি’অর জেতেন। আর পরের বছর পুরস্কারটি হাতে তোলেন পিএসজির ফরাসি ফরোয়ার্ড উসমান দেম্বেলে।

হ্যারি কেইনের হাতে ট্রফি উঠেছে

টটেনহামের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেও ১৩ বছরে কোনো ট্রফি জিততে পারেননি হ্যারি কেইন। ২০২৩ সালে ইংলিশ এই স্ট্রাইকার যোগ দেন বায়ার্ন মিউনিখে। জার্মান ক্লাবটিতে গত তিন মৌসুমে ১৪৭ ম্যাচে করেছেন ১৪৬ গোল। সবচেয়ে বড় কথা, ক্যারিয়ারের প্রথম শিরোপার দেখাও পেয়েছেন। জিতেছেন দুটি বুন্দেসলিগা, একটি জার্মান কাপ এবং একটি জার্মান সুপার কাপ।

জার্মানিতে গিয়ে ট্রফির দেখা পেয়েছেন হ্যারি কেইন
ইনস্টাগ্রাম/কেইন

বার্সেলোনার অর্থনৈতিক সংকট এখনো শেষ হয়নি

মাঠের পারফরম্যান্সে বার্সেলোনা যতটা শক্তিশালী, আর্থিকভাবে ততটাই নড়বড়ে। ২০১৭ সালে নেইমারের বিশ্ব রেকর্ড দলবদলের পর থেকেই বিপুল খরচের বোঝা বইছে কাতালান ক্লাবটি। একসময় তাদের ঋণের পরিমাণ ১০০ কোটি ইউরোর বেশি হয়ে যায়। এখন সেটা কিছুটা কমলেও চাপ এখনো কাটেনি।

আশার আলো হতে পারে সংস্কারকাজ শেষে ক্যাম্প ন্যুতে ফেরা। ২০২৩ সাল থেকে স্টেডিয়ামটি সংস্কারের জন্য বন্ধ ছিল। এখন সীমিত দর্শক ধারণক্ষমতা নিয়ে ফিরে এসেছে বার্সা। পুরো ১ লাখ ৫ হাজার আসনের স্টেডিয়াম চালু হলে ক্লাবের আয় বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে অবশ্য টানা দুই লা লিগা জিতে সমর্থকদের আনন্দ দিয়েছে দলটি।

কয়েকটি দীর্ঘ শিরোপা–খরার অবসান

২০২২ সালের পর ইউরোপীয় ফুটবলে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য শিরোপাখরা শেষ হয়েছে। ম্যানচেস্টার সিটি অবশেষে ২০২৩ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ করে। ইন্টার মিলানকে হারিয়ে তারা ট্রেবলও জেতে।

একসময় ‘নেভারকুসেন’ নামে পরিচিত বায়ার লেভারকুসেন ২০২৩-২৪ মৌসুমে একটি ম্যাচও না হেরে বুন্দেসলিগা জেতে। এর মাধ্যমে বায়ার্ন মিউনিখের টানা ১১ শিরোপার রাজত্ব শেষ হয়। আর মিকেল আর্তেতার আর্সেনাল ২০২৫-২৬ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ জিতে ২২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটায়।

২২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাল আর্সেনাল
ছবি: এক্স

বিশ্বকাপে বড় কোচদের ভিড়

২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে রেখে অনেক জাতীয় দল অভিজ্ঞ ও নামী কোচ নিয়োগ দিয়েছে। ব্রাজিল ২০০২ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের আশায় দায়িত্ব দিয়েছে কার্লো আনচেলত্তিকে, যিনি বিশ্বমঞ্চে ব্রাজিলের প্রথম বিদেশি কোচ।

ক্লাব ফুটবলের ডাগআউট মাতানো টমাস টুখেল (ইংল্যান্ড), মরিসিও পচেত্তিনো (যুক্তরাষ্ট্র) ইউলিয়ান নাগলসমানরাও (জার্মানি) যোগ দিয়েছেন জাতীয় দলের সঙ্গে। এই প্রথম তাঁরা বিশ্বকাপের ডাগআউটে দাঁড়াতে যাচ্ছেন।

আরও পড়ুন