প্রথম ক্লাসে কড়া শিক্ষক নন, ডুলি এলেন বন্ধু হয়ে
নতুন ক্লাসের প্রথম দিন যেমন থাকে—একটু জড়তা, কিছুটা রোমাঞ্চ আর একবুক কৌতূহল—বাংলাদেশ ফুটবল দলের ক্যাম্পে কালকের বিকেলটাও ছিল ঠিক তেমনই। তফাত শুধু একটাই, এই ক্লাসের ছাত্রদের পায়ে বল আর তাঁদের নতুন হেডমাস্টার টমাস ডুলি।
আজ বসুন্ধরা কিংসের অনুশীলন মাঠে টিম বাস পৌঁছানোর প্রায় ৫০ মিনিট আগেই এসে থামে কোচিং স্টাফদের গাড়ি। ফুটবলের চেনা দুনিয়ায় কোচদের এমন আগেভাগে আসাটা ব্যতিক্রম নয়, তবে আসল ব্যতিক্রমী রূপটা দেখা গেল ডুলির প্রথম ক্লাসে। মাঠে তিনি কোনো কড়া শিক্ষকের মতো গম্ভীর মুখে হাজির হননি কিংবা ডাগআউটের চেনা ছকে নিজেকে বন্দীও রাখেননি। প্রথম দিনেই তিনি খেলোয়াড়দের সঙ্গে মিশে গেলেন একেবারে বন্ধুর মতো। গল্প, আড্ডা আর হাসিমুখের আবহে মাঠেই শুরু হয় বাফুফের নতুন অধ্যায়ের প্রথম পাঠ।
অনুশীলন শেষে যখন কৃত্রিম আলোয় ফ্লাডলাইটগুলো জ্বলে উঠে, তখন খেলোয়াড়দের চোখেমুখে ক্লান্তির চেয়ে স্বস্তির ছাপই ছিল বেশি। অনুশীলন শেষে একাধিক ফুটবলারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাঠের প্রথম সেশনটা মোটেও কঠিন কোনো পরীক্ষা ছিল না, ওটা ছিল আসলে ডুলির এক প্রাণবন্ত ওরিয়েন্টেশন। ঘণ্টার শুরুতে ডুলি সবাইকে মাঠের মাঝখানে গোল করে ডেকে নেন। সবার চোখে চোখ রেখে শোনান তাঁর ফুটবল–দর্শন, দেন অনুপ্রেরণামূলক এক খুদে বক্তৃতা।
ওরিয়েন্টেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই শুরু হয় আসল রণকৌশল। আসন্ন যুদ্ধের আগে একজন চতুর সৈনিক যেমন তাঁর হাতের অস্ত্র-গোলাবারুদগুলো নিখুঁতভাবে ঝালিয়ে নেন, ডুলিও আজ ঠিক সেটাই করেন। গোলকিপার, ডিফেন্ডার, মিডফিল্ডার আর ফরোয়ার্ডদের আলাদা আলাদা গ্রুপে ভাগ করে শুরু হয় টেকনিক্যাল সেশন। ঘণ্টা দেড়েকের প্রথম ক্লাসে ডুলির মূল মনোযোগ ছিল পাসিং এবং রক্ষণভাগের দেয়ালটা শক্ত করার ওপর।
একেবারে অচেনা একঝাঁক ফুটবলারকে চিনে নেওয়ার এই মিশন ডুলির জন্য এক বড় পরীক্ষাও। আগামী ৫ জুন সান মারিনোর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ। এই প্রথম ইউরোপের কোনো দলের বিপক্ষে তাদেরই মাটিতে লড়বে বাংলাদেশ। নতুন কোচের জন্যও এটা প্রথম অগ্নিপরীক্ষা। এত সব ‘প্রথমের’ ভিড়ে ডুলির সামনে চ্যালেঞ্জটা পাহাড়সম।
তবে ডুলি যে একা লড়তে আসেননি, তার প্রমাণ মেলে মাঠেই। নিজের পছন্দের সহকারী কোচ মার্ক ব্রুনোকে পরশু রাতেই উড়িয়ে এনেছেন ঢাকায়। কাল অনুশীলনেও ব্রুনো ছিলেন প্রধান শিক্ষকের ছায়ার মতো। মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে দুজনকে মিনিট দশেক গভীর আলোচনায় মগ্ন থাকতে দেখা গেল। আরেক সহকারী হাসান আল মামুনকেও আলাদা করে ডেকে ডুলি বাতলে দিলেন তাঁর পরিকল্পনা।
এর আগে টিম হোটেলে প্রাথমিক স্কোয়াডের ১৬ জন ফুটবলার যখন উঠলেন, ডুলি নিজেই গিয়ে সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। কোচের এমন আন্তরিকতায় খেলোয়াড়েরাও ভীষণ উজ্জীবিত। তবে জাতীয় দলের অভিজ্ঞ গোলকিপার আনিসুর রহমান জিকো অনেক দিন পর দলে ফিরলেও এখনো কোচের দেখা পাননি। বসুন্ধরা কিংসে খেলা জিকোসহ কিংসের অন্য ৯ ফুটবলার আজই ক্যাম্পে যোগ দিচ্ছেন।
গত শুক্রবার ঢাকায় পা রাখার পর শনি ও রোববার—টানা দুই দিন কোচিং স্টাফদের নিয়ে ম্যারাথন সভা করেছেন ডুলি। কোন ছাত্রের মেধা কেমন, তা ওই দুই বৈঠকেই অনেকটা পড়ে নিয়েছেন। সেই হোমওয়ার্কের কারণেই হয়তো প্রথম দিনের ওরিয়েন্টেশন ক্লাসটাও দারুণ প্রাণবন্ত হয়েছে।