তিন ‘কবিতা’য় শুরু মেসির শেষের ‘কবিতা’

হ্যাটট্রিকে ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু মেসিরএএফপি

আর্জেন্টিনা ৩-০ আলজেরিয়া

কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে সবুজ চাদরে সাজানো মঞ্চ প্রস্তুত ছিল। অভ্যাগত অতিথিরাও (দর্শক) বসেছিলেন ৭৭ হাজার আসনে। অপেক্ষা ছিল কিংবদন্তির মঞ্চে পদার্পণের। সময়মতোই তিনি এলেন। আর্জেন্টিনা ও আলজেরিয়া দল মাঠে ঢোকার সময় ক্যামেরায় দেখা গেল, কেঁদে ফেললেন এক তরুণী। গায়ে আর্জেন্টিনার জার্সি। কিংবদন্তির শেষের কবিতার শুরুতে কান্নাভেজা তর্পণ যেন গোটা পৃথিবীর তরফ থেকে দেওয়া মানপত্র।

আস্তিন থেকে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক বের করে ‘কবি’ তাঁর যথার্থ প্রতিদানই দিলেন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে আর্জেন্টিনার শুরুটাও হলো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মতো। ফুটবলের সেই ‘কবি’র নাম লিওনেল মেসি!

বিশ্বকাপে মেসির শেষের কবিতা শুরুর আগে পরিবেশটা একটু ভারী হয়ে এসেছিল। অনেকের স্মৃতির অ্যালবামের ফ্রেম থেকে একে একে বেরিয়ে এসেছে গত ২০ বছরের কতশত ছবি! সবাই জানেন, বিশ্বকাপে কিংবদন্তির ফুটবল-কবিতার শেষটা শুরুর মঞ্চ এটা। গ্যালারিতে প্রচুর আকাশি-সাদার ছটা ও হইহুল্লোড়ের সুর ভাসলেও ভেতরে-ভেতরে বিচ্ছেদি মরমি টান।

কিন্তু সেই কিংবদন্তি, মানে লিওনেল মেসি একটু দুষ্টু প্রকৃতির। শেষের কবিতার খাতা ফেলে খেলার শুরুতেই পা দুটো একটু এদিক–সেদিক করে মেসি বলতে লাগলেন তাঁর শুরুর ‘কবিতা’; সেই যে যৌবনের দিনগুলোতে যেমন ছিলেন, সেই সব আগুনে ‘কবিতা’র দু-একটি উছলে বের হলো।

দ্বিতীয় গোলের পর সতীর্থদের উদ্‌যাপনের মধ্যমণি মেসি
এএফপি

আক্ষরিক অর্থে না হলেও একদম প্রকৃত ‘কবি’দের মতোই মেসি যেন মুহূর্তটা বুঝে নিয়েছিলেন। এই বিশ্বকাপের পরই তাঁকে আর এই আসরে না দেখার দুঃখে কারও এতটুকু মন খারাপ হতে দেবেন না! শুরুটা হলো তাই মজার ‘কবিতা’য়। ৫ মিনিটে লাওতারো মার্তিনেজের পাস পেয়ে বক্সের ভেতর থেকে নেওয়া শটে বানালেন ‘ফলস’ কবিতা—গোল হলেও অফসাইড! দর্শক সিটে ধাতস্থ হয়ে ওঠার আগেই মেসির সেই গোলে দিগ্‌বিদিক হয়ে উঠল। লাইনসম্যান পতাকা তোলায় বুঝতে হলো, সেটা আসল ‘কবিতা’ নয়।

আরও পড়ুন

তিন মিনিট পর প্রতিপক্ষ আলজেরিয়াও সংগত ধরল মেসির সঙ্গে। ইব্রাহিম মাজার ডিফেন্সচেরা দারুণ এক পাসে ফরোয়ার্ড ফারেস শাইবির গোল—না, এবারও অফসাইড! দুই দলের এই ভ্রান্তিবিলাসে দর্শক ততক্ষণে মজা পেয়ে গেছেন। চড়া হচ্ছিল উৎসবের সুর। পাস ধরায় কিংবা গোলে শট নেওয়ায় চিরকালের নিখুঁত ‘টাইমার’ মেসি সময় বুঝে ঠিক তখনই বের করলেন তাঁর আসল ‘কবিতা’খানি।

রদ্রিগো দি পলের দ্রুতলয়ে নেওয়া ফ্রি–কিক থেকে বলটা পেয়েছিলেন মাঝমাঠে। ধরেই সেই ‘ম্যাজিক’ দৌড়। ক্যামেরা বুঝিয়ে দিচ্ছিল, মেসি একদম ফ্রেমের কেন্দ্রবিন্দুতে। বাকি সতীর্থরা যেন সেই ‘কবিতা’র সুর-তাল-লয়। আলজেরিয়া বক্সের একদম মাথায় গিয়ে মেসি ছাড়লেন তাঁর শেষ পঙ্‌ক্তি—বাঁ পায়ের শটে বলটি হাউইবাজির মতো ছুটল তাঁর ডানে একটু বাঁক নিয়ে। আলজেরিয়ার পোস্টে জিদানপুত্র লুকা জিদান লাফ দিলেন ঠেকাতে, কিন্তু আলজেরিয়ানদের হৃদয়কে গোল-বিদ্ধ হওয়া থেকে বাঁচাতে পারলেন না। সবাই জানেন, মেসির ‘কবিতা’র এমনই শক্তি!

গোলের পর মেসির এই উদ্‌যাপন চেনা। বিশ্বকাপে ফুরিয়ে আসছে মেসির এমন উদ্‌যাপন দেখার সুযোগ
এএফপি

গ্যালারিতে তখন করতালির বৃষ্টি। বাকি পৃথিবীও তাতে কি যোগ দেয়নি? মেসি জানতেন, মনে মনে বা উচ্চকিত কণ্ঠে ‘ওয়ান মোর’ বলে এমন সব কবিতা আরও শোনার আকুতি উঠল বলে! কিন্তু বয়স তো আটত্রিশ পেরোচ্ছে। মেসি তাই হয়তো একটু দম নিলেন। বিরতির পর আস্তিন থেকে বের করলেন আরও দুটো ‘কবিতা।’

এর মধ্যে প্রথমটিতে সংগত আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টারের। বক্সের বাইরে থেকে তাঁর শট লুকা জিদান ঠেকালেও হাতে রাখতে পারেননি। বক্সের ভেতরেই থাকা মেসি একদম সময় বুঝে সেই ‘কবিতা’র শেষ লাইনটি ছাড়লেন আলতো এক টোকায়—গোল!

কিন্তু উপস্থিত শ্রোতা বা দর্শক এত অল্পে সন্তুষ্ট নন। রোজারিওর কবিকে তাই বাধ্য হয়েই বের করতে হলো তাঁর সেরা কবিতার একটি।

৩৮ বছর বয়সেও মেসি আছেন সেই আগের মতোই। অসাধারণ!
এএফপি

এত দিন তাঁকে যেভাবে সবাই দেখে এসেছেন—জাদুকরি ড্রিবলিংয়ে মাঠের মাঝবরাবর দিয়ে ছুটে বল দেন বদলি নামা নিকো গঞ্জালেসকে। সংগতের ভূমিকায় থাকা গঞ্জালেসের দায়িত্ব ছিল বলটি আবারও মেসিকে ফিরিয়ে দেওয়া। গঞ্জালেস সেটি করার পর কবিতার সবচেয়ে ধারালো লাইনটি ধরলেন মেসি—বক্সের বাইরে থেকে সেই ট্রেডমার্ক বাঁকানো শট এবং গোল!

সেই কবিতা কিংবা গোলের ধারে কেউ কেউ সন্দেহ করতে পারেন, আলজেরিয়ানদের হৃদয়ও রক্তাক্ত না হয়ে বোধ হয় আবেগে ভিজেছে। বিশ্বকাপের পাতায় এমন ‘কবি’ আর কখনো আসবে কি না, তা যে কেউ জানে না!

গোলের পরপরই কোচ যখন তাঁকে তুলে নিলেন, তখন সমবেত দর্শক তাই উঠে দাঁড়ালেন। আবারও করতালি। কিংবদন্তি ফিরে গেলেন তাঁর শেষের কবিতার শুরুটা করে।

আরও পড়ুন