ব্রাজিল সমর্থকেরা এখন একটু আশাবাদী হতেই পারেন

প্রথম ম্যাচে মরক্কোর সঙ্গে ড্রয়ের পর ব্রাজিলকে নিয়ে মনে দানা বেঁধেছিল তীব্র হতাশা। হাইতির বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে জিতলেও চেনা ব্রাজিলকে খুঁজে পাইনি। তাই প্রথম দুটি ম্যাচ দেখে একজন সমর্থক হিসেবে খুব একটা আশাবাদী হতে পারছিলাম না সেলেসাওদের নিয়ে। তবে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলের খেলা দেখে এখন একটু নড়েচড়ে বসা যায়, ব্রাজিল সমর্থকেরা এখন একটু আশাবাদী হতেই পারেন।

স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে আজকের ম্যাচে শুরু থেকেই বেশ সাবলীল মনে হয়েছে ব্রাজিলকে। খেলা দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল যে তারা স্কটল্যান্ডের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী দল। সম্ভবত গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্যটি মাথায় থাকায় আগের দুই ম্যাচের তুলনায় এদিন হলুদ জার্সিধারীদের আত্মবিশ্বাস ছিল উঁচুতে।

বাতাসে বল জেতা বা বল দখলের লড়াইয়ে আগের চেয়ে এই ম্যাচে অনেক এগিয়ে ছিল ব্রাজিল। প্রতিপক্ষের পা থেকে দ্রুত বল কাড়া বা প্রান্ত বদল—সবকিছুই চটজলদি হয়েছে। পুরো দলের মধ্যে সমন্বয় ও বোঝাপড়া ছিল বেশ ভালো।

অবশ্য এখনো যে সেই চিরচেনা ‘সাম্বা ব্রাজিল’ দেখা গেছে তা নয়, তবে নিশ্চিতভাবেই আগের দুই ম্যাচের চেয়ে ব্রাজিল এই ম্যাচে অনেক ভালো ও স্বস্তিদায়ক ফুটবল খেলেছে। ৭ মিনিটে দ্রুত গোল পাওয়ায় দল ৩-০ গোলের সহজ জয় তুলে নিতে পেরেছে।

স্কটিশদের প্রশংসা করব, তারা শরীরী ফুটবল খেলেনি। পরিচ্ছন্ন ফুটবল খেলতে চেয়েছে। ফলে ব্রাজিল পাসিং গেম ও স্কিল দেখানোর সুযোগ পেয়ে তাদের রক্ষণ ভাঙতে পেরেছে। এখন আসলে প্রতিপক্ষ দলগুলো অনেক হিসাব করে খেলতে আসে। মাঠের চেয়ে ল্যাপটপেই বেশি খেলা হয়। প্রতিপক্ষ অনেক গবেষণা করে বড় খেলোয়াড়দের আটকানোর ছক কষে মাঠে নামে। স্কটল্যান্ডও তা–ই করেছে, কিন্তু ব্রাজিলের দলীয় শক্তির কাছে পেরে ওঠেনি।

তবে এই জয়ের মধ্যেও ভবিষ্যতের জন্য ব্রাজিলের কিছু বিষয় আমার কাছে উদ্বেগজনক মনে হয়েছে। সবচেয়ে বড় চিন্তার জায়গা হলো, বক্সের ভেতর ওয়ান-টু-ওয়ান পরিস্থিতিতে ফিনিশিংয়ের অভাব।

বিশেষ করে প্রথমার্ধে রায়ান ও মাতেউস কুনিয়া গোলকিপারকে সামনে পেয়েও তাড়াহুড়া করে গোল মিস করেছে, যা ব্রাজিলিয়ান ঐতিহ্যের সঙ্গে খাপ খায় না। বল বাইরে মারা বা গোলকিপারের হাতে মারার এই দুর্বলতা সামনে ভোগাতে পারে ব্রাজিলকে।

জোড়া গোল করেছেন ভিনিসিয়ুস
রয়টার্স

ম্যাচের প্রথম ৩৫-৩৭ মিনিটের মধ্যেই ব্রাজিল ৩-০ বা ৪-০ গোলে এগিয়ে যেতে পারত। এই সহজ সুযোগ হাতছাড়া করা দলকে বিপদে ফেলতে পারে নকআউটে।

ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রই এখন দলের মূল কান্ডারি। ব্রাজিলের বাঁ দিকের অঞ্চলটা বলতে গেলে একাই রাজত্ব করে। গোল তৈরি করে, আবার গোলও করে। উইঙ্গার হয়েও নাম্বার নাইনের মতো গোল করার কঠিন দায়িত্ব পালন করছে, যা এককথায় দারুণ। স্কটল্যান্ড ম্যাচে জোড়া গোল করে ভিনিসিয়ুস আবারও প্রমাণ করেছে নিজের সামর্থ্য।

আরও পড়ুন

এ ছাড়া অনেক দিন পর কাসেমিরোকে মাঠে খুব সিরিয়াস দেখা গেছে। একদিকে মাঝমাঠের ভারসাম্য বজায় রেখেছে, অন্যদিকে সাহায্য করেছে রক্ষণেও।

স্কটল্যান্ডের একটা আক্রমণ যেভাবে ব্লক করেছে, এককথায় দারুণ। ব্রাজিল গোলরক্ষক আলিসনকে স্কটল্যান্ড ম্যাচে পরীক্ষা দিতে হয়েছে এবং শেষ দিকে গোটা তিনেক দারুণ সেভ করে দলের জয় নিশ্চিত করেছে। স্কটল্যান্ডের গোলরক্ষকও কয়েকটি ভালো সেভ দিয়েছে।

কাল মাঠে নেমেছিলেন নেইমার
রয়টার্স

নেইমারকে নিয়ে আমি এখনো পুরোপুরি আশাবাদী হতে পারছি না। ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবরের পর এই প্রথম জাতীয় দলের জার্সিতে নেমে খুব বেশি সময় হয়তো পায়নি। নেইমার যখন মাঠে নামে, ততক্ষণে জয় নিশ্চিত হয়ে গেছে ব্রাজিলের।

তারপরও একবার দেখলাম, অপ্রয়োজনে বল পায়ে রাখতে গিয়ে ফাউলের শিকার হয়েছে। নেইমারকে এখনো শতভাগ ফিট মনে হচ্ছে না। বর্তমান অবস্থায় লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে বা আর্লিং হলান্ডের মতো ম্যাচে কোনো বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারবে বলেও আমার মনে হয় না।

আরও পড়ুন

কোচ কার্লো আনচেলত্তি এখন পর্যন্ত প্রতিটি ম্যাচে একাদশে অনেক পরিবর্তন এনেছেন এবং গোলরক্ষক ছাড়া বেশ কয়েকটি পজিশনে খেলোয়াড়দের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাজিয়ে দেখেছেন।

তবে গ্রুপের তিন ম্যাচ শেষে কোচের মনে নকআউটের সেরা একাদশ নিয়ে একটি পরিষ্কার ধারণা তৈরি হয়েছে। নকআউটে তিনি একটি নির্দিষ্ট ও শক্তিশালী দল নিয়ে নামবেন এবং ঘন ঘন পরিবর্তন করবেন না বলেই আমার ধারণা।

ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি
রয়টার্স

গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচের শঙ্কা কাটিয়ে টেবিলের শীর্ষে থেকে শেষ করায় ব্রাজিলের ওপর থেকে মানসিক চাপ এখন দূর হয়েছে। তবে নকআউটে আর কোনো দ্বিতীয় সুযোগ বা ড্র করার অবকাশ থাকবে না। তাই সামনে ভালো করতে হলে রক্ষণের ভুলগুলো শোধরানো এবং বক্সের ভেতরের সুযোগগুলো শান্ত মেজাজে কাজে লাগানো জরুরি। আশা করি, ফিনিশিংয়ের দুর্বলতা কাটিয়ে সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ করে সামনে এগিয়ে যাবে ব্রাজিল।

লেখক: সাবেক ফুটবলার ও কোচ

আরও পড়ুন