সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন পোস্টটা করেছেন লিওনেল মেসি, বাংলাদেশে তখন সোমবার রাত ৯টা। এর মানে মায়ামিতে বেলা ১১টা। অনুমান করে নিতে সমস্যা কী, সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রাতরাশ সেরে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকেছেন। তারপরই পোস্টটা করেছেন মেসি। যে পোস্ট দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে ফুটবল–বিশ্বে। যেটি শুরু হয়েছে ছোট্ট একটা ঘোষণা দিয়ে—‘(বিশ্বকাপ) ফাইনাল শেষে এত দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর, অনেক ভেবেচিন্তে, আমি আপনাদের সবাইকে জানাতে চাই, আমি জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি...।’
ঘোষণাটাকে ‘ছোট্ট’ বলছি? ছোট্টই তো! ৩৯ বছর বয়সী একজন ফুটবলারের জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষণা ‘বড়’ হয় কী করে! কিন্তু লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কি আর আর দশজন ফুটবলারের মতো? গত ২৪ জুন ৩৯তম জন্মদিন উদ্যাপন করা এক ফুটবলারের অবসরের ঘোষণায় তাই ফুটবল–বিশ্বে তোলপাড়। একটু হাহাকারও কি নয়! আন্তর্জাতিক ফুটবলে লিওনেল মেসিকে আর কোনো দিন দেখা যাবে না—এই সত্য তিরের মতো বিঁধেছে অনেকের বুকে। একদিন না একদিন এই দিনটি আসতই। তারপরও সত্যি সত্যি যখন তা এল, তা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে—এমন মানুষের সংখ্যা অগণ্য এবং তাঁরা শুধু আর্জেন্টিনা নামের দেশটিতেই বাস করেন না।
আর্জেন্টিনার সীমানা ছাড়িয়ে লিওনেল মেসি অনেক দিনই হয়ে গেছেন পুরো বিশ্বের। ফুটবল পায়ে অত্যাশ্চর্য সব কাণ্ড করে ঢুকে গেছেন কোটি মানুষের হৃদয়ে।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২১ বছরের পদচারণ শেষ হওয়ার অন্য একটা অর্থও তো আছে। এই বিশ্বের জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশের জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে ছিলেন লিওনেল মেসি। বোঝার বয়স থেকেই যাঁরা তাঁর বাঁ পায়ের জাদু দেখতে দেখতে বড় হয়েছেন, তাঁদের কারও বয়স আজ ২৫, কারও ২৮, কারও–বা ৩০। মেসির বিদায় তাঁদের জীবনের কিছুটা হলেও শূন্য করে দেবে, এতে আর আশ্চর্য কী!
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে প্রথম গায়ে তুলেছিলেন আকাশি–নীল জার্সি। ১৮ বছর বয়সী মেসি সেই ম্যাচে মাঠে ছিলেন মাত্র ৪৭ সেকেন্ড। বদলি হিসেবে নেমেছিলেন ৬৩ মিনিটে। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারকে কনুই মেরে লাল কার্ড দেখে উঠে যেতে হয়েছে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। কে বলে, প্রভাত নাকি দিনের সঠিক পূর্বাভাস দেয়! মেসির সঙ্গে কি লাল কার্ড যায়! মেসির সঙ্গে যায় গোল, মেসির সঙ্গে যায় স্বর্গীয় সব অ্যাসিস্ট, মেসির সঙ্গে যায় মাঠে অভাবনীয় সব মুহূর্ত।
নইলে ২০৭ ম্যাচের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে লাল কার্ড দেখেছেন তো আর মাত্র একটিই। সেটিও অনেক পরে, ২০১৯ কোপা আমেরিকায় চিলির বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে। আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যাটা ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, ১২৫ গোলও তা–ই। দুই ক্ষেত্রেই মেসির চেয়ে এগিয়ে শুধুই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। যাঁর সঙ্গে মেসির দ্বৈরথের মতো কিছু ফুটবল ইতিহাসই দেখেনি কখনো। ভবিষ্যতেও দেখবে কি না, সন্দেহ জাগে। লিওনেল মেসির বিদায়ের ঘোষণা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পৃথিবীকেও কি তাই একটু শূন্য করে দিয়ে যায়নি!
একজন ফুটবলারের যা কিছু পাওয়া সম্ভব, পেয়েছেন তার সবই। ক্লাবের হয়ে সাফল্য, জাতীয় দলের হয়ে মহাদেশীয় শিরোপা, বিশ্বকাপ...। অপূর্ণতা বলে কিছু থাকার কথা নয়। মেসি তাই পরিতৃপ্ত হয়েই আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়ছেন। তবে গত কয়েক বছরে অনেকবারই কি তাঁর মনে পড়েনি, ২০১৬ সালে হতাশায়–দুঃখে–অভিমানে নেওয়া সেই অবসরের ঘোষণা ফিরিয়ে না নিলে অনেক কিছুই তাঁর পাওয়া হতো না। পরপর তিন বছরে বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকার তিনটি ফাইনালে হারার পর মেসির মনে হয়েছিল, তিনি আর্জেন্টিনার জন্যই ‘অপয়া’। ভাগ্যিস, মত বদলেছিলেন। না বদলালে তাঁর তো ক্ষতি হতোই, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হতো ফুটবলের, তার চেয়েও বেশি দর্শকের।
এখন যখন সত্যি সত্যি চলে যাচ্ছেন, মেসির ক্যারিয়ারে অপূর্ণতা বলে কিছু নেই, মনে নেই কোনো আক্ষেপ। দর্শক–সমর্থকেরা তো চিরদিনই দেখতে চাইবেন প্রিয় খেলোয়াড়কে। কিন্তু তা কি আর হয় নাকি! সবকিছুই একদিন শেষ হয়। আকাশি–নীল জার্সির মেসিরও তাই শেষ।
২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালটাই হয়ে থাকল আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর শেষ চিহ্ন।
বিদায়, মেসি!
