লিওনেল মেসির সামনে কী

মেসি আর্জেন্টিনা ফুটবলের এক চিরন্তন কম্পাসছবি: রয়টার্স

ফ্লোরিডার ফোর্ট লডারডেল থেকে ছাড়া চার্টার্ড ফ্লাইটের চাকা যখন ইস্লাস মালভিনাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মাটি স্পর্শ করল, রোজারিওর সময় তখন মঙ্গলবার সকাল ৬টা ২৬ মিনিট। আর্জেন্টিনার সকাল তখনো পুরো জেগে ওঠেনি। আর্দ্রতা, কাঁপানো ঠান্ডা আর ঝিরঝিরে বৃষ্টি। কিছুক্ষণ পর বিমানের সিঁড়ি বেয়ে নামেন একজন। লিওনেল মেসি।

হাতে ছোট্ট একটি ব্যাগ। তাতে হয়তো ছিল বিশ্বকাপের রানার্সআপ মেডেল, হয়তো সিলভার বলও। এবং সেই ব্যাগের ভাঁজেই লুকিয়ে ছিল আরও অনেক কিছু—কিছু প্রশ্ন, কিছু অপূর্ণতা, কিছু না বলা ক্লান্তি।

ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি উঠলেন গাড়িতে। গন্তব্য রোজারিওর উপশহর ফুনাসের কেন্টাকিতে নিজের বাড়ি। বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের ক্ষত তখনো তাজা।

৩৯ বছর বয়স মেসির। শোকেসের তাক ভরা ট্রফি। ফুটবলের কাছে একজন যা চাইতে পারে, সবকিছুই আছে সেখানে। তবু এই মানুষটি সব সময়ই একটু বেশি চেয়েছেন। নিজের সেরাটা নিংড়ে দিতে চেয়েছেন।

ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পর মেসি
ছবি: রয়টার্স

চার বছর আগে একটা বিশ্বকাপ জেতার পর এবার আবার জিততে চেয়েছিলেন। খুব কাছে গিয়েও সেই চাওয়া পূরণ হলো না। স্পেন-প্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে থমকে যাওয়া এক অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম দিয়েছে তাঁর ভেতর। সহযোদ্ধাদের বীরত্বে একবুক গর্ব, আর ফাইনালে পার্থক্য গড়ে দিতে না পারার কষ্ট।

বিশ্ব যখন তাঁর পরের সিদ্ধান্ত জানতে ব্যস্ত, তখন মেসি নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন মায়ামির বাড়িতে। সঙ্গে শুধু পরিবার। স্ত্রী আন্তোনেলা আর তিন ছেলে চিরো, মাতেও ও থিয়াগো। দীর্ঘ ৫০ দিনের ক্যাম্পের পর ছোট্ট বিরতি। একটু থামা, একটু শ্বাস নেওয়া।

দলের অন্যদের সঙ্গে বুয়েনস এইরেসে ফেরেননি কেন? এই প্রশ্নের উত্তরও সেটাই। পরিবারের সঙ্গে একটু নিজের মতো সময় কাটানো। কারণ, সামনে ক্লাব ফুটবল, ইন্টার মায়ামির হয়ে ব্যস্ত সূচি। শিকাগো ফায়ার ও মন্ট্রিয়লের বিপক্ষে পরপর দুটি ম্যাচ এক সপ্তাহের মধ্যে।

সাধারণ যুক্তিই বলে, এই দুই ম্যাচে তিনি খেলবেন না, খেলবেন না তাঁর আরেক সতীর্থ রদ্রিগো দি পলও। তবু মাঠে নামার আগে প্রস্তুতি তো জরুরি। তৈরি তো হতে হবে। শারীরিকভাবে, তার আগে মানসিকভাবেও।

ফাইনালের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের কষ্টের কথা লিখেছিলেন, লিখেছিলেন সতীর্থদের নিয়ে গর্বের কথাও। অভিনন্দন জানিয়েছিলেন স্পেনকে। কথাগুলো আবেগে ভরা, কিন্তু সেখানে ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো আভাস ছিল না।

তবু সোনালি ট্রফিটা থেকে চোখ ফেরাতে পারেননি মেসি
এএফপি

হয়তো খুব শিগগির সে রকম কোনো ঘোষণা আসবেও না। তবে কিছু হিসাব মিলিয়ে তাঁর ভবিষ্যৎ অনুমান করা যেতে পারে। ২০২৮ পর্যন্ত ইন্টার মায়ামির সঙ্গে চুক্তি। সেখানে খেলতে থাকলে জাতীয় দল এখনই কেন ছাড়বেন? এই বয়সেও যদি দলকে টেনে নিয়ে যেতে পারেন, তার মানে তো তিনি এখনো অপরিহার্য। ড্রেসিংরুমে তাঁর কথা এখনো তরুণদের অনুপ্রাণিত করে। আর্জেন্টিনা আর মেসির সম্পর্ক শুধু ফুটবল নয়, এ এক গভীর আবেগ।

আরও পড়ুন

সামনে প্রীতি ম্যাচ আছে কিছু। তবে কনমেবলের সূচি খুব একটা ঠাসা নয়। ২০৩০ বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক হওয়ায় বাছাইপর্ব খেলে যোগ্যতা অর্জনের চাপ নেই। পরের বড় টুর্নামেন্ট ২০২৮ কোপা আমেরিকা। ইকুয়েডরে হওয়ার কথা থাকলেও আসলে হয়তো তা বসবে আবার সেই যুক্তরাষ্ট্রেই। তত দিন পর্যন্ত তিনি যদি ক্লাব ফুটবল খেলে যান, তাহলে জাতীয় দলকে এখনই বিদায় বলে দেওয়ার কী দরকার!

এএফএর (আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন) সদরেও সবাই অপেক্ষা করছেন অধিনায়কের সিদ্ধান্তের জন্য। সভাপতি ক্লদিও তাপিয়াও সময় দিতে চান। মেসি যদি চান, দরজা নয়, আর্জেন্টিনার পুরো আকাশই খোলা তাঁর জন্য। কারণ, তিনি এখনো সেরা এবং এই রূপান্তরকালে ড্রেসিংরুমে তাঁর উপস্থিতিই এক সঞ্জীবনী সুধা।

কোচ লিওনেল স্কালোনি থাকুন বা না থাকুন—মাঠে এবং মাঠের বাইরে, অধিনায়ক মেসি আর্জেন্টিনা ফুটবলের এক চিরন্তন কম্পাস।

আরও পড়ুন