পুতুলনাচের অদৃশ্য জাদুকর: স্পেনের আসল ‘কলকাঠি’ নাড়েন যিনি
পুতুলনাচে আপনি সব সময় নাচতে দেখেন পুতুলকে। আসল সুতোটা যাঁর হাতে, তিনি থাকেন অদৃশ্য। দর্শক অবশ্য ঠিকই জানেন, আড়ালে থেকে সেই লোকই নাড়েন কলকাঠি।
স্পেন দলে কাজটা যিনি করেন, তাঁর খেলাটাও হয়তো সব সময় চোখে পড়ে না। কিন্তু স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে যখন বলেন, রদ্রিকে দলে পাওয়াটা তাঁর জন্য সৌভাগ্যের—স্পেন দলে রদ্রির অবদান বুঝতে বাকি থাকে না কারও।
ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের কাজটাই এমন। মাঠের পুরোটা সময় হয়তো তাঁকে চোখেই পড়বে না। কিন্তু মাঝমাঠকে একসুতোয় গাঁথার কাজটা তিনি গড়ে যান নিভৃতে। রদ্রি সেই কাজটাই অনেক দিন ধরে করে যাচ্ছেন পরম নিষ্ঠায়। কখনো সেটি চোখে পড়ে, কখনো পড়ে না।
ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে যেমন স্পেনের দ্বিতীয় গোলে আপনি দেখে থাকতে পারেন পেদ্রো পোরো আর দানি ওলমোর অবদান। রদ্রিই যে সেই গোলের উৎস, সেটা চোখ এড়িয়ে যেতে পারে যে কারও।
মাঠের খেলায় এমন অনেক কিছুই চোখ এড়িয়ে যায়, কিন্তু সংখ্যা তো আর আর ভুল বলে না। যেমন এই বিশ্বকাপে তিনি পাস দিয়েছেন ৬৫৫টি; বিশ্বকাপের ইতিহাসেই কোনো খেলোয়াড় এক আসরে এর চেয়ে বেশি পাস দিতে পারেননি।
৯৪ শতাংশ পাসই দিয়েছেন ঠিকঠাক। স্পেন যে সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে অমন ফাঁসুড়ের ফাঁসে আটকে ফেলে দম বন্ধ করে রাখল পুরোটা সময়, তার পেছনেও রদ্রিরই বড় অবদান।
অথচ গত দুই বছরে কম উত্থান–পতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি রদ্রিকে। ২০২৪ ইউরো থেকেই শুরু করা যাক। তার এক বছর আগে থেকে তিনি দুর্দান্ত ফর্মে, ম্যান সিটির হয়ে জিতেছেন স্বপ্নের ট্রেবল। ২০২৪ ইউরোতে স্পেনকে জেতালেন, হলেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়। সে বছর ব্যালন ডি’অরও উঠল তাঁর হাতে।
কিন্তু এর মধ্যেই লিগামেন্টের চোট রদ্রিকে লম্বা সময়ের জন্য ছিটকে দিল মাঠের বাইরে। সেই চোট কাটিয়ে ম্যান সিটিতে ফিরলেও আগের সেই রদ্রিকে আর দেখা যাচ্ছিল না।
বিশ্বকাপের আগে স্পেন কোচের দিকে তাই বারবার প্রশ্ন উঠছিল—রদ্রি কি আসলেই সেরা ফর্মে ফিরতে পারবেন? তিনি কি আর আগের মতো দলে অপরিহার্য? ফ্রান্স ম্যাচের পর স্পেন কোচ দে লা ফুয়েন্তে রদ্রির হয়েই সবাইকে উত্তরটা দিয়েছেন, ‘আমরা যেমন ফুটবল খেলি, তার জন্য রদ্রি আদর্শ খেলোয়াড়। ওকে নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাই তো অপমানজনক! ও যেভাবে দলের ভারসাম্য রক্ষা করে, কয়বার যে বল ছিনিয়ে নেয়; সেটা আমি গুনতেও পারব না।’
রদ্রি স্পেনের জন্য কী, তা স্পেন কোচ এই কথাতেই বুঝিয়ে দিচ্ছেন। রদ্রি যেন এক নদীর উৎসমুখ, যেখান থেকে স্পেনের আক্রমণের জলধারা বিভক্ত। একটা যায় রুইজের সৃজনশীলতার দিকে, আরেকটা ওলমোর ক্ষিপ্রতার দিকে। রুইজ আর ওলমো যখন বল পান, তখন তাঁদের পেছনে ফেলে আসা জায়গাটা নিরাপদ রাখার দায়িত্ব রদ্রির। বল হারানোর দু-তিন সেকেন্ডের মধ্যেই প্রতিপক্ষকে চেপে ধরার যে নীতি স্পেন অনুসরণ করে, তার কেন্দ্রেও এই মিডফিল্ডারই।
রদ্রির ওপর আস্থা রাখার জন্য ধন্যবাদ অবশ্য স্পেন কোচেরও প্রাপ্য। দে লা ফুয়েন্তের সঙ্গে রদ্রির সম্পর্কটা নতুন নয়। ২০১৫ সালে স্পেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলে অভিষেকের সময় থেকেই দে লা ফুয়েন্তে ছিলেন তাঁর কোচ।
একসঙ্গে জিতেছেন সেবারের ইউরোপিয়ান অনূর্ধ্ব-১৯ শিরোপাও। মিকেল মেরিনো, উনাই সিমন, রুইজ, ওলমো, মিকেল ওইয়ারসাবাল—পুরো প্রজন্মই বেড়ে উঠেছে একসঙ্গে, একই দর্শনে। মাঠের ভেতরে-বাইরে সেই রসায়নই স্পেনকে নিয়ে এসেছে আরেকটি বিশ্বকাপ শিরোপার কাছে; যার ভরকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে রদ্রি।