আপনি যখন ‘জোড়াতালির’ একটা লিগ খেলে এশিয়ান কাপের মঞ্চে যাবেন, তখন এমন অসহায় আত্মসমর্পণটা স্বাভাবিক! যেখানে প্রতিপক্ষ চীন–উত্তর কোরিয়া, তাদের সামনে দাঁড়ানোর আগে অন্তত উচ্চ র্যাঙ্কিংয়ের দলগুলোর বিপক্ষে একাধিক ম্যাচ খেলার প্রয়োজন ছিল। এ প্রয়োজনীয়তার কথা বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের কোচ পিটার বাটলারও বোঝাতে পারেননি দেশের ফুটবল ফেডারেশনকে (বাফুফে)। তাই উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ৫–০ গোলের হারটা শুধু হার নয়, বাংলাদেশের জন্য একটা শিক্ষাও।
ধরুন, এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ একটাও জয় পেল না। কিংবা ৯ মার্চ পার্থে উজবেকিস্তানকে হারাল। দিন শেষে কিন্তু প্রাপ্তির খাতায় এক জয়ের পাশাপাশি থাকবে বড় মঞ্চে খেলার অভিজ্ঞতা। দক্ষিণ এশিয়ার গন্ডি পেরোনোর পর লড়াই আসলে কতটা কঠিন, এ জন্য কেমন মানের প্রস্তুতি দরকার, এসব নিয়েও নতুনভাবে ভাবতে শিখবে তারা।
চীন ও উত্তর কোরিয়া—দুই দলের বিপক্ষে দুরকম বাংলাদেশকে দেখা গেল। গ্রুপ পর্বে প্রথম ম্যাচে চীনের দ্রুতলয়ের প্রতি–আক্রমণ, দূরপাল্লার পাস আর ক্রসের পসরা থামিয়ে বাংলাদেশও আক্রমণ করেছে। কিন্তু আজকের চিত্র একেবারে ভিন্ন।
বাংলাদেশের আক্রমণভাগকে নিষ্ক্রিয় করে উত্তর কোরিয়া দেখিয়েছে কীভাবে রক্ষণ তছনছ করতে হয়। গোল পাঁচটা না হয়ে আট–নয়টা বা দশটা হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকত না। ম্যাচে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধরন অন্তত সেই কথাই বলছে।
পুরো ম্যাচে বাংলাদেশের গোলমুখে ৩১টি শট নিয়েছে উত্তর কোরিয়া, যার ১১টি ছিল পোস্টে। বাংলাদেশ প্রতিপক্ষের গোলে একটি শটও নিতে পারেনি। গোলকিপার মিলি আক্তার একটা ধন্যবাদ পেতেই পারেন। পাঁচটি বল তাঁর আশপাশ দিয়ে জাল ছুঁয়েছে ঠিকই, কিন্তু আরও পাঁচ–ছয়টি গোলে শট কিন্তু দারুণ দৃঢ়তায় আটকেছেন তিনি।
শুধু মিলির দৃঢ়তাই নয়, বাংলাদেশের রক্ষণভাগ নিয়েও সন্তুষ্টির জায়গা আছে।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে দুই গোল হজম করার আগে যেভাবে উত্তর কোরিয়ার আক্রমণের ঝড় থামিয়েছেন শামসুন্নাহার সিনিয়র, নবীরণ খাতুন, আইরিন খাতুন, কোহাতি কিসকু, আফঈদা খন্দকার, তাঁদের ১০০–তে ৫০ মার্কস দেওয়াই যায়। বিশেষ করে দুই উইং হয়ে আসা আক্রমণগুলো বেশ নিখুঁতভাবেই সামলেছেন লেফটব্যাক শামসুন্নাহার এবং রাইটব্যাক কোহাতি।
সব মিলিয়ে প্রথমার্ধে উত্তর কোরিয়ার আক্রমণের ক্ষিপ্রতা এতটাই তীব্র ছিল বাংলাদেশের পাঁচ ডিফেন্ডারের সঙ্গে দুই মিডফিল্ডার মারিয়া মান্দা, মনিকা চাকমাও প্রতিপক্ষের আক্রমণ নষ্টের কাজে মন দেন। দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা গুছিয়ে খেলার চেষ্টা করেলেও আক্রমণভাগে বরাবরের মতো ব্যর্থই বাংলাদেশ। বিপরীতে উত্তর কোরিয়া অ্যাটাকিং থার্ডে ক্রমাগত ক্রস বাড়িয়ে, লং শটে তৈরি করা সুযোগগুলোকে গোলে পরিণত করেছে।
বাংলাদেশ নিজেদের পায়ে খুব একটা বল রাখতে পারেনি, পারেনি আক্রমণ করতেও। এই ‘না পারাটা’ যেমন তাদের ভীষণ পীড়া দেবে, তেমনি উত্তর কোরিয়ার শক্তি–সামর্থ্য দেখার পর এই হার থেকে ইতিবাচক বিষয়গুলোও তুলে নেবে।
উত্তর কোরিয়া র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ (র্যাঙ্কিংয়ে ১১২তম) থেকে ১০৩ ধাপ এগিয়ে, চারবার বিশ্বকাপে খেলেছে তারা, দশবার এশিয়ান কাপে খেলে তিনবার হয়েছে চ্যাম্পিয়ন। গত দশ ম্যাচে হেরেছে মোটে একটি। এমন একটা দলের বিপক্ষে ৫–০ গোলের হার স্রেফ হারই নয়, বরং বাংলাদেশের এই দলটাকে কীভাবে আরও সামনে এগিয়ে নেওয়া যায়, তা নতুন করে ভাবার উপলক্ষও।