বায়ার্নের বুন্দেসলিগা জয় উদ্‌যাপনে ‘কাকাতুয়া–রহস্য’

লিওন গোরেৎজার কাঁধে সেই কাকাতুয়ারয়টার্স

চার ম্যাচ হাতে রেখে বুন্দেসলিগার শিরোপা নিশ্চিত করেছে বায়ার্ন মিউনিখ। গত রোববার আলিয়াঞ্জ অ্যারেনায় স্টুটগার্টকে ৪-২ গোলে হারিয়ে ৩৫তম লিগ শিরোপা নিশ্চিত করে তারা। চ্যাম্পিয়নশিপ নিশ্চিত করলেও খেলোয়াড়দের হাতে এখনো ট্রফি ওঠেনি। কোলনের বিপক্ষে মৌসুমের শেষ ম্যাচের পর আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হবে এই ট্রফি। সেদিন ঐতিহ্য অনুযায়ী বিয়ারের ঝরনায় ভেসে যাবে বায়ার্নের লিগ জয়ের উৎসবও।

বায়ার্নের খেলোয়াড়েরা অবশ্য ট্রফি হাতে পাওয়ার অপেক্ষায় উদ্‌যাপন থামিয়ে রাখেননি। শিরোপা নিশ্চিতের পর থেকেই উৎসবের আনন্দে ভাসছেন তাঁরা। আর এ উদ্‌যাপনে দেখা মিলেছে এক কাকাতুয়া পাখিরও। গত মৌসুম থেকে বায়ার্নের শিরোপা–উৎসবের সঙ্গী পাখিটি।

এটি আসল কোনো পাখি নয়; বরং একটি চিনামাটির তৈরি কাকাতুয়ার ভাস্কর্য, যেটিকে খেলোয়াড়দের উদ্‌যাপনের সময় একজনের হাত থেকে অন্যজনের হাতে যেতে দেখা যায়। বায়ার্ন তারকা লিওন গোরেৎজা এই পাখির ভাস্কর্যের সঙ্গে পোজ দিয়ে বেশ কিছু ছবিও তুলেছেন।

গত রোববার শিরোপা নিশ্চিত করার পর আলিয়াঞ্জ অ্যারেনার দক্ষিণ পাশের স্ট্যান্ডের সামনে দাঁড়িয়ে বায়ার্নের পুরো দল ছবিও তুলেছে। সেখানে খেলোয়াড়, কোচ ও স্টাফদের পরনে ছিল সাদা টি-শার্ট। সেই টি-শার্টেও কাকাতুয়ার কার্টুনচিত্র ছাপানো ছিল। একেবারে ব্যতিক্রমী এক শিরোপা উদ্‌যাপন।

আরও পড়ুন

কাকাতুয়া পাখির ভাস্কর্য নিয়ে এমন এমন ব্যতিক্রমী উদ্‌যাপন দেখার পর অনেকের মনে তৈরি হয়েছে কৌতূহল। বায়ার্নের উদ্‌যাপনে এই পাখির উপস্থিতি কেন? ভক্ত-সমর্থকদের পাখিবিষয়ক কৌতূহল নিরসন করতেই একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম ‘দ্য অ্যাথলেটিক’। তারা জানিয়েছে, ভাস্কর্যটির উপস্থিতির পেছনে আছে এক ছোটখাটো চুরির গল্প।

গত মৌসুমেও বুন্দেসলিগার শিরোপা জেতে বায়ার্ন। এটি কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানির অধীনে তাদের প্রথম শিরোপা। তবে সেবার লিগের ৩২ নম্বর রাউন্ডে মাঠে না নেমেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বায়ার্ন। সেই রাউন্ডে সমীকরণ ছিল, তখনকার চ্যাম্পিয়ন লেভারকুসেন যদি ফ্রেইবুর্গের বিপক্ষে পয়েন্ট হারায়, তবে চ্যাম্পিয়নের মুকুট পরবে বায়ার্ন। পরে সেই ম্যাচে ২-২ গোলে ড্র করেছিল লেভারকুসেন।

কাকাতুয়ার ভাস্কর্য হাতে নিয়ে কাকাতুয়ার টি–শার্ট পরে বায়ার্নের উদ্‌যাপন
এএফপি

সেদিন বায়ার্নের ম্যাচ না থাকায় পুরো দল একসঙ্গে রাত কাটানোর পরিকল্পনা করে। দলের সবাই জড়ো হন শহরের কেন্দ্রে কেফার ট্যাভার্ন নামে একটি রেস্তোরাঁয়। বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও ভেতরে এটি বেশ আভিজাত্যপূর্ণ এক জায়গা।

খেলোয়াড়েরা একটি কক্ষে বসে সেদিন লেভারকুসেন-ফ্রেইবুর্গের ম্যাচটি দেখছিলেন। সন্ধ্যা গড়িয়ে যখন উদ্‌যাপনের আমেজ তৈরি হয়, তখন তাঁরা রেস্তোরাঁর ভেতরে থাকা কাকাতুয়ার একটি ভাস্কর্যের খোঁজ পান। রেস্তোরাঁর মালিক মাইকেল কেফার বহু বছর আগে প্যারিসের একটি পুরোনো জিনিসের দোকান থেকে এটি সংগ্রহ করেছিলেন।

সেদিন বায়ার্নেরই কেউ কাকাতুয়ার সেই ভাস্কর্য লুকিয়ে নিজের সঙ্গে নিয়ে নেন। বায়ার্নের খেলোয়াড়েরা যখন সন্ধ্যায় রেস্তোরাঁ থেকে বের হন, তখন সেই কাকাতুয়া ভাস্কর্যটিও তাঁদের সঙ্গেই রেস্তোরাঁ ছাড়ে। পরবর্তী সময়ে যেটিকে আবার দেখা যায় মৌসুম শেষে শিরোপা উদ্‌যাপনের আয়োজনে।

আরও পড়ুন

গত মৌসুমে কোম্পানির দল লিগ ট্রফি গ্রহণ করে, তখন বায়ার্নের এই কোচ পাখিটিকে ট্রফির বেদির ওপর রাখেন। ফলে সেদিন তোলা অসংখ্য ছবিতে সেটিই সামনে চলে আসে। পরে কাকাতুয়া নিয়ে জানতে চাইলে বায়ার্ন কোচ কোম্পানি বলেছেন, ‘কে নিয়েছিল আমি বলছি না। তবে আমি নিশ্চিত, এই গল্পটা কোনো একসময় সামনে আসবে।’ কোম্পানি এটিকে দলের নতুন ‘মাসকট’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে এটি পরে রেস্তোরাঁয় ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

যদিও পরবর্তী সময়ে তা আর করতে হয়নি। রেস্তোরাঁর মালিক কেফার বিষয়টি ইতিবাচকভাবেই নেন এবং শেষ পর্যন্ত তিনি কাকাতুয়ার ভাস্কর্যটি ক্লাবকে উপহার দেন। এর পর থেকে সেটিকে বায়ার্নের জন্য একধরনের সৌভাগ্যের প্রতীক বা ‘লাকি চার্ম’ ভাবা হচ্ছে।

এ ঘটনা কেফার ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের জন্যও বেশ লাভজনক হয়েছে। সোমবার থেকে বায়ার্নের বুন্দেসলিগা জয়ের স্মরণে কেফারের রেঁস্তোরায় একটি বিশেষ পণ্যের সিরিজ বিক্রি শুরু হয়েছে, যেখানে প্রতিটি পণ্যে কাকাতুয়া পাখির ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। ছবিতে দেখা যায়, পাখিটি গলায় মালার মতো করে লিগ ট্রফি পরে আছে।

শিরোপা জয়ের পর বায়ার্নের খেলোয়াড়েরা
এএফপি

এর আগে কাকাতুয়া পাখির প্রতিরূপটিকে গত গ্রীষ্মে ক্লাব বিশ্বকাপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রেও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালের আগস্টে ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার সুপারকাপের ম্যাচে বায়ার্ন স্টুটগার্টকে হারানোর পর এটি দেখা গিয়েছিল। বায়ার্ন আশা করছে, চলতি মৌসুম শেষ হওয়ার আগপর্যন্ত আরও কিছু বড় ম্যাচে জয়ের পর এই সৌভাগ্যের প্রতীককে তারা ব্যবহার করতে পারবে।

এরই মধ্যে ফ্রেঞ্চ কাপের সেমিফাইনালে উঠেছে তারা, যেখানে বুধবার তাদের প্রতিপক্ষ লেভারকুসেন। আগামী সপ্তাহে তারা পিএসজির বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনালের প্রথম লেগ খেলতে মাঠে নামবে। সব মিলিয়ে এই মৌসুমে একাধিক শিরোপা জেতার সুযোগ আছে বায়ার্নের। আর এই শিরোপা জয়ের পথে তারা সৌভাগ্যের প্রতীকটিকেও বারবার সামনে আনতে চায়।

এদিকে কাকাতুয়া পাখির ভাস্কর্যটি আসলে কে সরিয়েছিলেন, তা নিয়ে চলছে নানা জল্পনা। যদিও কেউ মুখ খুলছেন না। স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের তালিকায় চলে এসেছে গোরেৎজকা ও জশুয়া কিমিখের নামও। কিমিখকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রায়ই অপ্রস্তুতভাবে হেসে এড়িয়ে যান। তবে গত সপ্তাহান্তে তিনি জানিয়েছেন, দলের কোচিং স্টাফদের একজন অ্যারন ড্যাঙ্কসই নাকি ভাস্কর্যটি নিরাপদে রাখার দায়িত্বে আছেন।

কিমিখ স্থানীয় বাভারিয়ান টেলিভিশনে বলেন, ‘ড্যাঙ্কস সব সময় গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এটা সঙ্গে রাখে আর আমরা কিছু জিতলেই বের করে আনে। তাই আশা করি, এই মৌসুমে আমরা কাকাতুয়াটাকে আরও কয়েকবার দেখব।’