বিশ্বকাপে বজ্রপাত আর বজ্রঝড়: যখন ফিফার চেয়েও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ শক্তিশালী
এবার বিশ্বকাপে সব দলের কমন প্রতিপক্ষের নাম আবহাওয়া। উত্তর আমেরিকার গ্রীষ্মের আবহাওয়া বিশ্বকাপের ছন্দও বদলে দিতে পারে। কারণ, বিশ্বকাপের ম্যাচ আছে—এমন অনেক শহরে এ সময় বজ্রঝড়ের ভরা মৌসুম।
আর যুক্তরাষ্ট্রে আবহাওয়ার কারণে খেলা বন্ধ হওয়া খুবই সাধারণ বিষয়। দুই বছর আগে অরল্যান্ডোতে ম্যানচেস্টার সিটি বনাম বার্সেলোনার প্রীতি ম্যাচসহ বেশ কিছু প্রাক্-মৌসুম প্রস্তুতি ম্যাচ লম্বা সময়ের জন্য বন্ধ ছিল। তাহলে বিশ্বকাপে এমন কিছু হলে কী হবে
ফিফার নিয়ম কী বলে
আসলে ফিফার নিজস্ব কোনো নিয়ম এখানে নেই। তাদের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের পরামর্শ মেনেই চলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে ‘ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’–এর নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়। এই সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, স্টেডিয়ামের ৮ মাইলের (প্রায় ১৩ কিলোমিটার) মধ্যে কোথাও বজ্রপাত শনাক্ত হলেই খেলা বাধ্যতামূলকভাবে বন্ধ করতে হবে।
কতক্ষণ অপেক্ষা করা হবে এবং ম্যাচ কি পরিত্যক্ত হতে পারে
আবহাওয়ার কারণে খেলা স্থগিত হলে ফিফা প্রতিটি ম্যাচে একইভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। ম্যাচ পুরোপুরি পরিত্যক্ত ঘোষণার আগে খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে, তারও কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।
মূলত ম্যাচ শুরুর সময়টিকে গাইড হিসেবে ধরা হয় এবং স্টেডিয়ামের হাজার হাজার সমর্থক যেন নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, সেই সিদ্ধান্তকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। দিনের শুরুর দিকে ম্যাচ হলে সময় হাতে বেশি থাকে। তবে সব সময় সময়টাই একমাত্র নিয়ামক নয়। ২০১৫ সালের মেজর লিগ সকারের একটি ম্যাচের কথাই ধরা যাক। এফসি ডালাস বনাম টরন্টো এফসির ম্যাচটি বজ্রপাতের কারণে ৩ ঘণ্টা ২৬ মিনিট বন্ধ ছিল।
তবে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলোর ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। কারণ, সেই ম্যাচগুলো একই সময়ে মাঠে গড়ানোর কথা। এখন একটি ম্যাচ ঝড়ের কারণে বন্ধ হলে ফিফা কি অন্য ম্যাচটিও থামিয়ে দেবে? এ ছাড়া নকআউট পর্বের ম্যাচ হলে তো অতিরিক্ত সময় ও পেনাল্টি শুটআউটের বাড়তি সময়ের হিসাবও মাথায় রাখতে হবে।
যদি ম্যাচ বাতিল করা ছাড়া ফিফার কোনো উপায় না থাকে?
বিশ্বকাপের নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত দিনে ম্যাচ শেষ করা না গেলে তা পরবর্তী কোনো তারিখে পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। খেলাটি ঠিক যে মিনিটে বন্ধ হয়েছিল, সেখান থেকেই বাকি সময়ের খেলা শুরু হবে। অর্থাৎ কোনো ম্যাচ যদি ৭৬ মিনিটে বন্ধ হয়, তবে পরের দিন খেলোয়াড়েরা মাঠে নেমে বাকি ১৪ মিনিটের জন্য খেলবেন।
কোন ম্যাচগুলোতে ঝুঁকি বেশি
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং উপসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চলের আয়োজক শহরগুলো এই ঝড়ের মুখে পড়ার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে। বিশেষ করে আটলান্টা, বোস্টন, ডালাস, হিউস্টন, কানসাস সিটি, মায়ামি ও নিউ জার্সিতে নিয়মিত বজ্রঝড়ের দেখা মেলে। মেক্সিকোর মেক্সিকো সিটি ও মনটেইরে শহরও এ তালিকায় আছে।
অবশ্য আটলান্টা, ডালাস ও হিউস্টনের স্টেডিয়ামগুলোতে স্থায়ী বা অস্থায়ী ছাদ থাকায় ঝড়ের প্রভাব কিছুটা কম হতে পারে। ডালাসে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের প্রথম ম্যাচটি ছাদঢাকা স্টেডিয়ামেই হবে। স্কটল্যান্ডের তিনটি ম্যাচই বাজে আবহাওয়ার কবলে পড়তে পারে। স্টিভ ক্লার্কের দল বোস্টনে হাইতি ও মরক্কোর মুখোমুখি হওয়ার পর মায়ামিতে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলবে। স্টেডিয়ামের আকাশে রোদ থাকলেও কাছাকাছি কোথাও বজ্রপাত শনাক্ত হলে ম্যাচ বন্ধ করে দেওয়া হবে।
১৯৯৪ বিশ্বকাপে কেন ম্যাচ বন্ধ হয়নি
১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের অনেক ম্যাচই হয়েছিল দুপুরের প্রচণ্ড গরমের মধ্যে। ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে আয়ারল্যান্ড ও মেক্সিকোর মধ্যকার ম্যাচের সময় বাতাসের তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৪০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর পিচ লেভেলে তা ছুঁয়েছিল ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস! তবে সেই তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যেও ম্যাচগুলো কোনো রকম বিঘ্ন ছাড়াই শেষ হয়েছিল।
২০২৬ বিশ্বকাপে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে এমন শঙ্কার কারণ কী
যুক্তরাষ্ট্রে গ্রীষ্মকালে তীব্র বজ্রঝড় ও বজ্রপাত সব সময়ই স্বাভাবিক বিষয় ছিল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিপজ্জনক গরমের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়েছে। এই জলবায়ু সংকটের ফলে বাতাস এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি উষ্ণ ও আর্দ্র, যা আরও ভয়াবহ বজ্রঝড় এবং ঘন ঘন বজ্রপাতের জন্ম দিচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ৩০ বছর আগের তুলনায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে চরম আবহাওয়ার ঘটনা অনেক বেড়েছে।
২০০০ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত ইভেন্ট বন্ধ করার সিদ্ধান্তগুলো স্থানীয় পর্যায়ে নেওয়া হতো। এরপর পেশাদার ও অপেশাদার ক্রীড়া সংস্থাগুলো নিরাপদ খেলার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট নিয়ম তৈরি করে, যার অন্যতম একটি হলো ‘৩০/৩০ লাইটনিং রুল’। এখন নিয়মই হলো ‘যখনই মেঘ ডাকবে, ঘরের ভেতরে চলে যাও।’
এ ছাড়া বজ্রপাত শনাক্তকরণের প্রযুক্তি এখন অনেক আধুনিক। কোনো এলাকায় সতর্কবার্তা জারির জন্য এখন আর খালি চোখে বজ্রপাত দেখার প্রয়োজন পড়ে না, আধুনিক যন্ত্রেই তা নিখুঁতভাবে ধরা পড়ে।