বিদায় রোনালদো, স্বাগত নতুন পর্তুগাল

বিশ্বকাপ থেকে রোনালদোর কান্নাভেজা বিদায়রয়টার্স

ম্যাচে শেষ বাঁশি বাজল। শেষ মুহূর্তে মিকেল মেরিনোর করা গোলে স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নিল পর্তুগাল। ক্যামেরার লেন্স তখন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ওপর। হতাশা ও বিষণ্নতায় ভরা চোখ দুটি চেষ্টা করছে কান্না আটকানোর। কিন্তু কতক্ষণ আর পারা যায়! একটু পর কান্নাটা স্পষ্ট হলো। কিন্তু রোনালদো মাঠে তখন যেন এক নির্জন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। সতীর্থদের খুব একটা পাত্তা পেলেন না। কেউ কেউ নির্লিপ্তভাবে এসে হাত মিলিয়ে আলিঙ্গন করে গেলেন। তবে তা এতই নির্লিপ্ত যে এর চেয়ে এড়িয়ে যাওয়াই বরং ভালো!

প্রশ্ন হচ্ছে, পর্তুগালের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলারের বিশ্বকাপ থেকে এমন নীরস বিদায় কেন? এর জন্য দায়ী কে, কোচ রবার্তো মার্তিনজে, সতীর্থরা নাকি রোনালদো নিজে? আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করে তিন পক্ষকেই দায়ী করা যায়। যদিও এই দায় আরোপে বাস্তবতা বদলাবে না। সত্যি কথা হচ্ছে, পর্তুগালের বিশ্বকাপ অভিযান শেষ। রোনালদোর আর বিশ্বকাপ জেতা হলো না। বিশ্বকাপ না জেতা এলিটদের দলেই বরং থাকতে হচ্ছে তাঁকে।

২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে বিদায় নেয় পর্তুগাল। সেবার ম্যাচ শেষে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যাওয়া রোনালদোকে দেখে সবাই ধরেই নিয়েছিল, এখানেই বুঝি শেষ। কিন্তু বয়সকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রোনালদো চার বছর ধরে নিজেকে বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুত করেছেন। যদিও সেই প্রস্তুতি যে যথেষ্ট ছিল না, সেটা আজ স্পষ্ট।

বিশ্বকাপে রোনালদো ছিলেন এই পর্তুগাল দলে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। তাঁকে সহজে কেউ পাস দেয় না, তিনি প্রতিপক্ষের মার্কারকে ছিটকে সামনে এগোতে পারেন না এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সৃষ্টি করতে পারেন না ব্যক্তিগত কোনো জাদুকরি মুহূর্তও।

আরও পড়ুন

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে নিষ্প্রভ থাকার পর সতীর্থদের কথাতেও ছিল কটাক্ষের সুর। মাঠের খেলা এবং বাইরের আলাপে মনে হচ্ছিল, রোনালদো মাঠে আছেন জোর করে। সবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনি চেষ্টা করছেন অবিশ্বাস্য কিছু করার। যদিও তেমন কিছুই হয়নি। দুর্বল উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল এবং ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে একটি পেনাল্টি গোলই রোনালদোর অর্জন।

গোল করে ম্যাচের ভাগ্য বদলাতে না পারলেও আজ হেরে ঠিকই বিব্রতকর এক রেকর্ড সঙ্গী হয়েছে তাঁর। এই হারের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপে রোনালদোর পরাজয়ের সংখ্যা দাঁড়াল আটে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোনো খেলোয়াড়ই এর চেয়ে বেশি ম্যাচ হেরে মাঠ ছাড়েননি। বিশ্বকাপে আটটি করে হার রয়েছে আরও চার খেলোয়াড়ের—ম্যাথিউ লেকি, সন হিউং-মিন, আন্তোনিও কারবাহাল ও হং মিয়ুং-বোর।

ভেজা চোখে মাঠ ছাড়লেন রোনালদো
রয়টার্স

এমন হতাশাজনক রেকর্ডে নাম লেখানো রোনালদো হয়তো পর্তুগালের বিদায়ের একমাত্র কারণ নন, কিন্তু অন্যতম কারণগুলোর একটি তো বটে। তবে রোনালদোর আগে আঙুল তুলতে হয় কোচ রবার্তো মার্তিনেজের দিকে। যখন কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না, তখন কেন তিনি যোগ করা সময়ে গোল করায় কার্যকর গনসালো রামোসকে নামালেন না, যিনি আগের ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষেও গোল করেছিলেন।

কেন সব ভুলে ‘বুড়ো’ রোনালদোকে পুরো ৯০ মিনিট মাঠে রেখে দিতে হলো। গত বিশ্বকাপে ফার্নান্দো সান্তোস রোনালদোকে বেঞ্চে বসানোর যেটুকু সাহস দেখিয়েছিলেন, মার্তিনেজ সেটুকুও কেন দেখাতে পারলেন না? কোচ মার্তিনেজের রোনালদো ‘ফ্যান–বয়’ হয়ে যাওয়াই মূলত বিশ্বকাপে পর্তুগালের বিপর্যয়ের বড় কারণ।

আরও পড়ুন

বিশ্বকাপে রোনালদোকে খেলানো যেত টাইম–ম্যানেজমেন্ট করে। দুই অর্ধের কোনো একটিতে ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে তাঁকে নামানো যেত। সেই সময়টুকুতে রোনালদোর চেষ্টা থাকত, নিজেকে উজাড় করে দিয়ে ম্যচে প্রভাব রাখার। কিন্তু তা আর হয়নি। বরং ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে যখন তুলে ফেলা হচ্ছিল, তখন বেশ বিরক্তি নিয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি। মূলত দলের চেয়ে রোনালদোর বড় হয়ে ওঠাটাই হয়েছে সর্বনাশের কারণ।
দায় এড়াতে পারেন না সতীর্থরাও।

রোনালদো ছাড়াও এই দলে একাধিক তারকা ফুটবলার আছেন। ব্রুনো ফার্নান্দেজ, ভিতিনিয়া ও নুনো মেন্দেসদের যেকোনো একজনই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। তাঁরা চাইলে রোনালদোকে কেন্দ্র করে খেলা সাজাতে পারতেন। নিজেরা ভাগাভাগি করে দায়িত্ব নিতে পারতেন। কিন্তু তা হয়নি। বরং মাঠে বিভিন্ন সময়ে রোনালদোর কাছ থেকে কীভাবে বলকে দূরে রাখা যায়, সেই চেষ্টাই যেন করে গেছেন তাঁরা।

আর রোনালদো নিজেই বুঝতে চাইলেন না যে এভাবে হয় না। গতিহীন শরীর, ফিটনেস এবং বার্ধক্যের ছাপ নিয়ে জোর করে ফুটবল খেলা যায় না। কিন্তু রোনালদোকে কে বোঝাবে? তিনি খেললেন, ৯০ মিনিট মাঠে থাকলেন এবং শেষ পর্যন্ত কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছেড়ে আড়াল হয়ে গেলেন।  

বিশ্বকাপ শিরোপাটা অধরাই থেকে গেল রোনালদোর
রয়টার্স

রোনালদোর পারফরম্যান্স নিয়ে সাবেক ইংলিশ ফরোয়ার্ড ক্রিস সাটন বলেছেন, ‘একজন সেন্টার ফরোয়ার্ডকে নড়াচড়া করতে হয়, খেলায় অবদান রাখতে হয়, প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে হয়। তাঁর খেলায় বৈচিত্র্য থাকতে হয়। কিন্তু রোনালদোর মধ্যে কিছুই ছিল না। তিনি যেন মাঠে একজন বৃদ্ধ মানুষের মতো ধীরে ধীরে হাঁটছিলেন। এ কারণেই পর্তুগাল বিদায় নিয়েছে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আজ কিছুই করতে পারেননি। সত্যি বলতে, তিনি কোনো প্রভাবই রাখতে পারেননি। এই পর্তুগাল দলে অসাধারণ অনেক ফুটবলার আছেন। তাঁদের অনেকেরই মনে হবে, এই বিশ্বকাপটা খেলতে এসে তাঁদের সময় নষ্ট হয়েছে।’

আরও পড়ুন

যা হয়ে গেছে তা আর ফেরানো যাবে না। রোনালদো–যুগও হতাশা ও কান্নায় শেষ হয়ে গেল। তবে এখান থেকে নতুন শুরুর রসদ পর্তুগাল চাইলে নিতে পারে। রোনালদোবিহীন এক নতুন পর্তুগাল হবে সেটি। বিবিসি ওয়ানে সাবেক ইংল্যান্ড স্ট্রাইকার ওয়েইন রুনি যেমনটা বললেন, ‘রোনালদোর মতো একজন খেলোয়াড়কে হারানোর মধ্য দিয়েই পর্তুগালের নতুন যুগের শুরু হলো। তাঁর উপস্থিতিতে হয়তো কিছু খেলোয়াড় সব সময়ই তাঁর ছায়ায় ঢাকা পড়ে ছিল। অবশ্য তিনি ফুটবলে যা অর্জন করেছেন, তাতে এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। এখন অন্যদের সামনে নিজেকে পর্তুগালের প্রধান ভরসা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ এসেছে। অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের দায়িত্ব আরও বেশি করে কাঁধে তুলে নিতে হবে। একই সঙ্গে তরুণদেরও নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর সময় এসে গেছে।’

সুন্দর হলো না রোনালদোর বিদায়
রয়টার্স

রুনির কথাটাই মূলত এই লেখার শেষ কথা। পর্তুগালের বিশ্বকাপ শেষ। রোনালদোর অধ্যায়েও নামল পর্দা। এবার নতুন শুরুটা তারা কীভাবে করে, সেদিকেই চোখ থাকবে সবার। হ্যাঁ, এই যাত্রায় পর্তুগাল হয়তো রোনালদোর শেষের অধ্যায়টা মনে রাখতে চাইবে না। কিন্তু রোনালদোর পুরো ক্যারিয়ার থেকে অসংখ্য মণিমুক্তা আর অনুপ্রেরণার রসদ তো থাকছেই। সেগুলোই না হয় আগামী দিনে নতুন শুরুর সঙ্গী হোক। বিদায় রোনালদো, স্বাগত নতুন পর্তুগাল!