ঢেউয়ের ভাষা বোঝেন তাঁরা
দূর থেকে ঢেউ দেখতে কার না ভালো লাগে! কিন্তু সেই ঢেউয়ের ভাষা বোঝা সহজ নয়। কোন ঢেউ আপনাকে সামনে এগিয়ে দেবে, আর কোনটি মুহূর্তেই ছিটকে ফেলবে—তা বুঝতে হয় অভিজ্ঞতায়; বারবার পড়ে গিয়ে, আবার উঠে দাঁড়িয়ে। দুই সার্ফার মোহাম্মদ মান্নান ও ফাতেমা আক্তার সেই ভাষাটাই বুঝতে শিখেছেন। কক্সবাজারের ঢেউ তাঁদের শুধু সার্ফিংয়ের কৌশল শেখায়নি, শিখিয়েছে প্রতিকূলতার মুখে স্থির থাকতে, ব্যর্থতার পর আবার ফিরে আসতে এবং যত বাধাই আসুক, স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যেতে।
যাঁদের জীবনে ঢেউ কখনো এসেছে অভাবের রূপে, কখনো পরিবারের আপত্তি হয়ে, কখনো সামাজিক বাধা কিংবা অনিশ্চয়তা হয়ে। তবু তাঁরা থামেননি। পড়ে গেছেন, আঘাত পেয়েছেন, আবার বোর্ড হাতে সমুদ্রে ফিরেছেন। কক্সবাজারের সমুদ্রই তাঁদের নিয়ে যাচ্ছে আরও বড় মঞ্চে—আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর জাপানের আইচি-নাগোয়ায় শুরু এশিয়ান গেমসে। গত বছর ভারতের তামিলনাড়ুতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান সার্ফিং চ্যাম্পিয়নশিপে ১৮ দেশের মধ্যে নবম হয় বাংলাদেশ; যার সুবাদে প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসে সার্ফিংয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন এই দুজন। এশিয়ান গেমসের সার্ফিংয়ে অংশ নেবেন ১৭টি দেশের ৪৮ জন অ্যাথলেট। যেখানে পুরুষ ও নারী শটবোর্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন মান্নান ও ফাতেমা।
মান্নানের গল্পের শুরু কক্সবাজার সৈকতেই। পর্যটকদের কাছে শামুকের তৈরি গয়না ও কসমেটিকস বিক্রি করেন তিনি। সুগন্ধা বিচে একটি ভ্যানই তাঁর জীবিকার অবলম্বন। সেই ভ্যান থেকে যা আয় হয়, তাতেই চলে সংসার। মান্নান বলেন, ‘শামুকের গয়না ও কসমেটিকস বেচে দৈনিক ৫০০-৭০০ টাকা লাভ হয়। আসলে এটা না করলে পরিবারকে চালানো যাবে না।’ জীবিকার এই ব্যস্ততার মধ্যেও সমুদ্র ডাকলে ছুটে যান ঢেউয়ের কাছে। সার্ফিং তাঁর কাছে এখন আর শুধু খেলা নয়, ‘জীবনের অংশ।’
১৪ বছর বয়সে সার্ফিং শুরু করেছিলেন মান্নান। পরিবার চেয়েছিল যেন পড়াশোনায় মন দিয়ে নিরাপদ কোনো পেশা বেছে নেন। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ছিল অন্য রকম। সেই বিশ্বাস এখনো অটুট। মান্নানের ভাষায়, ‘সার্ফিং একদিন অনেক জনপ্রিয় হবে। অনেকেই এটাকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেবেন।’
স্বপ্ন থাকলেও পথটা সহজ ছিল না। এখনো তা নয়। মান্নান বলেন, ‘ওদের ভালো বোর্ড আছে। বড় ঢেউয়ে অনুশীলন করতে পারে। বিভিন্ন দেশে যেতে পারে। আমাদের এখানে অনেক সীমাবদ্ধতা।’ একটি সার্ফিং বোর্ডের দামই যেখানে ৭০-৮০ হাজার টাকা, সেখানে সেটি কেনা তাঁর মতো একজনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জই।
তাই নিজের চেষ্টাতেই এগিয়েছেন মান্নান। ইউটিউবে বিশ্বের সেরা সার্ফারদের ভিডিও দেখে কৌশল শেখার চেষ্টা করেছেন। একবার মালদ্বীপে গিয়ে বড় ঢেউয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বুঝেছেন, সমুদ্রকে শুধু জয় করতে হয় না, তার ভাষাও বুঝতে হয়।
ফাতেমার গল্পটা আরও আলাদা। বয়স মাত্র ১৬। শৈশবে বাবাকে হারিয়েছেন। অভাব তাঁর নিত্যসঙ্গী। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মেয়েদের জন্য সমাজের তৈরি নানা অদৃশ্য বাধা। একসঙ্গে সার্ফিং শেখা অনেক মেয়েকেই ধীরে ধীরে সমুদ্র থেকে হারিয়ে যেতে দেখেছেন ফাতেমা। কেউ অল্প বয়সে বিয়ে করেছে, কেউ সংসারের চাপে সার্ফিং ছেড়ে দিয়েছেন। বিদায়ের আগে তাঁদের কেউ কেউ ফাতেমাকে বলেছেন, ‘বিয়ে করো না, সার্ফিংটা ধরে রাখো।’
সেই কথাগুলোই যেন তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে। নানা চাপ ও সামাজিক বাধার মধ্যেও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন। ফাতেমা বলেন, ‘আমি শুধু নিজের মনের কথাটাই শুনেছি।’ অনুশীলনের পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছেন ফাতেমা। কারণ তাঁর বিশ্বাস, ‘একদিন ভালো কিছু হবে।’ বাড়ি কক্সবাজারের মহেশখালীতে। পড়েন দশম শ্রেণিতে।
সমুদ্রে সার্ফিং দেখতে যতটা সহজ, করতে ততটাই কঠিন। ঢেউ আসে, বোর্ড ছুটে চলে, কয়েক মুহূর্তের জন্য শরীর আর বোর্ড এক হয়ে যায়। সামান্য ভারসাম্যহীনতায় পতন। তারপর আবার উঠে দাঁড়ানো, আবার অপেক্ষা করা পরের ঢেউয়ের জন্য। মান্নান ও ফাতেমার জীবনও যেন এমনই—পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্প।
একজনের কাছে সার্ফিং দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সাহস, অন্যজনের কাছে নিজের ভবিষ্যৎ নিজে বেছে নেওয়ার সাহস। দুজনের পথ আলাদা হলেও গন্তব্য একই। কক্সবাজারের নোনাজল পেরিয়ে এবার তাঁদের সামনে জাপানের সমুদ্র, নতুন প্রতিপক্ষ আর নতুন পরীক্ষা। পদক আসবে কি না, সেই উত্তর দেবে সময়। কিন্তু বাংলাদেশের সার্ফিংয়ের ইতিহাসে তাঁদের নামটা এরই মধ্যে লেখা হয়ে গেছে।
সমুদ্র কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না। সে শুধু একের পর এক ঢেউ পাঠায়। পড়ে গেলে আবার উঠতে হয়, অপেক্ষা করতে হয় নিজের ঢেউটির জন্য। মান্নান ও ফাতেমা সেই অপেক্ষাতেই আছেন—দূর সমুদ্রের এমন এক ঢেউয়ের জন্য, যার সঙ্গে হয়তো প্রথমবার বাংলাদেশের পতাকাও একটু উঁচুতে উঠবে।