রোমানের নীরব এক শতকের কীর্তি
ঢাকঢোল পেটানো কোনো ঘোষণা নয়। বাংলাদেশের হকিতে ইতিহাস লেখা হয় নীরবেই। চুপচাপ নিজের মতো করে শততম ম্যাচের মাইলফলক পেরোলেন রোমান সরকার। জাতীয় দলের এই মিডফিল্ডার তাঁর শততম ম্যাচটি খেলেছেন বৃহস্পতিবার হংকংয়ের বিপক্ষে এশিয়ান গেমসের বাছাইয়ে পেনাল্টি শুটআউটে বাংলাদেশের জয় পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে, যেটি নিশ্চিত করেছে এশিয়াডে বাংলাদেশের খেলা। পরদিন চায়নিজ তাইপের বিপক্ষে পঞ্চম স্থান নির্ধারণী ম্যাচে খেলেন নিজের ১০১তম ম্যাচ।
আন্তর্জাতিক হকি ফেডারেশনের (এফআইএইচ) ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৮ আগস্ট মালয়েশিয়ার ইপোতে এশিয়া কাপের অভিষেকের পর এখন পর্যন্ত রোমান ১০১টি ম্যাচ খেলেছেন ১৯টি প্রতিযোগিতায়। গোল করেছেন ৩৪টি। ইনডোর ম্যাচ খেলেছেন ৫টি। অনূর্ধ্ব-১৮ ও অনূর্ধ্ব-১৯ মিলিয়ে আরও ৩৪টি ম্যাচ।
শততম ম্যাচ উপলক্ষে হংকংয়ের বিপক্ষে ম্যাচ শুরুর আগে মাঠে এশিয়ান হকি ফেডারেশন তাঁকে ফুলের তোড়া আর ছোট্ট একটি হকি স্টিক উপহার দিয়েছে। তা নিয়ে আপ্লুত রোমান গতকাল দলের সঙ্গে ঢাকা ফিরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘কয়েক বছর আগে ওয়েবসাইটে যখন ৮০টি ম্যাচ দেখাচ্ছিল, তখনই লক্ষ্য ঠিক করি ১০০টি ম্যাচ খেলবই। সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পেরে ভাগ্যবান আমি।’ তবে ব্যক্তিগত অর্জনের উল্টো পাশে মন খারাপ তাঁর, ‘এশিয়ান গেমসের বাছাইয়ে চ্যাম্পিয়ন হতে গিয়ে পঞ্চম হয়ে ফিরেছি। আরও ভালো হওয়া উচিত ছিল আমাদের ফল।’
জন্ম কুমিল্লায়। তবে বাবার ব্যবসার সুবাদে নারায়ণগঞ্জে কেটেছে ছোটবেলা। সেখানে ওসমানী স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলতেন। ঘটনাক্রমে বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়া। আস্তে আস্তে হকির প্রতি ভালোবাসা জন্মে। ২৮ বছর বয়সী রোমানের বেড়ে ওঠা দেখেছেন দেশের হকির সবচেয়ে বড় তারকা রাসেল মাহমুদ জিমি। বাংলাদেশের হয়ে যাঁর আন্তর্জাতিক ম্যাচসংখ্যা ২০০ ছুঁই ছুঁই। রোমানকে নিয়ে আপ্লুত জিমি বলছিলেন, ‘বিকেএসপিতে পড়ার সময় আমার ছোট ভাই রাকিনের সঙ্গে রোমানও আমাদের পুরান ঢাকার বাসায় আসত। একসঙ্গে আমরা অনেক সময় কাটাতাম। নৌবাহিনীতে একসঙ্গে যোগ দিয়েছি। একসঙ্গে খেলেছি জাতীয় দলে। আমাদের মধ্যে বন্ধুর মতো সম্পর্ক। খেলার প্রতি নিবেদনই তাকে এত দূর এনেছে।’
বাংলাদেশের হকিতে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার কোনো অফিশিয়াল পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই। দীর্ঘদিন ধরেই খেলোয়াড়দের ম্যাচসংখ্যা নির্ভর করে ব্যক্তিগত হিসাবের ওপর। ২০১২ থেকে এফআইএইচ ওয়েবসাইটে খেলোয়াড়দের পরিসংখ্যান সংরক্ষণ শুরু করে। যার মাধ্যমে খেলোয়াড়দের আংশিক তথ্য মিলছে।
এফআইএইচের তথ্য বলছে, ২০১২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ১৬টি প্রতিযোগিতায় জিমি ১৪১টি ম্যাচ খেলেছেন। তবে জিমির নিজের হিসাবে ম্যাচ আরও অনেক বেশি, ‘২০০৩ থেকে ধরলে আমার আন্তর্জাতিক ম্যাচ ২০০ হতে আর ছয়টি বাকি।’
২০১২ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত মামুনুর রহমান চয়নের অফিশিয়াল ম্যাচসংখ্যা ১০৬। তবে চয়নের নিজের হিসাবে ২০০৬ থেকে ধরলে তাঁর ম্যাচ ‘১৮০-১৮৫টির মতো হবে’। জাতীয় দলের সাবেক এই ডিফেন্ডার বলছিলেন, ‘জিমি ভাই সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলেছে। সম্ভবত আমি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।’ চয়নের সমকালীন মশিউর রহমান বিপ্লবও সেঞ্চুরি ক্লাবে আছেন, ‘২০০৬ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত জাতীয় দলে হয়ে আমার সম্ভবত ১০৪-১০৫টি ম্যাচ।’
এফআইএইচের তথ্য বলছে, ২০১২ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ইমরান হাসান পিন্টুর ম্যাচ ৯১টি। তবে পিন্টুর হিসাবে সংখ্যাটা আরও বেশি, ‘২০০৭ থেকে ধরলে আমার আনুমানিক ম্যাচ ১৫০টির মতো।’ পিন্টুর সঙ্গে শুরু করা কামরুজ্জামানের ম্যাচসংখ্যা ১৩৫-১৪০টির মতো। ওয়েবসাইটে ২০১২ থেকে তাঁর ম্যাচসংখ্যা ৮৫টি। ২০১২ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত কৃষ্ণ কুমার দাসের ম্যাচসংখ্যা ৬০টি, গোল ২২টি। তবে ২০০৮ থেকে ধরলে কৃষ্ণর হিসাবে ১২০টির মতো ম্যাচ হবে তাঁর।
বর্তমান জাতীয় দলের আশরাফুল ইসলামও শত ম্যাচের সামনে দাঁড়িয়ে। ২০১৫ সালে জাতীয় দলে অভিষিক্ত এই ডিফেন্ডার ১৭টি প্রতিযোগিতায় ৯৬টি ম্যাচ খেলেছেন। রেজাউল করিমও শততম ম্যাচের কাছাকাছি। ২০১২ থেকে ফরোয়ার্ড পুষ্কর খীসা মিমোর ম্যাচসংখ্যা ৯৭। মিমোর অভিষেক ২০০৯ সালে, তার মানে নীরবেই শততম ম্যাচে খেলা হয়ে গেছে তাঁর। খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত এই মাইলফলকগুলো শুধুই পরিসংখ্যান নয়। খেলাটির প্রতি তাঁদের নিবেদন, লড়াই আর দৃঢ়প্রতিজ্ঞার জ্বলজ্বলে এক বার্তাও।