ডানা মেলছে বাংলাদেশের নারী হকি
স্টিক-বলের ঠুকঠাক শব্দে গত কয়েক দিন মুখরিত ছিল মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়াম। কিশোরী-তরুণীরা স্টিক হাতে বলের পেছনে ছুটছেন—এমন দৃশ্য শিহরিত করেছে সবাইকে। ক্রিকেট ও ফুটবলের পর এবার ডানা মেলছে মেয়েদের হকিও। দেশের নারী হকি বিচ্ছিন্ন কিছু ঘরোয়া টুর্নামেন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে পড়েছে বড় পরিসরে।
দেশের ১৮টি জেলাকে ৪টি অঞ্চলে ভাগ করে আয়োজিত ব্র্যাক ব্যাংক ‘অপরাজেয় আলো’ নারী হকি টুর্নামেন্ট শেষ হয়েছে আজ। ফাইনালে ময়মনসিংহকে নিয়ে গড়া ‘জোন–৪’কে ৮–০ গোলের বড় ব্যবধানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ‘জোন-৫’ দেশের হকির একমাত্র ‘কারখানা’ বিকেএসপি। ঢাকার বাইরে হওয়া আঞ্চলিক পর্ব শেষে চার আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নের সঙ্গে ঢাকায় চূড়ান্ত পর্বে যোগ দেয় বিকেএসপিও। ফাইনালে বিকেএসপির কণা আক্তার একাই করেন চারটি গোল।
৩৫২ জন খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণে জমে উঠেছিল ব্র্যাক ব্যাংক ‘অপরাজেয় আলো’ নারী হকি টুর্নামেন্ট। অংশগ্রহণকারী অনেক মেয়েরই হকি স্টিক ও বলের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে এই টুর্নামেন্টে। অনেকে প্রথমবারের মতো ঢাকায় এসে মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামের টার্ফে খেলার সুযোগ পেলেন। গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন আয়োজিত ডেভেলপমেন্ট কাপে ১৪টি জেলা অংশ নিলেও এবার কক্সবাজার, নড়াইল, জয়পুরহাট ও সিলেটে যোগ হওয়ায় জেলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১৮টি। এটিই এখন পর্যন্ত দেশের নারী হকির সবচেয়ে বড় ঘরোয়া আসর।
টুর্নামেন্টে বিকেএসপির দাপট ছিল একতরফা। ৫ ম্যাচে তারা ৬৫টি গোল করেছে। গড়ে ম্যাচপ্রতি গোল ১৩টি। বিপরীতে একটি গোলও হজম করতে হয়নি তাদের। এতেই বোঝা যাচ্ছে বিকেএসপিকে এক পাশে সরিয়ে রাখলে দেশের নারী হকির আসল ছবিটা কেমন। বিকেএসপির বিশাল বিশাল ব্যবধানে জয়ের পেছনে বড় কারণ অনুমেয়ই। বিকেএসপির অনুশীলন ও উন্নত সুযোগ-সুবিধা জেলা পর্যায়ে নেই। বিকেএসপির মেয়েরা নিয়মিত টার্ফে খেলার সুযোগ পান, যা দেশের অন্য মেয়েরা পান না। জেলায় মেয়েদের টুর্নামেন্টও হয় না। ছিটেফোঁটা যেটুকু হকি চর্চা হয় জেলায়, সেটি আধুনিক হকির যুগে একেবারেরই বেমানান ঘাসের মাঠে। ফেডারেশন কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজন করলে তড়িঘড়ি দল তৈরি করে মাঠে নামে জেলা।
তারপরও নারী হকির চর্চা বাড়ছে, যা দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ভালো খবর। মেয়েরা উৎসাহিত হচ্ছেন, পুরস্কার পাচ্ছেন। ‘কোটি টাকার’ এই আয়োজনে যেমন সেরা গোলকিপার হয়েছেন রাজশাহীর মহুয়া এবং উদীয়মান তারকা নির্বাচিত হয়েছেন অপূর্ব আক্তার জান্নাতুল। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেয়েছেন চ্যাম্পিয়ন বিকেএসপির আইরিন আক্তার।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ওমানে বিশ্বকাপ বাছাই ফাইভ-এ-সাইড টুর্নামেন্টে পরপর তিন ম্যাচে সেরা হওয়া এই খেলোয়াড় এবার এসএসি পরীক্ষার্থী। পুরো আয়োজন নিয়ে আইরিন বেশ উচ্ছ্বসিত, ‘আগে ফুটবল খেলতাম। ঝিনাইদহের এক ম্যাডামের কথায় হকিতে ট্রায়াল দিই। বিকেএসপিতে খেলার পর এখন খেলাটাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আমরাই নারী হকির ভবিষ্যৎ এবং আমরাই এটাকে এগিয়ে নিয়ে যাব।’
ফাইনালে দুটিসহ ২২ গোল করে সেরা গোলদাতার পুরস্কার জিতেছেন বিকেএসপির অধিনায়ক এবং জাতীয় অনূর্ধ্ব-২১ দলের অধিনায়ক অর্পিতা পাল। ওমানে ফাইভ–এ–সাইড টুর্নামেন্টেও ২০ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন তিনি। নিয়মিত অনুশীলন, ভালো খাবার এবং ২-৩ জন কোচের অধীনে কঠোর পরিশ্রমই এই ফলের পেছনের কারণ বলে জানান অর্পিতা। তবে তাঁর কণ্ঠে যেন একটু আক্ষেপও আছে। শক্ত প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলার সুযোগ পাচ্ছে না বিকেএসপি। ফেডারেশনের কাছে অর্পিতার অনুরোধ, ‘ফেডারেশনের কাছে আবেদন জানাই যেন মেয়েদের খেলার সুযোগ আরও বাড়ানো হয়। আমরা যেন বড় প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলতে পারি।’
বিকেএসপির হকি কোচ জাহিদ হোসেন ও মওদুদুর রহমান মনে করেন, এই ধরনের আয়োজন মেয়েদের জন্য একটি শক্তিশালী মঞ্চ হিসেবে কাজ করবে, যা ভবিষ্যতে জাতীয় দল গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশে মেয়েদের বয়সভিত্তিক হকি খেলা হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় দল গঠিত হয়নি। তবে আগামী মার্চে এশিয়ান হকি ফেডারেশন কাপের জন্য জাতীয় দল গঠিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এমন টুর্নামেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেই পারে।
ফাইনাল শেষে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও রেফাত উল্লাহ খান আশ্বাস দিয়েছেন, আগামী দিনে এই টুর্নামেন্ট আরও বড় পরিসরে আয়োজন করা হবে।