যে পাঁচ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে অ্যাথলেটিকসে সুরক্ষা নীতিমালা
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রথমবারের মতো ‘সুরক্ষা নীতিমালা’ (সেফগার্ডিং পলিসি) প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এমন নীতিমালা এই প্রথম।
বিশ্ব অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের নির্দেশনায় ছোট বই আকারে এই সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। ফেডারেশনের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) নাঈম আশফাক চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে প্রায় ১০ মাসের কাজ শেষে গত ২৫ এপ্রিল নীতিমালাটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশেই অ্যাথলেটিকসে এমন নীতিমালা আছে। দক্ষিণ এশিয়ায় আছে ভারত ও পাকিস্তানে।
অ্যাথলেটিকসের সুরক্ষা নীতিমালার পরিধি বেশ বিস্তৃত। শুধু অ্যাথলেটদের জন্যই নয়; ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত সব সংস্থা, কর্মকর্তা, কোচ, বিচারক এবং প্রশিক্ষণস্থানের কর্মচারী ও স্বেচ্ছাসেবকদের ক্ষেত্রেও এটি সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। এর আওতায় থাকবেন সাংবাদিকেরাও।
নীতিমালায় মূলত পাঁচটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে—মানসিক নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, যৌন নির্যাতন এবং অবহেলা ও শোষণ। কাউকে মৌখিক বা শারীরিকভাবে আক্রমণ, অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য, যেকোনো ধরনের অশালীন আচরণ, অ্যাথলেটদের যত্ন নিতে ব্যর্থ হওয়া বা কাউকে আর্থিক স্বার্থে ব্যবহারের মতো বিষয়গুলো এসবের আওতার মধ্যে পড়বে।
নীতিমালা কার্যকর করতে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের সাবেক অধ্যাপক ও অ্যাথলেটিকস সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্ব ওয়াজিদা বানুকে ‘স্বাধীন সুরক্ষা কর্মকর্তা’ বা ‘সেফগার্ডিং’ অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারী প্রথমে তাঁর কাছে অভিযোগ করবেন। এরপর তা যাবে চার সদস্যের ‘সেফগার্ডিং’ বা ‘কেস ম্যানেজমেন্ট কমিটি’র কাছে; যার আহ্বায়ক সাবেক অ্যাথলেট শর্মিষ্ঠা রায়।
কমিটির অন্য তিন সদস্য সেভগার্ডিং অফিসার ওয়াজিদা বানু, ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান ও বর্তমান অ্যাথলেট শিরিন আক্তার। ভুক্তভোগীরা ঘটনার এক মাসের মধ্যে কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ করতে পারবেন। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন পুলিশেরও সহায়তা নিতে পারবে। সেফগার্ডিং কমিটি তদন্ত শেষে সুপারিশমালা ফেডারেশন সভাপতিকে জানাবে।
তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ রাখা যাবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে স্থায়ী বহিষ্কার, চাকরি থেকে অপসারণ এবং গুরুতর ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলাও করা যাবে। নীতিমালাটি তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে এরই মধ্যে চারটি বিভাগে ৫২টি স্কুলের ৯৮ জন শারীরিক শিক্ষা শিক্ষককে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়েছে অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন।
এই নীতিমালার ফলে অ্যাথলেটসহ সংশ্লিষ্ট সবাই উপকৃত হবেন বলে বিশ্বাস বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলমের, ‘বিশ্ব অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের নির্দেশনায় অ্যাথলেটিকস অঙ্গনে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে করা এই নীতিমালা বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন এক উদাহরণ। এটি নারী অ্যাথলেটদের জন্য মাঠের পরিবেশ অনেক বেশি নিরাপদ করবে।’
এর আগে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী গত ১৩ নভেম্বর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) দেশের ৫১টি ক্রীড়া ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশনকে অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে।
গত ৭ নভেম্বর জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলম নারী দলের সাবেক নির্বাচক ও ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলার পর দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। ওই ঘটনার পর এনএসসি ফেডারেশনগুলোকে গত ১৯ নভেম্বরের মধ্যে অন্তত তিনজন নারী সদস্যসহ পাঁচ সদস্যের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি গঠন করে এনএসসিতে জমা দিতে বলেছিল। তাতে কতটা সাড়া মিলেছে, জানতে চাইলে এনএসসির পরিচালক (ক্রীড়া) আমিনুল এহসান গত রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ৩৩টি ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশন আমাদের কাছে কমিটি পাঠিয়েছে।’
অবশ্য এনএসসিতে আগেই কমিটি জমা দিয়েছে সাঁতার, ভারোত্তোলন, ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস, কাবাডিসহ বেশি কয়েকটি ফেডারেশন। সর্বশেষ কমিটি জমা দিয়েছে জিমন্যাস্টিকস। দেশের সবচেয়ে বড় দুই ফেডারেশনের মধ্যে বিসিবি একটি কমিটি গঠন করলেও বাফুফে এখনো তা করেনি। কমিটি গঠন না করাদের তালিকায় আরও আছে দাবা, ফেন্সিং, ব্রিজ, রোইং, মার্শাল আর্ট কনফেডারেশন, রোলার স্কেটিং, বিলিয়ার্ড অ্যান্ড স্নুকারসহ আরও কয়েকটি ফেডারেশন।