বেশ কয়েক বছর ধরেই ঘরোয়া ফুটবলে ধুঁকছে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। অবনমনের শঙ্কায়ও পড়েছিল মাঝখানে। দলে জাতীয় দলের খেলোয়াড় মাত্র একজন। বিদেশিরাও সাধারণ মানের। তবু ক্যাসিনো–কাণ্ডের পর নেতৃত্বে আসা কর্মকর্তাদের স্বপ্নটা ছিল বড়। সেটি পূরণ করতে পারেননি বলে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের প্রথম পর্ব শেষে প্রধান কোচ শফিকুল ইসলাম মানিককে সরিয়ে দিয়েছে মোহামেডান। সহকারী কোচ আলফাজ আহমেদকে দেওয়া হয়েছে প্রধান কোচের দায়িত্ব।
কিন্তু প্রত্যাশিত ফল না পেলে যে হাড়িকাঠে গলা পাততে হবে তাঁকেও, সেটি বিলক্ষণ জানেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক। তবু চ্যালেঞ্জটা নিয়েছেন সানন্দেই। নতুন ভূমিকায় কিছুটা রোমাঞ্চিতও তিনি। প্রথম আলোকে দেওয়া আলফাজের সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে সেসবই—
প্রশ্ন :
বর্তমানে মোহামেডানের যা অবস্থা, দলকে সাফল্যের পথে ফিরিয়ে আনাটা বেশ কঠিনই। একটু কি বেশিই চ্যালেঞ্জ নিয়ে ফেললেন?
আলফাজ আহমেদ: চ্যালেঞ্জ নিতে আমি পছন্দ করি। নইলে সামনে এগোনো যাবে না। তা ছাড়া আমি জানি, প্রিমিয়ার লিগে আরও ভালো করা সম্ভব। প্রথম পর্বে ১০ ম্যাচে ১৬ পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ তিনে, ১৪ পয়েন্ট শেখ রাসেল ও শেখ জামালের, ১২ পয়েন্ট নিয়ে আমরা ছয়ে। কয়েকটি দল কাছাকাছি থাকায় আমাদের আরও ভালো করার সুযোগ আছে।
প্রশ্ন :
তাহলে ক্লাবের টেকনিক্যাল কমিটির সুপারিশে লিগের মাঝপথে কোচ পাল্টানোর সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিযুক্ত মনে করেন?
আলফাজ: ওটা ক্লাবের সিদ্ধান্ত। আমার কোনো মন্তব্য নেই। মানিক ভাইয়ের সহকারী ছিলাম, তাঁর জন্য আমি ব্যথিত। তবে এটাই নিয়ম। কোচের কাজটা থ্যাংকলেস জব, মিউজিক্যাল চেয়ারের মতো। খারাপ করলে আমিও বাদ পড়ব জেনেই দায়িত্ব নিয়েছি।
জাতীয় দলের ফল দিয়েই বোঝা যায় একটা দেশের ফুটবলের অবস্থা। আমাদের জাতীয় দলের বর্তমান অবস্থা খুবই খারাপ। সামনে দুটি ম্যাচ খেলবে তারা সিলেটে। কাদের নিয়ে খেলবে?
প্রশ্ন :
এবার স্বাধীনতা কাপে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে মোহামেডান, ফেডারেশন কাপে গ্রুপসেরা হয়ে শেষ আটে উঠেছে। লিগে ৩টি করে জয়–ড্র, ৪টি হার। মৌসুমে ১৬ ম্যাচে ৬ জয়, ৫ হার, ৪ ড্র। খুব খারাপ কি?
আলফাজ: ক্লাব যে আশা করেছিল, সেটা পূরণ হয়নি। মোহামেডান কি ১২ পয়েন্ট পাওয়ার টিম? ১৪-১৫ পয়েন্ট নিয়ে আরেকটু ওপরে থাকলে ভালো হতো। চট্টগ্রাম আবাহনীর সঙ্গে ড্রটা আমাদের জন্য খারাপ ফল। ফর্টিসের সঙ্গে ২ গোলে এগিয়ে শেষ পর্যন্ত ৪–৩ গোলে হার ক্লাব ভালোভাবে নিতে পারেনি। কোচ মানিক ভাই কিন্তু বলেছিলেন, এই দল নিয়ে দুটি ট্রফি জিততে চান। লিগে তিনে থাকার লক্ষ্যের কথাও বলেছিলেন। আসলে টুর্নামেন্ট নয়, লিগটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ক্লাবের কাছে। আর সেখানেই আমরা সেরাটা দিতে পারিনি।
প্রশ্ন :
এ মুহূর্তে মোহামেডানে জাতীয় দলের খেলোয়াড় শুধু শাহরিয়ার ইমন। এই মোহামেডানকে আপনি কোথায় নিতে চান?
আলফাজ: সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটাতে চাই। প্রথম লেগে যে মোহামেডানকে সমর্থকেরা দেখেছে, দ্বিতীয় লেগে অন্য মোহামেডানকে দেখবে। বর্তমান অবস্থা থেকে উন্নতি করাই আমার লক্ষ্য। লিগে অন্তত তৃতীয় হতে চাই। তবে আবাহনী খারাপ করলে দ্বিতীয় হওয়ারও সুযোগ আসতে পারে।
প্রশ্ন :
ফুটবলে মোহামেডানের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আপনি কতটা আত্মবিশ্বাসী?
আলফাজ: খেলোয়াড় হিসেবে দুই মেয়াদে আট বছর খেলেছি মোহামেডানে। দুটি করে জাতীয় লিগ ও ঢাকা লিগ জিতেছি। ফেডারেশন কাপ, ডামফা কাপসহ ৬-৭টি ট্রফি দিয়েছি। জুনিয়র টিমের কোচ ছিলাম। সর্বশেষ ২০০৫ সালে মোহামেডান যে ঘরোয়া লিগ (জাতীয় লিগ) জিতেছে, আমি সেই দলের অধিনায়ক। মানিক ভাই ছিলেন কোচ। মোহামেডানের প্রতি আমার একটা ভালোবাসা আছেই। কোচ হয়ে দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল, আমি রোমাঞ্চিত। মৌসুম শুরুর আগে ভাবিনি এভাবে দায়িত্ব পেয়ে যাব। প্রিমিয়ার লিগের প্রথম পর্বে আমাদের স্কোরিং, ডিফেন্ডিং, ফিটনেসে সমস্যা ছিল। ভালো মানের বিদেশিও ছিল না। এখন বিদেশি খেলোয়াড়ের একটা কোটা খালি আছে, ভালো বিদেশি আনতে চায় ক্লাব। সব মিলিয়ে আমি আশাবাদী।
প্রশ্ন :
কোচ হিসেবে আপনার আদর্শ কে?
আলফাজ: জাতীয় দলে খেলার সময় কোচ হিসেবে সামির সাকির, ম্যান ইয়ং ক্যাং, জর্জ কোটানকে পেয়েছি। ক্যাং–সামির কঠিন অনুশীলন করাতেন। আমি মনে করি, কঠিন অনুশীলনের বিকল্প নেই। তবে আমার কোচিং–গুরু বলব জর্জ কোটানকে। তাঁর বিশ্লেষণী ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। কাকে দিয়ে কী করাতে হবে, বুঝতে পারতেন। ফুটবলারদের মাঠে স্বাধীনতা দিতেন। উজ্জীবিত করতেন। তিন বছর শন লেনের সঙ্গে মোহামেডানে সহকারী হিসেবে কাজ করেও অনেক কিছু শিখেছি। তিনিও ফুটবলারদের উজ্জীবিত করতেন। সবার সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। এই সবই নিজের মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা করি আমি।
প্রশ্ন :
দেশের ফুটবলের অবস্থা কেমন দেখছেন?
আলফাজ: জাতীয় দলের ফল দিয়েই বোঝা যায় একটা দেশের ফুটবলের অবস্থা। আমাদের জাতীয় দলের বর্তমান অবস্থা খুবই খারাপ। সামনে দুটি ম্যাচ খেলবে তারা সিলেটে। কাদের নিয়ে খেলবে? জাতীয় দলে খেলোয়াড়–সংকট, স্ট্রাইকার নেই। এলিটা কিংসলিকে নিতে হলো। জামাল ভূঁইয়া, তারিক কাজী, এলিটা—তিনজনের কেউই আমাদের তৈরি ফুটবলার নয়। আমার দেশের খেলোয়াড় কোথায়?
প্রশ্ন :
খেলোয়াড় তো আসবে লিগ থেকে। সেই লিগ কি আকর্ষণ তৈরি করতে পারছে?
আলফাজ: প্রতিবছর লিগ হচ্ছে, এটা ভালো দিক। কিন্তু লিগের আকর্ষণ নেই বললেই চলে। মানুষ মাঠে তেমন একটা আসে না। মোহামেডান–আবাহনী ম্যাচে কুমিল্লায় গ্যালারি ফাঁকা দেখলাম। এ অবস্থা দেখে খারাপ লাগে।