‘দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন’ কথাটা খেলাধুলায় তো আর কম ব্যবহার করা হয়নি। কিন্তু আজ মেলবোর্নে কার্লোস আলকারাজ যা করলেন, সেটাকে স্রেফ ‘দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন’ বললেও যেন অনেক কম বলা হবে। অসাধ্য সাধন? এতেও ঠিক ফুটে উঠছে না আলকারাজের জয়ের মহিমা।
চোট আর অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণা সঙ্গী করেও কী এক ম্যাচ খেললেন স্প্যানিশ এই তারকা! পাঁচ সেটের কী এক মহাকাব্যিক ম্যাচ জিতলেন! শুধু ৬-৪, ৭-৬ (৫), ৬-৭ (৩), ৬-৭ (৪), ৭-৫ স্কোরলাইনের সাধ্য কী আলকারাজের অবিশ্বাস্য এই জয়ের গল্প তুলে ধরার!
মেলবোর্ন পার্কের আনাচকানাচে গত কয়েক দিন ধরেই ফিসফাস চলছিল। অস্ট্রেলিয়ান ওপেন কি তবে তার জৌলুশ হারিয়ে ফেলল? ম্যাচগুলো কেমন যেন একপেশে হচ্ছে, মনে রাখার মতো মুহূর্ত কই? রড লেভার অ্যারেনায় আজ প্রথম সেমিফাইনালের পর এই ফিসফাস অবশ্যই থেমে যাবে, অনেক অনেক দিন মনে রাখার মতো এক ম্যাচ উপহার দিয়েই ক্যারিয়ারের প্রথম অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ফাইনালে উঠলেন আলকারাজ!
ম্যাচের শুরুটা দেখে অবশ্য মনে হয়নি এত নাটক অপেক্ষা করছে। প্রথম দুই সেট তো পুরো আলকারাজ-ময়। তারপরই এক অনাকাঙ্ক্ষিত মোড়! তৃতীয় সেটের শেষের দিকে দেখা গেল আলকারাজ ঠিকমতো নড়াচড়া করতে পারছেন না। ঊরুর চোট আর ‘ক্র্যাম্প’—দুই দানব যেন ভর করেছে তাঁর শরীরে। এমনকি বিরতির সময় তোয়ালেতে দুবার বমিও করলেন। তখন তো মনে হচ্ছিল হয়তো আলকারাজ এই ম্যাচ শেষই করতে পারবেন না।
নাটকের শুরুটা তৃতীয় সেটে, ৪-৪ গেমে। একটি ভলি ফেরাতে গিয়ে টান লাগে আলকারাজের পেশিতে। একপেশে ম্যাচে হঠাৎ যেন পাশার দান উল্টে গেল। আলকারাজ ৫-৪ গেমে এগিয়ে থেকে ‘মেডিক্যাল টাইম-আউট’ চাইলেন, জভেরেভ তখন মেজাজ হারিয়ে রীতিমতো অগ্নিশর্মা। তাঁর দাবি, আলকারাজের তো শুধু পেশিতে টান (ক্র্যাম্প) পড়েছে, আর নিয়মানুযায়ী ক্র্যাম্পের জন্য কোনো মেডিক্যাল টাইম-আউট নেওয়া যায় না। আম্পায়ারের ওপর ক্ষোভ ঝেড়ে বললেন, ‘ওকে এভাবে সুযোগ দেওয়া অবিশ্বাস্য!’
টেনিসের নিয়ম বলছে, ক্র্যাম্পের জন্য সর্বোচ্চ তিনটি বিরতি নেওয়া যায়, কিন্তু পুরো টাইম-আউট নয়। আলকারাজ কি তবে অন্য কোনো চোটের কথা বলেছিলেন? সেই রহস্য কোর্টেই থেকে গেল।
যন্ত্রণার মধ্যেও আলকারাজ প্রায় এক পায়ে খেলা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। চতুর্থ সেটে একটি দুর্দান্ত র্যালির পর যন্ত্রণার মধ্যেও যখন তাঁর মুখে চওড়া হাসি দেখা গেল, মনে হচ্ছিল তিনি জভেরেভকে বলছেন, ‘আঘাত নিয়েও মন্দ খেলছি না, কী বলো?’ দর্শকদের চিৎকারে তখন রড লেভার অ্যারেনায় কান পাতা দায়!
পঞ্চম সেটে জভেরেভ যখন ৪-২ গেমে এগিয়ে, তখন আবার মনে হচ্ছিল ম্যাচটা তাঁর মুঠোয়। কিন্তু আলকারাজ যেন নাছোড়বান্দা! ৩-২ স্কোরে জভেরেভের সার্ভিসের সময় এক অতিমানবীয় ফোরহ্যান্ড রিটার্নে ব্রেক পয়েন্ট আদায় করে নিলেন। জভেরেভ বারবার চেষ্টা করছিলেন আক্রমণাত্মক হওয়ার, কিন্তু ভাগ্য আর আলকারাজের প্রবল জেদের কাছে তাঁকে হার মানতেই হলো।
ম্যাচ জয়ের জন্য জভেরেভ যখন সার্ভিস করতে এলেন, আলকারাজ তখন ‘ছুটন্ত ট্রেনের’ মতো অপ্রতিরোধ্য। ৫-৫ থেকে মুহূর্তেই স্কোর হলো ৬-৫। গ্যালারির গর্জনের মধ্যেই আলকারাজ যেন ডানা মেললেন আকাশে। ৫টি ব্রেক পয়েন্ট নষ্ট করার আক্ষেপ মুছে দিয়ে শেষ পর্যন্ত সেই ট্রেডমার্ক রানিং ফোরহ্যান্ড শটেই বাজিমাত করলেন! যে শটে গত বছর ফ্রেঞ্চ ওপেনে ইতিহাস গড়েছিলেন, সেই একই শটে আজ জভেরেভকে স্তব্ধ করে দিয়ে কোর্টে শুয়ে পড়লেন অবিশ্বাস্য এক জয়ের আনন্দে।
৫ ঘণ্টা ২৭ মিনিটের এই ম্যারাথন লড়াই শেষে যখন জিতলেন, ঘড়ির কাঁটা বলছে এটি অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ইতিহাসের দীর্ঘতম সেমিফাইনাল।
ম্যাচ শেষে আলকারাজ অকপটে স্বীকার করলেন, তৃতীয় সেটে তিনি কতটা অসহায় ছিলেন, ‘শারীরিকভাবে এটি আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম কঠিন ম্যাচ ছিল। আমাকে স্রেফ হৃদয় নিংড়ে লড়াই করতে হয়েছে।’
কীভাবে এই অসাধ্য সাধন করলেন, ম্যাচ শেষে এমন প্রশ্নে আলকারাজ শুধু বলেছেন, ‘বিশ্বাস! বিশ্বাস!’
আসলে হয়তো এই বিশ্বাসই চ্যাম্পিয়নদের বাকিদের চেয়ে আলাদা করে দেয়। পাঁচ সেটের লড়াইয়ে আলকারাজের পরিসংখ্যান এখন ১৫ জয়, ১ হার! ক্যারিয়ার গ্র্যান্ড স্লাম থেকে এখন মাত্র এক ধাপ দূরে টেনিসের এক নম্বর তারকা। আগামী রোববার ফাইনালে জিতলে ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে গড়বেন এই অনন্য কীর্তি।
জয়ের পর কোর্টেই যখন এটা তাঁকে মনে করিয়ে দেওয়া হলো, চোখেমুখে ক্লান্তি নিয়েও মজা করার লোভ সামলাতে পারেননি আলকারাজ।
উপস্থাপককে বলেছেন, ‘আমার ওপর চাপ তৈরির জন্য অনেক ধন্যবাদ।’