এই ফরাসি স্ট্রাইকার চাইলে এখন মারিও বালোতেল্লির মতো বলতেই পারেন, ‘হোয়াই অলওয়েজ মি।’ নেতিবাচক খবরে বিরক্ত হয়ে সাবেক ইতালিয়ান স্ট্রাইকার বালোতেল্লি এই কথা বলে প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এমবাপ্পের প্রতি এই বিদ্বেষ।
মাঠের পারফরম্যান্সের কথা বললে, এমবাপ্পেকে নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ সামান্য।

চার বছর আগে যাদের হাত ধরে ফ্রান্স দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতেছিল, এমবাপ্পে তাঁদের অন্যতম। সেই বিশ্বকাপের আগে পরিচিত মুখ হয়ে উঠলেও রাশিয়ায় আলো ছড়িয়েই নিজেকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যান এই পিএসজি তারকা। পরে বিশ্বকাপ জেতার অনুভূতিকে ‘পাগলাটে’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। মেসি-রোনালদো-নেইমাররা যখন বারবার হতাশ হয়ে ফিরছিলেন, তখন মাত্র ১৯ বছর বয়সেই সাফল্যের শিখর ছুঁয়েছিলেন এমবাপ্পে।

পরবর্তী সময়ে মাঠের পারফরম্যান্সে অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা মিললেও এমবাপ্পে কখনো নিজের আসল কাজ থেকে বিচ্যুত হননি। সবুজ গালিচায় জাদুকরি সেই সব দৌড় গত চার বছরে ঠিকই উপহার দিয়ে গেছেন এই ফরাসি স্ট্রাইকার। তবে মাঠের বাইরে আশ্চর্যজনক ছন্দপতন দেখা যায় তাঁর, জনপ্রিয়তায় নামে ধস। ধীরে ধীরে যেন ‘গণশত্রু’তে পরিণত হয়েছেন এই ফুটবল তারকা। এবারও ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতানোর ভার নিয়েই কাতারে গেছেন এমবাপ্পে। তবে চার বছর আগের সমর্থন যে তিনি পাবেন না, তা বলাই যায়।

এমবাপ্পের শুরুটা হয়েছিল রকেটগতিতে। ২০১৭ সালে বিশ্বের দ্বিতীয় দামি তারকা হিসেবে যান পিএসজিতে। একই সময়ে রেকর্ড দলবদলে পিএসজিতে যান নেইমারও। শুরুতে নেইমার-এমবাপ্পে জুটি দারুণভাবে জমে ওঠে। নেইমারের প্রতি নিজের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কথা কখনো গোপন করেননি এমবাপ্পে। তবে সেই সম্পর্ক ধীরে ধীরে অবনতির দিকে গড়িয়েছে।

গত মৌসুম থেকে দুজনের তিক্ততার কথাও সামনে আসে। বিশেষ করে লিওনেল মেসি পিএসজিতে আসার পরই নেইমারের সঙ্গে এমবাপ্পের সম্পর্ক আর আগের মতো থাকেনি। মেসি-নেইমারের বন্ধুত্বও হয়তো এখানে প্রভাব রাখতে পারে। এমনকি নেইমারকে ছেড়ে দিতেও নাকি পিএসজি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছিলেন এমবাপ্পে। সরাসরি কিছু না বললেও দুজনের শীতল সম্পর্ক ধরা পড়ে মাঠেই। পেনাল্টি নেওয়া নিয়ে প্রকাশ্যে বিরোধে জড়ান দুজন। তবে বরাবরই খলনায়ক হয়েছেন এমবাপ্পে।

এর মধ্যে নতুন খবর ছিল, মেসি-নেইমারকে অ্যাসিস্ট করেন না এমবাপ্পে। যদিও তখন পর্যন্ত মেসি বা নেইমারকে শুধু নন, অন্য কোনো খেলোয়াড়কেও অ্যাসিস্ট করেননি এই ফরোয়ার্ড। তবে এসব খবর ক্ষুব্ধ করেছে বিশ্বব্যাপী মেসি-নেইমারের ভক্তদের। এমবাপ্পের সমালোচকদের বড় অংশ তাঁরাই। যাঁদের কাছে এমবাপ্পে স্বার্থপর ছাড়া কিছুই নন।

সমালোচকের তালিকায় পরের দল রিয়াল মাদ্রিদের সমর্থকেরা। দুই মৌসুম ধরে মাদ্রিদে যাওয়া নিয়ে নাটকীয় এক ঘটনার অংশ হয়েও বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন এমবাপ্পে। দুই মৌসুম ধরে অপেক্ষায় রেখে শেষ পর্যন্ত রিয়ালকে ফিরিয়ে দেন এই পিএসজি তারকা, যা স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ‘শত্রু’র তালিকায় যুক্ত করে দিয়েছে রিয়াল সমর্থকদেরও। শত্রু বানানোর এই খেলা অবশ্য সেখানেই থামেনি।

পিএসজির সঙ্গে চুক্তি নবায়নের এক মৌসুম না পেরোতে সেখানেও ক্লাব কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও তিনি ঝামেলায় জড়ান। জানা যায়, জানুয়ারিতেই ক্লাব ছাড়তে যাচ্ছেন। এসব ঘটনা তাঁর প্রতি বিদ্বেষের দিকে ঠেলে দিয়েছে পিএসজি–ভক্তদেরও। ব্যালন ডি’অরের অনুষ্ঠানে নিজ শহর প্যারিসেই দুয়ো শুনতে হয়েছিল তাঁকে। এর মধ্যে শোনা যায়, রূপান্তরকামী এক নারীর সঙ্গে প্রেম করছেন এমবাপ্পে, তা নিয়েও শুনতে হয়েছে বিরূপ মন্তব্য।

এর আগে গত বছর ইউরোতেও তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল এমবাপ্পেকে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করে পরিণত হয়েছিলেন খলনায়কে। সে সময়ও বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হন।

একপর্যায়ে জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছিলেন এই ফুটবলার। পরে অবশ্য নিজের মত পাল্টে জাতীয় দলে খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বলেছিলাম, যারা আমাকে বানর মনে করে, তাদের জন্য আমি খেলতে পারি না। আমি জাতীয় দলে খেলব না। তবে এরপর যারা আমার সঙ্গে খেলে এবং শুভাকাঙ্ক্ষী, তাদের কথা ভাবি। আমার মনে হলো, হাল ছেড়ে দেওয়ার বার্তা ভালো কিছু নয়। কারণ, আমার মনে হয়, আমি সবার জন্য দৃষ্টান্ত। এটা নতুন ফ্রান্স...ফলে আমি জাতীয় দল ছেড়ে দিতে পারি না। এখানে নতুন প্রজন্মের জন্য একটা বার্তাও—যা বলছে, আমরা এর চেয়ে (বর্ণবাদ) শক্তিশালী।’

ফুটবলে তথা ক্রীড়া দুনিয়ায় বর্ণবাদবিরোধী লড়াইটা লম্বা সময়ের। প্রতিনিয়ত বর্ণবাদবিরোধী অবস্থানের কথা বলতে শোনা যায় খেলোয়াড়দের ও দলগুলোকে। তবে এরপরও বর্ণবাদ কমছে, এমন দৃষ্টান্ত নেই।

গত ইউরোতে পেনাল্টি মিস করার পর মার্কস র‍্যাশফোর্ড এবং বুকায়ো সাকাকেও পড়তে হয়েছিল ব্যাপক বর্ণবাদী আক্রমণের মুখে। এমবাপ্পের দিকে ছোড়া সমালোচনার তিরগুলোও বর্ণবাদের বিষ মেশানো। এখন বিশ্বকাপ শুরুর আগেই পড়েছে বর্ণবাদের থাবা। সামনের দিনগুলোতেও এমন ঘটনা বাড়তে থাকলে তা সুন্দর ফুটবলকে শুধু কলঙ্কিতই করবে।