চাপটা এখানেই সবচেয়ে বেশি
বেলা ১১টার দিকেও যেন ভোরের নীরবতা হলিডে ইন হোটেলে। হারারেতে দুই দল দুই হোটেলে থাকলেও বুলাওয়েতে এসে বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে একই হোটেলে। অথচ লবি-সুইমিংপুলের আশপাশে ঘুরে মনে হলো কাকপক্ষীও নেই!জিম্বাবুয়ে দল অনুশীলনে ছিল। কিন্তু কালকের দিনটা পুরোই ছুটি ছিল বলে বাংলাদেশ দলের তো তখন হোটেলেই থাকার কথা! হ্যাঁ, তাঁরা হোটেলেই ছিলেন, কিন্তু বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই ছিলেন গভীর ঘুমে। একটু পর লবিতে আসা ম্যানেজার তানজীব আহসানের কাছে জানা গেল সবার এত বেলা পর্যন্ত ঘুমানোর কারণ, ‘ভোর সাড়ে ৫টার দিকে হঠাৎ করে পুরো হোটেলে ফায়ার অ্যালার্ম বেজে ওঠে। রুমে রুমে ফোন করে সবাইকে জাগানো হয়। ভয়ে সবাই দৌড়ে রুম থেকে বের হয়ে আসে।’ ভোরে ভেঙে যাওয়া ঘুম পুষিয়ে নিতেই পরে দেরি করে উঠেছেন সবাই। ফায়ার অ্যালার্ম বেজে ওঠার কারণটাও বেশ মজার। হোটেলের এক স্টাফ নাকি এই ভোরবেলাতেই স্টিম বাথ নিচ্ছিলেন। সেই বাষ্পেই তীব্র শব্দে বেজে ওঠে অ্যালার্ম!শাপেবরই হয়ে থাকবে তাতে। ছুটির দিনেও যেহেতু নিয়মিত রুটিনের বাইরে যাওয়াটা পছন্দ নয় বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের, অলস সময়ের দৈর্ঘ্য তো একটু কমে এল! আগের দিন সিরিজে সমতা আসা হারের গ্লানিও নিশ্চয়ই কিছুটা হারিয়ে গেছে ঘুমের গভীরতায়। খেলোয়াড়দের ছুটি মানে কোচিং স্টাফদেরও ছুটি। কোচ শেন জার্গেনসেন এই সুযোগে ঘুরতে গেলেন হোটেল লাগোয়া ছোট শপিংমলে। সারা দিনে তাঁর কাজ বলতে সন্ধ্যায় মমিনুল হকের সঙ্গে ব্যাটিংয়ের ভিডিও ফুটেজ নিয়ে বসা। অবশ্য এই অবসরেও কোচের কপালে চিন্তার বলিরেখা। পরশু মতিঝিল-পল্টনের ধ্বংসযজ্ঞের কথা শুনে হতভম্ব তিনিও। বারবার জানতে চাচ্ছিলেন সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে কিনা। সব বাদ দিয়ে বাংলাদেশ দলের এমন আয়েশে দিন কাটানো দেখে মনে হতে পারে কালকের সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচটাকে তাঁরা পাত্তাই দিচ্ছেন না। ব্যাপার আসলে তা নয়। জিম্বাবুয়ের মাটিতে জিম্বাবুয়ে যে সিংহ হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে, সেটা তো প্রথম টেস্ট আর দ্বিতীয় ওয়ানডেতেই পরিষ্কার। তা ছাড়া প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে মানেই বাংলাদেশের দলের ওপর বিশাল চাপ। সেখানে সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচের আগে সেটা বেড়েই যাওয়ার কথা। সুইমিংপুলের পাশে বসে মোহাম্মদ আশরাফুলও বলছিলেন, ‘জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খেলার সময় আমাদের ওপর যতটা চাপ থাকে, ততটা বড় দলের বিপক্ষেও থাকে না। বড়দের বিপক্ষে হারলেও সমস্যা নাই, ভালো খেললেই হয়। কিন্তু জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সবাই আশা করে যে আমরা প্রতিটি ম্যাচ জিতব। এটা তো অবশ্যই চাপ।’
আশরাফুলের মতো তারকাদের এবার এই চাপ একটু বেশিই অনুভূত হওয়ার কথা। জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক ব্রেন্ডন টেলর যে আগের দিন বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটারদের ফর্মে না থাকার কথাটা মনে করিয়ে দিলেন, তা তো মিথ্যা নয়। পরশুর ম্যাচে সাকিব আল হাসান ব্যাট হাতে মাথার ওপর জমা চাপের মেঘটাকে সরানোর পথে ছিলেন, কিন্তু ভুল আউট দিয়ে বাদ সাধলেন আম্পায়ার। সেজন্য অসন্তোষ প্রকাশে একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলা সাকিবকে পরে ম্যাচ ফির ৭৫ শতাংশ জরিমানা করেছেন ম্যাচ রেফারি।
দলের বাকি তারকারা চাপটা কীভাবে সামলাচ্ছেন কে জানে, তবে মাহমুদউল্লাহই বোধ হয় সেটা একটু বেশিই নিয়ে নিচ্ছেন। সহ-অধিনায়ক হয়েও দলের প্রতিনিধি হয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে আসতে তাঁর প্রবল আপত্তি। সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে দলের হয়ে কথা বলা যে সব সময় অধিনায়কেরই কাজ নয়, সহ-অধিনায়কও মাঝেমধ্যে পারেন অধিনায়কের সে ভার কমিয়ে দিতে, সেটা তাঁকে কে বোঝায়! ম্যানেজারের কাছে কাল বারবার মাহমুদউল্লাহকে চেয়েও তাই পেলেন না বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা। আশরাফুল এলেন বিকল্প হিসেবে।
সেই আশরাফুলের দৃষ্টিতে এবার বুলাওয়েতেও জিম্বাবুয়ের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে না পারার কারণ কুইন্স স্পোর্টস ক্লাবের বদলে যাওয়া উইকেট, ‘এবার ওরা উইকেটে একটু বেশি ঘাস রাখছে। আগে এখানে স্পিন হতো। এবার হচ্ছে না। সেকেন্ড হাফেও না। তা ছাড়া এখানে পরে ব্যাটিং করা সহজ। সকালে অন্তত ১৫ ওভার পর্যন্ত শট খেলা কঠিন।’ একই উপলব্ধি টিম ম্যানেজমেন্টেরও। উইকেট একই রকম থাকলে তাই শেষ ম্যাচে টসে জিতলে আগে ফিল্ডিং করার ইচ্ছা বাংলাদেশ দলের।
কালকের ‘ফাইনালে’ ম্যাচ জয়ের আগে তাই টস জয়ের হাসি হাসাটাও জরুরি বাংলাদেশ দলের জন্য।