ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের হামলা অবৈধ ও অপরিণামদর্শী: নিউইয়র্ক টাইমস এডিটরিয়াল বোর্ড
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলায় হামলা চালনোকে অবৈধ ও অপরিণামদর্শী কাজ বলে উল্লেখ করেছে নিউইয়র্ক টাইমসের এডিটরিয়াল বোর্ড। শনিবার নিউইয়র্ক টাইমসের অনলাইন সংস্করণে এই মত তুলে ধরা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে মার্কিন বাহিনী। পরে ট্রাম্প জানান, মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে মার্কিন জাহাজে করে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আটক মাদুরোর একটি ছবি নিজের ট্রুথ সোশ্যালে পোস্টও করেন ট্রাম্প।
ফ্লোরিডায় এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, মাদুরোর বিচার করা হবে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা ‘চালাবে’ যুক্তরাষ্ট্র।
নিউইয়র্ক টাইমসের এডিটরিয়াল বোর্ড মনে করে, ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের এই হামলা অবৈধ ও অপরিণামদর্শী। এই হামলার ফলে ভেনেজুয়েলার জনগণের কষ্ট বাড়বে, ওই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা বাড়বে এবং বিশ্বজুড়ে মার্কিন স্বার্থের স্থায়ী ক্ষতি হবে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এডিটরিয়াল বোর্ড লিখেছে, গত কয়েক মাস ধরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে ক্যারিবীয় এলাকায় বিশাল সামরিক বাহিনী মোতায়েন করেছেন। এত দিন তিনি ওই বাহিনীকে (বিমানবাহী একটি রণতরী, আরও কমপক্ষে সাতটি যুদ্ধজাহাজ, অসংখ্য বিমান এবং ১৫ হাজার মার্কিন সেনা) ব্যবহার করেছেন মাদক পরিবহন রোধের অজুহাতে ছোট নৌযানে অবৈধ হামলা চালানোর জন্য।
তবে শনিবার, ট্রাম্প তাঁর অভিযানের মাত্রা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করেছেন, যে হামলাকে তিনি ‘বড় আকারের হামলা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কিছু মানুষ মাদুরোর প্রতি সহানুভূতি অনুভব করেন না। তিনি অগণতান্ত্রিক ও দমননীতিতে বিশ্বাসী। তিনি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিম গোলার্ধকে অস্থিতিশীল করে তুলেছেন।
জাতিসংঘ সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে বলেছে, মাদুরোর লোকজন এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তার রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং নির্বিচার গ্রেপ্তার চালিয়েছে। তিনি ২০২৪ সালে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জালিয়াতি করেছেন। এ ছাড়া তিনি সমগ্র অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছেন।
তবে গত শতাব্দীর আমেরিকান বিদেশনীতির একটি প্রধান শিক্ষা হলো, সবচেয়ে নিন্দনীয় শাসনকেও উৎখাত করার চেষ্টা সেই পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে ২০ বছর ব্যয় করে স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং লিবিয়ায় একনায়ককে উৎখাত করে একটি বিভক্ত রাষ্ট্র তৈরি করেছে। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের দুঃখজনক পরিণতি এখনো আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজ করছে।
সম্ভবত সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হলো, যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে সরকার উৎখাতের চেষ্টা করে অস্থিতিশীল করেছে। যেমন: চিলি, কিউবা, গুয়াতেমালা ও নিকারাগুয়া।
এডিটরিয়াল বোর্ড লিখেছে, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনো ভেনেজুয়েলায় তাঁর কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো সংগতিপূর্ণ ব্যাখ্যা দেননি। তিনি আমাদের দেশকে বৈধ কারণ ছাড়াই একটি আন্তর্জাতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। যদি ট্রাম্প এর বিপরীতে যুক্তি দিতে চান, সংবিধান স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে তাঁকে কী করতে হবে: কংগ্রেসের কাছে যেতে হবে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া, তার এই কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের আইন লঙ্ঘন করে।’
মার্কিন প্রশাসনের এই সামরিক অভিযানকে আড়াল করার একটা নামমাত্র যুক্তি হলো ‘মাদক-সন্ত্রাসীদের’ ধ্বংস করা। ইতিহাস জুড়ে বিভিন্ন সরকার প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের নেতাদের সন্ত্রাসবাদী আখ্যা দিয়ে সামরিক অভিযানকে বৈধ দেখানোর চেষ্টা করেছে।
ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে দাবি বিশেষভাবে হাস্যকর। কারণ, ভেনেজুয়েলা ফেন্টানাইল বা অন্য এমন কোনো মাদক উৎপাদনকারী দেশ নয় যা সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে মহামারির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া ভেনেজুয়েলা যা কোকেন উৎপাদন করে, তা মূলত ইউরোপে যায়।
ভেনেজুয়েলার ওপর হামলার আরও যৌক্তিক ব্যাখ্যা সম্ভবত ট্রাম্পের সম্প্রতি প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল থেকে পাওয়া যায়। সেখানে লাতিন আমেরিকার ওপর আধিপত্য স্থাপনের অধিকার দাবি করা হয়েছে এভাবে, ‘কয়েক বছর ধরে অবহেলার পর, যুক্তরাষ্ট্র মনরো নীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও কার্যকর করে পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার প্রাধান্য পুনরুদ্ধার করবে।’
ভেনেজুয়েলা স্পষ্টতই সাম্প্রতিককালের এই সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্যের প্রথম দেশ হয়ে উঠেছে এবং এটি বিশ্বের ক্ষেত্রে আমেরিকার অবস্থান নিয়ে একটি বিপজ্জনক ও অবৈধ দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করে।
কোনো আন্তর্জাতিক বৈধতা, বৈধ আইনি ক্ষমতা বা অভ্যন্তরীণ সমর্থন ছাড়া এগোতে গিয়ে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীন, রাশিয়া এবং অন্যান্য দেশে নিজেদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করতে চাওয়া স্বৈরশাসকদের জন্য ন্যায্যতার অজুহাত তৈরি করার ঝুঁকি নিচ্ছেন।
প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে ট্রাম্প যুদ্ধ সম্প্রসারণের সমস্যাগুলো স্বীকার করেছিলেন বলে মনে হতো। ২০১৬ সালে তিনি একমাত্র রিপাবলিকান রাজনীতিবিদ ছিলেন, যিনি প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ইরাক যুদ্ধকে বোকামি উল্লেখ করেছিলেন। ২০২৪ সালে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কোনো যুদ্ধ শুরু করব না। আমি যুদ্ধ থামাব।’
তিনি এখন এই নীতি ত্যাগ করছেন এবং তা করছেন অবৈধভাবে। সংবিধান অনুযায়ী, যেকোনো যুদ্ধের কাজের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। হ্যাঁ, প্রেসিডেন্টরা প্রায়ই এই আইনের সীমা পরীক্ষা করেন। তবে প্রেসিডেন্ট বুশও ইরাক আক্রমণের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন নিয়েছিলেন এবং বুশের পরবর্তী প্রেসিডেন্টরা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও তাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে ড্রোন হামলার বৈধতা দিতে ২০০১ সালের সেই আইনের আওতায় যুক্তি দেখিয়েছেন, যা ৯/১১ হামলার পরে কার্যকর হয়েছিল।
ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলায় হামলার জন্য কোনো বৈধ আইনি অনুমোদনের ছায়াও নেই।
সংসদীয় বিতর্ক সামরিক অভিযানের ওপর গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক ভূমিকা রাখে। এগুলো প্রেসিডেন্টকে তাঁর হামলার পরিকল্পনা জনগণের সামনে বৈধতা প্রমাণ করতে বাধ্য করে এবং কংগ্রেসের সদস্যদের তাদের নিজস্ব বিশ্বাসযোগ্যতাকে সেই পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত করতে হয়।
ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে, কংগ্রেসের বিতর্ক ট্রাম্পের যুক্তির দুর্বলতা প্রকাশ করে দিত। তাঁর প্রশাসন ছোট নৌকাগুলোর ওপর হামলা যৌক্তিক করার জন্য দাবি করেছে, এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি সৃষ্টি করছে।
কিন্তু বিভিন্ন আইনি ও সামরিক বিশেষজ্ঞ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। সাধারণ যুক্তিতেও এগুলো টেকে না।
ভেনেজুয়েলায় বিশৃঙ্খলার সম্ভাবনা অনেক বেশি মনে হচ্ছে। মাদুরোর আটক হওয়ার পরও যারা তাঁর শাসন ব্যবস্থা চালু রাখতে সাহায্য করেছে— এমন জেনারেলরা হঠাৎ করে অদৃশ্য হবে না।
সব মিলে ভেনেজুয়েলায় আরও অস্থিরতা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য বাজারকে অস্থির করতে পারে এবং গোটা গোলার্ধ জুড়ে আরও বেশি অভিবাসী সৃষ্টি করতে পারে।
তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ভেনেজুয়েলার সেই চলমান সমস্যার মোকাবিলা করবে? যা অঞ্চলের এবং আমেরিকার স্বার্থে হুমকি তৈরি করছে?
কোনো সহজ উত্তর নেই। এ পর্যায়ে, বিশ্বের উচিত হবে শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের ঝুঁকি সম্পর্কে বোঝা।
নিউইয়র্ক টাইমসের এডিটরিয়াল বোর্ড লিখেছে, ‘আমরা আশঙ্কা করি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দুঃসাহসী অভিযানের ফল হবে ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য বেশি কষ্ট, ওই অঞ্চলে বাড়তি অস্থিতিশীলতা এবং বিশ্বের নানা স্থানে আমেরিকার স্বার্থের স্থায়ী ক্ষতি।’