ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ধরনের ঘটনা সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। এর আগে সর্বশেষ ১৯৮৯ সালে লাতিন আমেরিকার আরেক দেশ পানামার নেতা ম্যানুয়েল আন্তনিও নরিয়েগাকে প্রায় একইভাবে ধরে নিয়ে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা।
হামলা চালিয়ে ভেনেজুয়েলার মতো কোনো সার্বভৌম দেশের শীর্ষ নেতা এবং তাঁর স্ত্রীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের যতটুকু বজায় ছিল, তা-ও শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
কাতারের রাজধানী দোহার হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি নীতি বিভাগের অধ্যাপক সুলতান বারাকাত আল–জাজিরাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র জোর করে শাসনব্যবস্থাকে (রেজিম) পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। এ ধরনের চেষ্টা সাধারণত ভালো ফল বয়ে আনে না।’
বারাকাত বলেন, ‘এর আগেও ইরাকসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে অনেকবার শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা করতে দেখেছি। যেসব দেশে এমন চেষ্টা হয়েছে, সেখানে বছরের পর বছর ধরে বিশৃঙ্খলা চলেছে। আজও চলছে।’
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘ইরান নিয়েও আমরা এমন কিছু চেষ্টা দেখছি। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে গত দুই দিনে ইরান ও ভেনেজুয়েলাকে জড়িয়ে বক্তৃতা দিতে দেখা গেছে। এ দুই দেশের মধ্যে কিছু মিল অবশ্য আছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ভেনেজুয়েলা ইরানের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে। আর এ কারণে দেশটির প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করাকে ন্যায্যতা দেওয়া যাবে।’
বারাকাত সতর্ক করে বলেন, ভেনেজুয়েলার হামলা নিয়ে ‘সার্বিকভাবে আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। আশা করি, ভেনেজুয়েলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে। তা না হলে আমরা সেই অঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা দেখব।’
আন্তর্জাতিক আইনের কফিনে শেষ পেরেক
আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি যতটুকু সম্মান বজায় ছিল, মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তা–ও শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করেন সুলতান বারাকাত। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এ ঘটনা থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশও একই ধরনের কাজ করতে উৎসাহিত হতে পারে।
বারাকাতের ভাষায়, এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তির কফিনে সম্ভবত সর্বশেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের মূল নীতি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
কাতারের সরকারি নীতি বিভাগের এ অধ্যাপক আরও বলেন, লেবানন ও ইরানে সম্প্রতি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চালানো যৌথ হামলার সঙ্গে ভেনেজুয়েলার ঘটনার মিল রয়েছে। এসব হামলা প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
বারাকাতের আশঙ্কা, এখন চীনও যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ অনুসরণ করতে পারে। তাইওয়ানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের ন্যায্যতা দাবি করতে পারবে।
ভেনেজুয়েলার সামনে কী
ভেনেজুয়েলায় এখন ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কোনো আগাম আলোচনা বা সমঝোতা ছাড়া মাদুরোর অনুগত সামরিক বাহিনী ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেবে, এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা কম। শনিবারের এই নাটকীয় পরিস্থিতির পর সামরিক বাহিনী থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসেনি।
তবে ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ বলেছেন, কোনোভাবেই তিনি তাঁর দেশে বিদেশি সেনা সহ্য করবেন না, ঐক্যবদ্ধভাবে এই হামলা প্রতিরোধ করবেন।
ভেনেজুয়েলার সংবিধান অনুযায়ী, ক্ষমতা নিকোলা মাদুরোর সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের হাতে যাওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি পুরোপুরি অনিশ্চিত ও অজানা পথে মোড় নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত কার হাতে ক্ষমতা যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে বিরোধী নেত্রী শান্তিতে নোবেলজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো নিজেকে পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থনপুষ্ট বিকল্প নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে মাদুরোর রাজনৈতিক বিরোধীদের একটি বড় অংশ আবার ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী।
ভেনেজুয়েলার প্রয়াত বামপন্থী নেতা হুগো চাভেজের আদর্শে ও নামে গঠিত ‘চাভেজমো’ আন্দোলনের প্রতি দেশের সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশের সমর্থন রয়েছে। মাদুরো এই আন্দোলনের অন্যতম নেতা।
এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, দেশটি ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ বা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে যেতে পারে।