এল নিনো জলবায়ুতে কী প্রভাব ফেলতে পারে, মানুষের জীবন কতটা দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে

এল নিনোর কারণে সৃষ্ট খরায় জিম্বাবুয়ের মুদজি এলাকায় একটি বাঁধের মাটি শুকিয়ে ফেটে গেছে। ২ জুলাই, ২০২৪ছবি: রয়টার্স

দ্রুত তীব্রতর হতে থাকা এল নিনো আগামী কয়েক মাসে বৈশ্বিক আবহাওয়ার ধরনকে প্রভাবিত করবে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। গতকাল শুক্রবার বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে।

গতকাল জাতিসংঘের এ সংস্থার সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে বলা হয়েছে, এল নিনোর কারণে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ, খরা ও বন্যার ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।

এল নিনো হলো, জলবায়ুর এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণায়ন ঘটে।

আরও পড়ুন

এমন সময় ডব্লিউএমওর প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলো, যখন আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভয়াবহ দাবানলের সঙ্গে লড়ছে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় মৌসুমি বৃষ্টিতে ব্যাপক দুর্যোগ দেখা দিয়েছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘এল নিনো আর শুধু আমাদের দোরগোড়ায় নেই, এটি ইতিমধ্যে ঘরে ঢুকে পড়েছে এবং তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটি শুধু শুরু। এল নিনো আরও শক্তিশালী হচ্ছে এবং আগেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠা পৃথিবীকে আরও উত্তপ্ত করে দিচ্ছে।’

এল নিনো আর শুধু আমাদের দোরগোড়ায় নেই, এটি ইতিমধ্যে ঘরে ঢুকে পড়েছে এবং তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটি শুধু শুরু। এল নিনো আরও শক্তিশালী হচ্ছে এবং আগেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠা পৃথিবীকে আরও উত্তপ্ত করে দিচ্ছে।
আন্তোনিও গুতেরেস, জাতিসংঘের মহাসচিব

পূর্বাভাসে বলা হয়, প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৫ দশমিক ২২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠে পানির এ অস্বাভাবিক উষ্ণতা বৈশ্বিক আবহাওয়া ব্যবস্থাকে ব্যাহত করবে এবং বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে তুলবে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নিতে দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন গুতেরেস। এল নিনো ও মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

গুতেরেস বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও সম্প্রসারণই এ সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। তাই নতুন কয়লা, তেল ও গ্যাস প্রকল্প অনুমোদন এবং বাস্তবায়ন অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি।

আরও পড়ুন

ডব্লিউএমওর পূর্বাভাস, বিশ্বের প্রায় সব স্থলভাগেই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করবে। এর মধ্যে আফ্রিকা, দক্ষিণ ইউরোপ, ভারতীয় উপমহাদেশ, পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকায় তীব্র তাপপ্রবাহের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।

সংস্থাটির মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেন, এল নিনোর গতিপ্রকৃতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হলেও শুধু আগাম সতর্কবার্তা যথেষ্ট নয়। ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সরকার ও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোকে সেই সতর্কবার্তার ভিত্তিতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

এল নিনো হলো, জলবায়ুর এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণায়ন ঘটে।

সাউলো বলেন, ‘পূর্বাভাস নিজে কোনো দুর্যোগ ঠেকাতে পারে না; মানুষই পারে। আজ আমরা যে সিদ্ধান্ত নেব, সেটির ওপরই নির্ভর করবে যে আগামীতে আমরা কী ধরনের প্রভাবের মুখোমুখি হব।’

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, চলতি বছর এল নিনো রেকর্ড মাত্রার তীব্রতায় পৌঁছাতে পারে। তবে এ বিষয়ে কম্পিউটারভিত্তিক পূর্বাভাস মডেলগুলোর হিসাব-নিকাশ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুতেরেস চারটি ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রথমত, শহর ও জাতীয় পর্যায়ে তাপপ্রবাহ মোকাবিলার পরিকল্পনা এবং আগাম সতর্কবার্তা চালু করে মানুষকে সুরক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব শীতলীকরণ ব্যবস্থার সুযোগ বাড়াতে হবে।

দ্বিতীয়ত, কর্মক্ষেত্রকে আরও নিরাপদ করতে হবে। এ জন্য সরকারকে তাপমাত্রাজনিত নিরাপত্তা মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে, যেন পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করা কর্মীদের জীবন ঝুঁকিতে না পড়ে।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, চলতি বছর এল নিনো রেকর্ড মাত্রার তীব্রতায় পৌঁছাতে পারে। তবে এ বিষয়ে কম্পিউটারভিত্তিক পূর্বাভাস মডেলগুলোর হিসাব-নিকাশ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

তৃতীয়ত, শহর, বাড়িঘর, স্কুল ও হাসপাতালের নকশা করার ক্ষেত্রে তীব্র তাপপ্রবাহের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়নেও এ ঝুঁকিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

চতুর্থত ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ‘বিশ্বকে এ সংকট আরও উসকে দেওয়া বন্ধ করতে হবে।’ জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, প্রতিটি দুর্যোগকে আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখার পরিবর্তে পৃথিবীর উষ্ণায়নের মূল চালিকা শক্তি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে।