দোকানির মেয়ে কীভাবে দুনিয়াজুড়ে ‘লৌহমানবী’ হয়ে উঠলেন, ১১ বছর শাসন করলেন যুক্তরাজ্য

মার্গারেট থ্যাচার—যুক্তরাজ্যের প্রথম নারী সরকারপ্রধান। এক দশকের বেশি ক্ষমতায় ছিলেন। সংস্কার করেছেন, শক্ত হাতে সরকার ও দেশ সামলেছেন। যুদ্ধেও জড়িয়েছেন। দৃঢ়চেতা এ নারী পরিচিতি পেয়েছেন ‘লৌহমানবী’ নামে। আজ ১৩ অক্টোবর মার্গারেট থ্যাচারের জন্মদিন। এ উপলক্ষে আজকের আয়োজন।

যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারফাইল ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাজ্যের গণতন্ত্রের ভিত্তি বেশ পোক্ত। তবে বলা হয়, দেশটিতে সরকার টেকে না। পরিসংখ্যানও কিন্তু সেটাই বলে। ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যে ব্রেক্সিট গণভোট হয়েছিল। অর্থাৎ গণভোটে সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাজ্যবাসী ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে আসে। এরপর মাত্র এক দশকে দেশটিতে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতার চেয়ারে এসেছেন–গেছেন।

গত শতকে চিত্রটা ভিন্ন রকমের ছিল। সময়টা ১৯৭৯ সাল। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা মার্গারেট থ্যাচার। তিনি সরকারপ্রধানের পদে ছিলেন টানা ১১ বছর, ১৯৯০ সাল পর্যন্ত; পরপর তিন মেয়াদে। যুক্তরাজ্যের ১৫০ বছরের বেশি সময়ের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় সরকারপ্রধান থাকার রেকর্ড থ্যাচারের দখলে।

রাজনীতির মাঠে মার্গারেট থ্যাচার এমন একটি নাম, যাঁকে সহজে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। দেশটির রাজনীতি বরাবরই পুরুষ নিয়ন্ত্রিত। সেই ধারা ভেঙে দিয়েছেন থ্যাচার। যুক্তরাজ্যের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী তিনি। এক দশকের বেশি সময়ের দৃঢ়চেতা ও অনমনীয় শাসনের জন্য থ্যাচার ‘আয়রন লেডি’ বা ‘লৌহমানবী’ নামে পরিচিতি পেয়েছিলেন। এখনো এ নামেই মানুষ তাঁকে চেনে।

মার্গারেট থ্যাচারের কঠোর নীতি যেমন প্রশংসা পেয়েছে, তেমনি তৈরি করেছে গভীর বিতর্ক। যদিও তাঁর অর্থনৈতিক সংস্কার বদলে দিয়েছিল যুক্তরাজ্যের রাজনীতি ও সমাজ। কেউ থ্যাচারকে দেখেন একজন সাহসী সংস্কারক হিসেবে। কারও চোখে তিনি কঠোর ও বিভাজন সৃষ্টিকারী একজন রাষ্ট্রনেতা।

থ্যাচারের সমর্থকেরা মনে করেন, তিনি যুক্তরাজ্যকে অর্থনৈতিক স্থবিরতা থেকে বের করে এনেছিলেন। সমালোচকদের মতে, তাঁর নীতিতে শিল্পাঞ্চলের বহু মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। ফকল্যান্ড দ্বীপ ঘিরে আর্জেন্টিনার সঙ্গে যুদ্ধে জড়ান তিনি। সব মিলে ভীষণ চাপের মুখে শক্ত হাতে ১১ বছর দেশ চালাতে হয়েছে থ্যাচারকে।

মার্গারেট থ্যাচার
ফাইল ছবি: এএফপি

সরকারপ্রধান হিসেবে মার্গারেট থ্যাচারের নীতির ভিত্তি এতটাই গভীর ছিল যে তিনি বিদায় নিলেও এসব নীতির প্রভাব রয়ে যায় দীর্ঘদিন। শুরুতে বলেছিলাম, যুক্তরাজ্যে গত এক দশকে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী পদ ছেড়েছেন। তাঁদের একজন লিজ ট্রাস। তিনি ২০২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেন। কিন্তু তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব স্থায়ী হয় মাত্র ৪৯ দিন। ট্রাস ২০২২ সালের ২৫ অক্টোবর পদত্যাগ করেন।

মজার বিষয় হলো, লিজ ট্রাস আশির দশকে মার্গারেট থ্যাচারের নীতির বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন করেছিলেন। কিন্তু রাজনীতির ময়দানে স্থায়ী বলে কিছু নেই—কথাটি প্রমাণ করতেই তিনি একসময় নিজেকে থ্যাচারের আদর্শের মশালের একজন ধারক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। এখানেই থ্যাচারের অন্যতম সফলতা।

১৯৭৯ সালের ৩ মে যুক্তরাজ্যে সাধারণ নির্বাচন হয়। জয়ী হয় কনজারভেটিভ পার্টি। নতুন ইতিহাস লিখেন মার্গারেট থ্যাচার। পরদিন, ৪ মে যুক্তরাজ্যের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি। ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে দাঁড়িয়ে জনগণের উদ্দেশে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

দোকানির মেয়ের অভাব দেখা

মার্গারেট থ্যাচারের আসল নাম ‘মার্গারেট হিলডা রবার্টস’। জন্ম ১৯২৫ সালের ১৩ অক্টোবর, ইংল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলের ছোট এক শহর গ্রান্থামে। বাবা ও মা একটি মুদিদোকান চালাতেন। দোকানের ওপরই পরিবার নিয়ে থাকতেন। ছোট মার্গারেট মাঝেমধ্যে দোকানের কাউন্টারে বাবা–মাকে সাহায্য করতেন। মার্গারেটের বড় এক বোন ছিলেন। নাম মুরিয়েল।

ওই সময়টায় যুক্তরাজ্যের গ্রাম ও শহরগুলো সবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধকল সামলে উঠছে। মার্গারেট বড় হতে হতে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কায় ভুগতে শুরু করে ইউরোপসহ বিশ্ব। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৯৩৯ সালে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তখন মার্গারেটের বয়স ১৪ বছর। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতে হতে তিনি ২০ বছরের তরুণী।

দু–দুটি বিশ্বযুদ্ধের ধকল সামলানো যুক্তরাজ্যে তখন চাকরির সংকট। চারপাশে অভাবী মানুষ অনেক। মার্গারেট শৈশবে বেশ অভাব দেখেছেন। তাঁদের ঘরে টিভি পর্যন্ত ছিল না। বাবা একটি রেডিও কিনেছিলেন। পরিবারের সবাই মিলে সেটা শুনতেন। স্কুল থেকে ফিরে ঘরে প্রথম রেডিও দেখতে পাওয়ার রোমাঞ্চকর সেই স্মৃতির কথা বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে মার্গারেট নিজেই বলেছেন।

ছোটবেলায় হেঁটে কয়েক মাইল দূরের সরকারি স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করেছেন মার্গারেট। ১৮ বছর বয়সে তিনি ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে। বিষয় রসায়ন। এ বিষয়ে পড়াশোনা করতে ভালোবাসতেন। ছোট থেকে রাজনীতিতে আগ্রহ ছিল। বাবার কাছ থেকে রাজনীতি, দায়িত্ববোধ আর আত্মনির্ভরতার শিক্ষা পেয়েছিলেন।

কনজারভেটিভ পার্টির সম্মেলনে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা গ্রহণ করছেন মার্গারেট থ্যাচার। ১৩ অক্টোবর, ১৯৮৯
ছবি: রয়টার্স

শিক্ষাজীবনে রাজনীতির শুরু

অক্সফোর্ডে পড়ার সময় প্রথম প্রথাগত রাজনীতিতে জড়ান মার্গারেট। তিনি ‘স্টুডেন্ট কনজারভেটিভ অ্যাসোসিয়েশন’-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এটা ছোট একটি নির্বাচন ছিল ঠিকই। তবে বক্তব্য দিতে গিয়ে কয়েকজন বিখ্যাত রাজনীতিবিদের সংস্পর্শে এসেছিলেন মার্গারেট। এ পরিচিতি পরবর্তী সময়ে রাজনীতির মাঠে তাঁকে সুবিধা এনে দিয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পেরিয়ে মার্গারেট কেমিস্টের চাকরিতে ঢোকেন। চলে রাজনীতিও। লন্ডনের উপকণ্ঠে কেন্টের ডার্টফোর্ড শহরের সংসদ সদস্য (এমপি) হওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। ১৯৫০ ও ১৯৫১ সালে দুবার নির্বাচনে লড়েও জিততে পারেননি। দেশের সবচেয়ে কম বয়সী নারী প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছিলেন।

ডার্টফোর্ডেই ডেনিস থ্যাচারের সঙ্গে মার্গারেটের পরিচয়। এরপর বিয়ে। তখন থেকে তিনি নামের শেষে ‘থ্যাচার’ পদবি জুড়ে নেন। ১৯৫৩ সালে তাঁদের ঘর আলো করে আসে যমজ সন্তান—মার্ক ও ক্যারল। বিয়ে, সংসার ও সন্তান সামলেও লন্ডনের সিটি ল স্কুলে আইন বিষয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান থ্যাচার।

এরই মধ্যে এমপি নির্বাচন করে পার্লামেন্টে যেতে নতুন একটি এলাকা খুঁজছিলেন থ্যাচার। পেয়েও যান। অবশেষে ১৯৫৯ সালের অক্টোবরে উত্তর লন্ডনের ফিঞ্চলে থেকে কনজারভেটিভ পার্টির এমপি নির্বাচিত হন তিনি। নানা চড়াই–উতরাই পেরিয়ে পার্লামেন্টে পা পড়ে তাঁর।

স্নায়ুযুদ্ধের রাশ টানতেও থ্যাচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আশির দশকের শুরুর দিকে রোনাল্ড রিগ্যানের কঠোর প্রতিরক্ষা নীতিকে সমর্থন জানিয়ে তিনি সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা জোটকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করেন। পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে মিখাইল গর্বাচেভের উত্থান ঘটলে তিনি এ সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ প্রশস্ত করতেও ভূমিকা রাখেন।
আরও পড়ুন

পার্লামেন্ট, মন্ত্রিসভা, বিরোধী দলে

এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর যুক্তরাজ্যে বেশ কিছু আইন প্রণয়নে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন থ্যাচার। পার্লামেন্টে প্রবেশের ঠিক ১১ বছর পর তিনি মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নেন। তখন ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ। তাঁর সরকারে থ্যাচারকে শিক্ষামন্ত্রী করা হয়। যুক্তরাজ্যের স্কুল–কলেজের উন্নয়নে বিশেষ দায়িত্ব পান তিনি।

শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে প্রথম বছরে একটি অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল থ্যাচারকে। তিনি স্কুলমিল থেকে বয়সে বড় শিক্ষার্থীদের জন্য দুধের বরাদ্দ বাতিল করেন। বিনা মূল্যের এ সুবিধা বাতিল হওয়ায় লোকজন খেপে যায়। থ্যাচারের জনপ্রিয়তায় ধস নামে। ওই সময়টায় প্রধানমন্ত্রী হিথের সরকারও গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। চার বছরের মাথায় ১৯৭৪ সালের নির্বাচনে সরকারের শোচনীয় পরাজয় হয়।

এবার পার্লামেন্টে বিরোধী দলের আসনে থ্যাচারের দল। ১৯৭৫ সালে কনজারভেটিভ পার্টির সংসদ সদস্যরা দলীয় প্রধানের পদে থ্যাচারকে নির্বাচিত করেন। এ ঘটনা ওই সময় যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে শোরগোল ফেলে দিয়েছিল। কেননা ধস নামা জনপ্রিয়তা পেরিয়ে তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হয়েছিলেন। তা–ও নারী হিসেবে দেশটিতে প্রথম।

থ্যাচার বছর চারেক বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। তখনকার লেবার পার্টির সরকারও ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করছিল। ফলে জনপ্রিয়তা হারায়। এর প্রভাব পড়ে ১৯৭৯ সালের মে মাসের সাধারণ নির্বাচনে।

স্বামী ডেনিস থ্যাচারের সঙ্গে মার্গারেট থ্যাচার। ১১ অক্টোবর ১৯৮৫
ছবি: রয়টার্স

নতুন ইতিহাস লেখা

১৯৭৯ সালের ৩ মে যুক্তরাজ্যে সাধারণ নির্বাচন হয়। জয়ী হয় কনজারভেটিভ পার্টি। নতুন ইতিহাস লেখেন মার্গারেট থ্যাচার। পরদিন, ৪ মে যুক্তরাজ্যের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি। ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে দাঁড়িয়ে জনগণের উদ্দেশে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

আগের কয়েকজন সরকারপ্রধানের মতো থ্যাচারকেও চরম অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে হয়েছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানোর মতো অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নেন তিনি। অনেকে চাকরি হারান। শুরুতে এ নীতি ব্যাপক সমালোচিত হয়। ব্যাপক প্রতিবাদ আর সমালোচনা হয়।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলায়। দ্রব্যমূল্যে ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানা গেলে মানুষের ক্ষোভ কমে আসে। অর্থনীতি নতুন উদ্যম পায়। ধীরে ধীরে থ্যাচারের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ঠিক তখনই তাঁকে যুদ্ধে জড়াতে হয়। লাতিন উপকূলের যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রিত ফকল্যান্ড দ্বীপে আর্জেন্টিনা সেনা অভিযান চালালে যুদ্ধে জড়ায় যুক্তরাজ্য। ১৯৮২ সালের এপ্রিলে যুদ্ধের শুরু। জুনের মধ্যে দ্বীপটি আবার যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণে আসে।

বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, ফকল্যান্ড যুদ্ধে থ্যাচারের অভাবনীয় সাফল্য যুক্তরাজ্যের ভোটারদের মুগ্ধ করে। যুদ্ধের সময়ে দৃঢ়চেতা মনোভাব তাঁকে ‘লৌহমানবী’ নামে পরিচিত করে তোলে। থ্যাচার পরের বছরের (১৯৮৩ সাল) জুনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে অনায়াসে জয় ছিনিয়ে নেন। সরকার গঠন করে কনজারভেটিভরা। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন থ্যাচার।

আরও পড়ুন

ব্যর্থ হয় হত্যাচেষ্টা

প্রধানমন্ত্রী থ্যাচারের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুটা সাবলীল ছিল না। মোকাবিলা করতে হয় শ্রমিক আন্দোলন। খনিশ্রমিকদের ইউনিয়নের ডাকা ধর্মঘট ১৯৮৪–৮৫ সালজুড়ে চলেছিল। সেই আন্দোলন দমান থ্যাচার। তবে সৃষ্টি হওয়া তিক্ততা তাঁকে দীর্ঘদিন ভুগিয়েছিল। ওই সময়ে বিরোধী লেবার পার্টির অনেক সংসদ সদস্য মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন, থ্যাচারের সংস্কার কার্যক্রম ঠেকানো সম্ভব নয়। এমনকি সেগুলো উল্টে দেওয়াও যাবে না।

মার্গারেট থ্যাচার
ফাইল ছবি: এএফপি

১৯৮৪ সালের অক্টোবর, তখনো শ্রমিক ধর্মঘট চলছে। ব্রিংটনের একটি হোটেলে কনজারভেটিভ পার্টির বার্ষিক সম্মেলন চলছিল। ওই আয়োজনে বোমা হামলা চালিয়ে থ্যাচারসহ তাঁর কয়েকজন সহকর্মীকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি (আইআরএ)।

ওই হামলায় কপালগুণে বেঁচে যান থ্যাচার। তবে তাঁর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহকর্মী হতাহত হয়েছিলেন। থ্যাচার হোটেলের যেই কক্ষে ছিলেন, তার ঠিক পাশের কক্ষটি হামলায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

যুক্তরাজ্যে থ্যাচারের পরবর্তী সরকারগুলো বাজার ও অর্থনীতি নিয়ে তাঁর নীতিগুলো ছুড়ে ফেলতে পারেনি। এমনকি টনি ব্লেয়ারের লেবার পার্টির সরকারও থ্যাচারের অনেক নীতি এগিয়ে নিয়েছিল। তাই বলা যায়, থ্যাচারের প্রভাব শুধু নিজ দল আর নিজ সরকারে সীমিত ছিল না।

সরকার ও কনজারভেটিভ পার্টির অনেকেই থ্যাচারের নেতৃত্ব ও সংস্কারনীতি নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্য ছিলেন না। তাঁদেরই একজন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইকেল হেসেলটাইন। ‘ওয়েস্টল্যান্ড’ নামক ব্রিটিশ হেলিকপ্টার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নিয়ে মতবিরোধের জেরে হঠাৎ সরকার থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। সংকটে পড়ে যায় থ্যাচারের সরকার। তবে ওই সংকটও সামলে নেন প্রধানমন্ত্রী।

এ ঘটনা থ্যাচারের সরকারকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। দৃঢ়চেতা নেত্রীর ‘ক্লান্ত হয়ে পড়া’ এবং দীর্ঘ সময় ধরে টানা ক্ষমতায় থাকার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা–সমালোচনা শুরু হয়। থ্যাচার তাঁর দৃঢ়চেতা ভঙ্গিতে সমালোচকদের জবাব দেন—নির্বাচনে জিতে টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। অর্থনীতি আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠায় তাঁর জয়ের সম্ভাবনাও বেশি ছিল।

তত দিনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন থ্যাচার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে। স্নায়ুযুদ্ধ চলার ওই সময়টায় সোভিয়েত ইউনিয়নের একজন ঘোর সমালোচক হিসেবেও নিজের ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিলেন থ্যাচার।

আরও পড়ুন

তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী

১৯৮৭ সালে তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন থ্যাচার। যুক্তরাজ্যের শিক্ষা, স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যাপক সংস্কার করা হয়। প্রতিটিই ছিল তুমুল বিতর্কিত। তবে এ মেয়াদে সরকার আর দলের ঘনিষ্ঠজনদের বিরোধিতা সামলাতে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে।

যুক্তরাজ্য ১৯৭৩ সালে ইউরোপীয় কমিউনিটিতে (ইসি) যোগ দিয়েছিল। কিন্তু থ্যাচার ক্রমেই ইসির প্রতি সমালোচনামুখর হয়ে ওঠেন। থ্যাচার ১৯৮৮ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রুজেসে দেওয়া এক ভাষণে এমন সব কথা বলেন, সেটা তাঁর দলকে ‘ইউরোপ নিয়ে সংশয়বাদী’ মনোভাবাপন্ন হিসেবে পরিচিত করে তোলে।

স্নায়ুযুদ্ধের রাশ টানতেও থ্যাচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আশির দশকের শুরুর দিকে রোনাল্ড রিগ্যানের কঠোর প্রতিরক্ষানীতিকে সমর্থন জানিয়ে তিনি সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা জোটকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করেন। পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে মিখাইল গর্বাচেভের উত্থান ঘটলে তিনি এ সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ প্রশস্ত করতেও ভূমিকা রাখেন।

আরও পড়ুন
মৃত্যুর খবরে লন্ডনে মার্গারেট থ্যাচারের ছবির সামনে ফুলেল শ্রদ্ধা। ৮ এপ্রিল ২০১৩
ছবি: রয়টার্স

ক্ষমতার শীর্ষ থেকে বিদায়

পরপর তিন নির্বাচনে জয়ী হয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত বিদায় নিতে হয় থ্যাচারকে। এর বড় কারণ ছিল নিজের দলের ভেতরের বিরোধিতা।

ইউরোপীয় একত্রীকরণ নিয়ে থ্যাচারের মনোভাব রক্ষণশীলদের অনেককে ক্ষুব্ধ করেছিল। বিশেষত স্থানীয় সরকার পরিচালনায় চালু করা ‘পোল ট্যাক্স’ ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। বিক্ষোভও হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দলের নেতারা ভাবছিলেন, চতুর্থ দফায় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লড়াইয়ে থ্যাচার সফল হতে পারবেন না।

দলের ভেতর সমর্থন কমতে থাকায় ১৯৯০ সালের নভেম্বরে দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের লড়াইয়ে দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানান থ্যাচার। ১৯৯০ সালের ২৮ নভেম্বর তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর জন মেজর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন।

আরও পড়ুন

থ্যাচারের প্রভাব কতটা

মার্গারেট থ্যাচারের শাসনামল মূল্যায়ন করতে গেলে, শুধু তাঁর ইতিহাস গড়ে তিন মেয়াদে ক্ষমতা আসার কথা বললে চলবে না। বরং দেখতে হবে, তিনি যুক্তরাজ্যের রাজনীতি নিয়ে মানুষের চিন্তাভাবনা কতটা বদলাতে পেরেছেন।

যুক্তরাজ্যে থ্যাচারের পরবর্তী সরকারগুলো বাজার ও অর্থনীতি নিয়ে তাঁর নীতিগুলো ছুড়ে ফেলতে পারেনি। এমনকি টনি ব্লেয়ারের লেবার পার্টির সরকারও থ্যাচারের অনেক নীতি এগিয়ে নিয়েছিল। তাই বলা যায়, থ্যাচারের প্রভাব শুধু নিজ দল আর নিজ সরকারে সীমিত ছিল না।

মস্কো সফরে মার্গারেট থ্যাচার
ফাইল ছবি: এএফপি

তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে ব্যক্তিগত সম্পদ গঠনের সুযোগ চালু করা, শিল্প খাতে কর্মসংস্থান হারানো মানুষের দুর্দশা এবং সমাজে বৈষম্যের প্রশ্ন উপেক্ষা করার বিষয়ে থ্যাচারের ভূমিকা উপেক্ষা করা যায় না।

জীবনসায়াহ্নে এসে

শেষজীবনে রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন মার্গারেট থ্যাচার। দুটি স্মৃতিকথা লিখেছেন। বিক্রিও হয়েছে বেশ। একটির নাম ‘দ্য ডাউনিং স্ট্রিট ইয়ার্স’। এটা ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়। অন্যটি ‘দ্য পাথ টু পাওয়ার’। এটা প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালে।

যুক্তরাজ্যে ১৯৯২ সালে মার্গারেট থ্যাচারকে রাজকীয় ব্যারোনেস খেতাব দেওয়া হয়।

২০০৩ সালের জুনে স্বামী ডেনিস থ্যাচারকে হারান মার্গারেট থ্যাচার। বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা দিয়ে সময় কাটছিল তাঁর। বয়স হওয়ায় নানা অসুখ বেঁধেছিল শরীরে।

২০১৩ সালের ৮ এপ্রিল লন্ডনে মারা যান মার্গারেট থ্যাচার। বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। সেন্ট পল’স ক্যাথেড্রালে তাঁকে সমাহিত করা হয়। রানি এলিজাবেথসহ দেশ–বিদেশের বহু রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং গণ্যমান্য ব্যক্তি তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিয়েছিলেন।

কঠোর রাজনৈতিক মনোভাবের পাশাপাশি নিজের অনন্য স্টাইলের জন্যও খ্যাতি ছিল মার্গারেট থ্যাচারের। বিশেষ করে চুলের স্টাইল নিয়ে। আকর্ষণীয় কেশরাজির জন্যও যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন তিনি। ব্রিটিশ ন্যাশনাল আর্কাইভ থ্যাচারের ১৯৮৪ সালের সাক্ষাৎসূচি প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা গেছে, ওই বছর থ্যাচার ১১৮ বার চুল ছাঁটেন। গড়ে প্রায় প্রতি তিন দিনে একবার!

তথ্যসূত্র: বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স, ব্রিটানিকা, মার্গারেট থ্যাচার ফাউন্ডেশন, গভডটইউকে এবং মার্গারেট থ্যাচার সেন্টারের ওয়েবসাইট।

অনিন্দ্য সাইমুম: প্রথম আলোর সহসম্পাদক

ইমেইল: [email protected]

আরও পড়ুন