ঐতিহাসিক মুহূর্তের অপেক্ষায় আর্টেমিসের নভোচারীরা, শেষ সময়ে কী করছেন

নাসার সরাসরি সম্প্রচারিত এক ভিডিও থেকে নেওয়া স্ক্রিন শটে আর্টেমিসের চার নভোচারীকে দেখা যাচ্ছেছবি: এএফপি

আর্টেমিস–২–এর নভোচারীরা চাঁদের চারপাশে প্রদক্ষিণের জন্য শেষ সময়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চাঁদের পিঠের বৈশিষ্ট্যগুলো পর্যালোচনা করা এবং চাঁদের চারপাশে ঘোরার সময় ছবি তোলাসহ বিভিন্ন কাজের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা।

নাসার তথ্য অনুযায়ী, শনিবার গ্রিনিচ মান সময় বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটের দিকে ওই নভোচারীরা পৃথিবী থেকে প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার মাইল (২ লাখ ৭১ হাজার ৯৭৯ কিলোমিটার) দূরে ছিলেন। আর চাঁদ থেকে তাঁদের দূরত্ব ছিল প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার ৭০০ মাইল (১ লাখ ৭৮ হাজার ১৫৪ কিলোমিটার)।

প্রায় ১০ দিনের এই যাত্রার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে রোববার রাত থেকে সোমবারের মধ্যে। তখন মহাকাশচারীরা ‘চাঁদের প্রভাব বলয়ে’ প্রবেশ করবেন। এ সময় চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি মহাকাশযানকে পৃথিবীর তুলনায় বেশি টানে।

সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ওরিয়ন মহাকাশযানটি চাঁদের চারপাশে ঘোরার সময় মহাকাশচারীরা এমন দূরত্বে পৌঁছাতে পারেন, যেখানে কোনো মানুষ আগে কখনো পৌঁছায়নি।

মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা বলেছে, শনিবার মহাকাশচারীরা তাঁদের দিন শুরু করেছেন নাশতার মাধ্যমে। এর মধ্যে ছিল স্ক্র্যাম্বলড এগ (ডিম দিয়ে তৈরি একধরনের নাশতা) এবং কফি। চ্যাপেল রোনের জনপ্রিয় গান ‘পিঙ্ক পনি ক্লাব’-এর সুরে তাঁরা ঘুম থেকে উঠেছেন।

মহাকাশযানের কমান্ডার রিড উইজম্যান হিউস্টনে অবস্থিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রকে বলেছেন, ‘মহাকাশযানে নভোচারীদের মনোবল দৃঢ়’ আছে।

রিড উইজম্যান দুই মেয়ের বাবা। মহাকাশ থেকে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে পেরে তিনি নিজেও উচ্ছ্বসিত ছিলেন।

মহাকাশযান থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত এক সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়ে উইজম্যান বলেন, ‘আমরা এখানে এতটা দূরে আছি। একমুহূর্তের জন্য আমি আমার ছোট পরিবারটির সঙ্গে আবার মিলিত হলাম। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে দারুণ মুহূর্ত ছিল।’

ওই মহাকাশযানে উইজম্যানের সহযাত্রী হয়েছেন মার্কিন মহাকাশচারী ক্রিস্টিনা কোচ, ভিক্টর গ্লোভার ও কানাডীয় নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন। খুব শিগগির তাঁরা ওরিয়ন মহাকাশযানে করে চাঁদের চারপাশে ঘুরবেন।

এই নভোচারীরা ভূতত্ত্ব বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাঁরা যেন চাঁদের বৈশিষ্ট্য, যেমন প্রাচীন লাভাপ্রবাহ এবং গর্তের ছবি তোলার পাশাপাশি তা বর্ণনা করতে পারেন। তাঁরা চাঁদকে এমন এক বিশেষ স্থান থেকে দেখবেন, যা ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে পরিচালিত অ্যাপোলো মিশনের তুলনায় ভিন্ন।

আর্টেমিস মিশনে অংশ নেওয়া নভোচারীদের তোলা পৃথিবীর ছবি। এপ্রিল ২, ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

অ্যাপোলোর মহাকাশ যানগুলো চাঁদের পিঠ থেকে প্রায় ৭০ মাইল উঁচুতে উড়েছিল। তবে আর্টেমিস–২–এর নভোচারীরা প্রায় ৪ হাজার মাইল ওপর দিয়ে উড়বে। এতে তাঁরা চাঁদের দুই প্রান্তভাগে অবস্থিত এলাকাগুলোসহ পুরো গোলাকার পৃষ্ঠ দেখতে সক্ষম হবেন।

আর্টেমিস–২ মহাকাশচারীরা ইতিমধ্যে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু কিছু জিনিস পর্যবেক্ষণ করছেন। নভোচারী ক্রিস্টিনা কোচ মহাকাশ থেকে সরাসরি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘গত রাতে আমরা চাঁদের অপর পাশ প্রথমবার দেখলাম এবং তা সত্যিই চমকপ্রদ ছিল।’

মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার এসএলএস (স্পেস লঞ্চ সিস্টেম) প্রোগ্রামের ব্যবস্থাপক জন হানিকাট শনিবার এক ব্রিফিংয়ের সময় মহাকাশচারীদের পাঠানো একটি নতুন ছবি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘ছবির সবচেয়ে বাঁ দিকে আপনারা চাঁদের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেখতে পাচ্ছেন, যা গতকাল পর্যন্ত মানুষের চোখে দেখা যায়নি।’ তিনি কথাটি ব্যাখ্যা করে বলেন যে আগে ওই অঞ্চল শুধু রোবোটিক যন্ত্রের মাধ্যমে দেখা যেত।

আর্টেমিস–২–এর নভোচারীরা বিভিন্ন ছবি তোলা নিয়ে ব্যস্ত আছেন। তাঁরা স্মার্টফোন দিয়েও ছবি তুলছেন। এবারই প্রথম নাসা মহাকাশযাত্রায় স্মার্টফোন নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে।

আরও পড়ুন

এর আগে নাসা মহাকাশ যান ওরিয়ন থেকে তোলা পৃথিবীর ছবি প্রকাশ করেছিল। ওই ছবিতে গভীর নীল মহাসাগর এবং মেঘ দেখা গেছে।

তবে মহাকাশযানটিতে শৌচাগার ব্যবস্থার সমস্যা এখনো চলছেই। এমন অবস্থায় কখনো কখনো মহাকাশচারীদের তাঁদের কাছে থাকা ব্যাকআপ ইউরিন ব্যাগ ব্যবহার করতে বলা হচ্ছে।

নাসা বলেছে, মহাকাশে প্রস্রাব ফেলার জন্য মহাকাশযানে একটি পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। সম্ভবত বরফের কারণে জায়গাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এমনটা হয়েছে। এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।

আর্টেমিস–২ মিশন হলো চাঁদে নিয়মিতভাবে ফেরার লক্ষ্যে তৈরি করা একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। এর লক্ষ্য হলো, চাঁদের একটি স্থায়ী বেস স্থাপন করা, যা ভবিষ্যতে আরও অনুসন্ধানের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে।