লিবিয়ার ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে একসময় বিবেচিত কে এই সাইফ আল–ইসলাম
লিবিয়ার প্রয়াত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিলেন সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি। গতকাল মঙ্গলবার দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর জিনতানে গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
৫৩ বছর বয়সী সাইফ আল-ইসলাম ছিলেন গাদ্দাফির দ্বিতীয় ছেলে। ২০১১ সাল থেকে তিনি লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর জিনতানে ছিলেন। শুরুতে কারাবন্দী থাকলেও ২০১৭ সালের পর তিনি মুক্তি পান। সে সময় থেকেই তিনি রাজনীতিতে ফেরার পরিকল্পনা করছিলেন।
সাইফ আল-ইসলামের ঘনিষ্ঠজনদের একজন তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টা আবদুল্লাহ ওসমান এবং তাঁর আইনজীবী খালেদ আল-জাইদি গতকাল তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন।
সাইফের রাজনৈতিক দল থেকেও এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘চারজন মুখোশধারী ব্যক্তি’ জিনতানে সাইফ আল-ইসলামের বাড়িতে ঢুকে তাঁকে হত্যা করেছে।
২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে গণ–অভ্যুত্থানের আগে বহু মানুষের চোখে সাইফ আল-ইসলাম ছিলেন তাঁর বাবার সম্ভাব্য উত্তরসূরি এবং লিবিয়ার দ্বিতীয় সর্বাধিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি।
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ সাইফ আল–ইসলামের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
আরব বসন্তের সময় লিবিয়ায় যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, পরে তা গৃহযুদ্ধের রূপ নেয়। সে সময়ে সাইফ আল-ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে বাবার শাসনের বিরোধীদের ওপর নির্যাতন ও চরম সহিংসতা চালানোর একাধিক অভিযোগ ওঠে।
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ সাইফ আল-ইসলামের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তাঁর ভ্রমণের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
২০১১ সালের মার্চে ন্যাটো লিবিয়ায় বোমাবর্ষণ শুরু করে। ওই বছর জুনে সাইফ আল-ইসলাম ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাঁর বাবা নির্বাচনে যেতে প্রস্তুত এবং নির্বাচনে জিততে না পারলে ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন। তবে ন্যাটো ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে লিবিয়ায় বোমাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছিল।
২০১১ সালের মার্চে ন্যাটো লিবিয়ায় বোমাবর্ষণ শুরু করে। ওই বছর জুনে সাইফ আল-ইসলাম ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাঁর বাবা নির্বাচনে যেতে প্রস্তুত এবং নির্বাচনে জিততে না পারলে ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন। তবে ন্যাটো প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বোমাবর্ষণ অব্যাহত রাখে।
ওই বছর জুনের শেষ নাগাদ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) সাইফ আল-ইসলামের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। সে সময় তিনি পলাতক ছিলেন। ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর সির্তেতে তাঁর বাবা গাদ্দাফি ও ভাই মুতাসসিমকে হত্যা করা হয়।
কারাগারে বন্দী
২০১১ সালের অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে সাইফ আল-ইসলামকে দেশে ফেরানোর দাবি জানানো হয়। তাঁর প্রত্যর্পণের দাবিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর লিবিয়ার কর্মকর্তাদের লিবিয়াতেই তাঁর বিচারের ক্ষমতা দেওয়া হয়।
সে সময় সাইফ আল-ইসলামের পক্ষে থাকা আইনজীবীরা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, লিবিয়ায় তাঁদের মক্কেল ন্যায়বিচার না–ও পেতে পারেন। কারণ, তাঁর বিচার প্রতিশোধপরায়ণতা থেকে পরিচালিত হতে পারে।
জাতিসংঘের হিসাবে, লিবিয়ায় সংঘাতে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার মানুষ নিহত হন। আর লিবিয়ার ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল এই সংখ্যা ৩০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলে জানিয়েছিল।
২০১৪ সালে সাইফ আল-ইসলাম জিনতান কারাগারে থেকে ভিডিও কলের মাধ্যমে ত্রিপোলির আদালতে হাজির হন। শুনানির পর ২০১৫ সালের জুলাই মাসে ত্রিপোলির আদালত তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেন।
তবে ২০১৭ সালে জিনতানের নিয়ন্ত্রণ নেয় আবু বকর আল–সিদ্দিক ব্যাটালিয়ন নামের এক মিলিশিয়া দল। এরপর লিবিয়ার পূর্বাঞ্চল কর্তৃপক্ষের দেওয়া ক্ষমা ঘোষণার অংশ হিসেবে তাঁকে মুক্তি দেয়; যদিও লিবিয়ার এই কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়।
মুক্তির পর কয়েক বছর সাইফ আল–ইসলামকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তিনি আইসিসির ‘ওয়ানটেড’ তালিকায় ছিলেন।
২০২১ সালের জুলাইয়ে সাইফ আল-ইসলাম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে এক বিরল সাক্ষাৎকার দেন। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি অভিযোগ করেছিলেন, লিবিয়া কর্তৃপক্ষ নির্বাচন আয়োজন করতে ‘ভয় পায়’।
আত্মগোপনে থাকা জীবন নিয়ে সাইফ আল-ইসলাম আরও বলেন, তিনি লিবিয়ার জনগণের কাছ থেকে ১০ বছর দূরে ছিলেন।
নিজের ফিরে আসা নিয়ে সাইফ আল-ইসলাম বলেছিলেন, ‘আপনাকে ধীরে ধীরে ফিরে আসতে হবে, খুব ধীরে ধীরে। ধাপে ধাপে।’
২০২১ সালের নভেম্বর মাসে সাইফ আল-ইসলাম প্রথমবার জনসমক্ষে হাজির হয়েছিলেন। সেবার লিবিয়ার সেবহা শহরে জনসমক্ষে এসে তিনি লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য আবেদন করেন। তাঁর এই আগমন তাঁর বাবার সমর্থকদের আশাকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি চেষ্টা ছিল।
প্রথমে সাইফ আল–ইসলামকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পরে তাঁকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়।
তবে লিবিয়ার অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।
‘উদারপন্থী’ ভাবমূর্তি
পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত এবং সাবলীল বক্তা সাইফ আল-ইসলাম লিবিয়ার দমনমূলক সরকারের বিপরীতে নিজেকে একজন উদারপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি ২০০৮ সালে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
পিএইচডিতে সাইফের গবেষণা অভিসন্দর্ভ (থিসিস) ছিল বিশ্বশাসন সংস্কারে নাগরিক সমাজের ভূমিকা।
লিবিয়ার রাজনৈতিক সংস্কারে সাইফ আল–ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি ২০০০ থেকে ২০১১ সালের গণ–অভ্যুত্থান শুরু হওয়া আগপর্যন্ত লিবিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক মেরামতের প্রচেষ্টায় অত্যন্ত দৃশ্যমান ও সক্রিয় ভূমিকা রাখছিলেন।
যদিও পরে লিবিয়ার শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার কারণে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল; বিশেষ করে সাইফ আল-ইসলামকে ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করার জন্য।
সাইফ আল–ইসলাম তাঁর পিএইচডি ডিগ্রি গ্রহণ অনুষ্ঠানের দিন গাদ্দাফি ইন্টারন্যাশনাল চ্যারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন থেকে ২৪ লাখ ডলারের উপহার চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন।
সাইফ আল-ইসলাম আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একজন আলোচক ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।
সাইফ লকারবি বোমা হামলা, বার্লিন নাইট ক্লাবে আক্রমণ এবং সাহারা মরুভূমিতে বিস্ফোরিত ইউটিএ ফ্লাইট ৭৭২–এর নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণবিষয়ক আলোচনা করার সময়ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
সাইফ ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে লিবিয়ায় শিশুদের এইচআইভি সংক্রমণের অভিযোগে অভিযুক্ত ছয়জন চিকিৎসকের মুক্তির আলোচনাতেও মধ্যস্থতা করেছিলেন। ছয় চিকিৎসকের মধ্যে পাঁচজন ছিলেন বুলগেরিয়ান। ১৯৯৯ সালে তাঁদের আট বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। মুক্তির পর তাঁরা দাবি করেছিলেন, কারাগারে তাঁরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
সাইফ আল–ইসলামের আরও কয়েকটি প্রস্তাব আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম ‘ইসরাটিন’—এটি ধর্মনিরপেক্ষ একরাষ্ট্র সমাধানের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি-ইসরায়েল সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের প্রস্তাব।
সাইফ ফিলিপাইনের সরকার ও মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্টের নেতাদের মধ্যে শান্তি আলোচনার আয়োজন করেছিলেন, যার ফলে ২০০১ সালে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।