কারাবাস থেকে অং সান সু চি আবার গৃহবন্দী
মিয়ানমারের সাবেক নেত্রী অং সান সু চিকে কারাগার থেকে গৃহবন্দী হিসেবে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
এর আগে গত শুক্রবার সু চির আইনজীবী বলেছিলেন, মিয়ানমার সরকার তাঁর মক্কেলের সাজার মেয়াদ ছয় ভাগের এক ভাগ কমিয়েছে। তবে সু চি তাঁর বাকি সাজা গৃহবন্দী অবস্থায় ভোগ করতে পারবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
২০২১ সালে মিন অং হ্লাইং এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। ৮০ বছর বয়সী এই নোবেলজয়ী নেত্রী মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোর একটি সামরিক কারাগারে বন্দী ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল।
ওই সময় থেকে জান্তা সরকারকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন মিন অং হ্লাইং। ৩ এপ্রিল তিনি মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ওই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না।
মিন অং হ্লাইং এক বিবৃতিতে বলেন, সু চির অবশিষ্ট সাজা ‘নির্ধারিত বাসস্থানে’ কাটানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দুজন সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর একটি ছবিও প্রকাশিত হয়েছে।
তবে এই ঘোষণায় আশ্বস্ত হতে পারছেন না সু চির ছেলে কিম অ্যারিস। তিনি বিবিসিকে বলেন, মা বেঁচে আছেন কি না, তারও কোনো প্রমাণ তাঁর কাছে নেই। প্রকাশিত ছবিটিকে তিনি ‘অর্থহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। কারণ, এটি ২০২২ সালে তোলা।
কিম অ্যারিস বলেন, ‘আশা করি এটা সত্যি। কিন্তু তাঁকে (কারাগার থেকে) সরিয়ে নেওয়া হয়েছে— এমন কোনো প্রমাণ আমার কাছে নেই। যতক্ষণ না আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারছি বা কেউ স্বাধীনভাবে তাঁর অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা যাচাই করতে পারছেন, ততক্ষণ কিছুই বিশ্বাস করব না।’
মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের দিন গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে সু চি সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা যায়নি। আইনজীবীরা তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারেননি; পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে। গৃহবন্দী হিসেবে স্থানান্তরের ঘোষণার আগ পর্যন্ত তাঁর স্বাস্থ্য ও জীবনযাপন সম্পর্কে কিছুই জানা যাচ্ছিল না। সু চির আইনজীবীরাও জানিয়েছেন, গৃহবন্দী করার বিষয়ে তাঁদের সরাসরি কিছু জানানো হয়নি।
এর আগে সু চিকে শেষ দেখা গিয়েছিল ২০২১ সালের মে মাসে একটি আদালতে। সেনাবাহিনীর করা একাধিক মামলার শুনানিতে তাঁকে উপস্থিত করা হয়েছে। মামলাগুলোকে ব্যাপকভাবে সাজানো বলে মনে করা হয়। এরপর থেকে তাঁর ৩৩ বছরের সাজা কয়েক দফায় কমানো হয়েছে।
উসকানি, দুর্নীতি, নির্বাচনে জালিয়াতি এবং রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা আইন ভাঙার মতো একাধিক অভিযোগে সু চি কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তবে শান্তিতে নোবেলজয়ী এ নেত্রীর সমর্থকদের দাবি, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে হঠাৎ সু চির উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, সামরিক কর্তৃপক্ষ হয়তো তাঁর মুক্তির বিষয়ে ভাবছে। সেনা অভ্যুত্থানের নেতা মিন অং হ্লাইং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে একের পর এক সামরিক সাফল্যের পর তিনি এখন অনেকটাই আত্মবিশ্বাসী।
এ বছরের শুরুতে জান্তা একটি নির্বাচনও আয়োজন করেছে, যদিও সেই নির্বাচনে নামেমাত্র গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে— ক্ষমতার রাশ সামরিক নেতাদের হাতেই রয়ে গেছে।
এর আগে দীর্ঘ সময় গৃহবন্দী থাকা অবস্থায় মর্যাদাপূর্ণ ও অহিংস প্রতিরোধের মাধ্যমে মিয়ানমার ও বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের মন জয় করেছিলেন সু চি। পারিবারিক বাড়ি থেকে সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া তাঁর ভাষণগুলো তাঁকে প্রায় কিংবদন্তিতুল্য করে তুলেছিল। ১৯৯১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান তিনি।
তবে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর নৃশংসতার মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের পক্ষে সাফাই দেওয়ার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর ভাবমূর্তিতে গভীর আঘাত হানে।