দেয়ালে সাঁটানো মুখগুলো কি কখনো ঘরে ফিরবে

হাসপাতালের দেয়ালে সাঁটানো রোগীদের তালিকায় স্বজনের নাম খুঁজছেন তাঁরা। কাঠমান্ডু, নেপাল, ২৮ আগস্ট ২০২৬ছবি: এএফপি

দেয়ালে সাঁটানো নিখোঁজ মানুষের সারি সারি ছবি। কোথাও স্কুলের ইউনিফর্ম পরা এক কিশোরী, মুখে হাসি। কোথাও গোলগাল গালের এক শিশুর ছবি। বিয়ের দিনের হাসিমুখের এক দম্পতি, পাশেই পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ কিংবা দরজার আড়াল থেকে উঁকি দেওয়া লম্বা চুলের এক কিশোরী। ছবির মানুষগুলোর কেউ জানে না, তারা কোথায়। কেউ জানে না, তারা বেঁচে আছে কি না!

নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালের দেয়ালে সাঁটানো ছবিগুলোর নিচের আঠাও এখনো শুকায়নি। প্রতিটি ছবির নিচে একটিই আর্তি—এ মানুষটিকে কেউ দেখেছেন কি?

হিমবাহধসের কারণে প্রলয়ংকরী ঢলে পুরো গ্রাম ভাসিয়ে নেওয়ার পর নিখোঁজ হাজারো মানুষের স্বজন এখন হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরছেন। রোগীদের তালিকায় পরিচিত কোনো নাম খুঁজছেন, পুলিশ ডেস্কে নিখোঁজ স্বজনের নাম লিখিয়ে দিচ্ছেন আর দেয়ালে সাঁটিয়ে দিচ্ছেন প্রিয় মানুষের ছবি।

নেপালের চিতওয়ান শহরে বিপুলসংখ্যক মরদেহ সংরক্ষণে হিমশিম খাচ্ছে মর্গগুলো। মৃতদেহ রাখার জন্য তৈরি করতে হয়েছে অস্থায়ী ভবন। প্রবল স্রোতে কিছু মরদেহ এত দূরে ভেসে গেছে যে সেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে প্রতিবেশী ভারত থেকে।

গতকাল শনিবার সকাল পর্যন্ত নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজারে পৌঁছেছে। নেপালে এ পর্যন্ত অন্তত ৬৭৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ক্রমেই বাড়ছে এ সংখ্যা। তবে দুর্গম বহু এলাকায় এখনো শুধু সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। কাদামাটির নিচে আরও কত মানুষ যে চাপা পড়ে আছে, তা কেউ বলতে পারছেন না। বলতে পারছেন না উদ্ধারকারীরাও।

নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করাও হয়ে উঠেছে এখন এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।

পুলিশ ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে একের পর এক মানুষ পরিবারের নিখোঁজ সদস্যদের নাম নিবন্ধন করছেন। কাঠমান্ডু, নেপাল, ২৮ আগস্ট ২০২৬
ছবি: এএফপি

নেপালের চিতওয়ান শহরে বিপুলসংখ্যক মরদেহ সংরক্ষণে হিমশিম খাচ্ছে মর্গগুলো। মৃতদেহ রাখার জন্য তৈরি করতে হয়েছে অস্থায়ী ভবন। প্রবল স্রোতে কিছু মরদেহ এত দূরে ভেসে গেছে যে সেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে প্রতিবেশী ভারত থেকে।

দুর্যোগ আঘাত হানার চার দিন পরও রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে স্বজনদের ভিড় কমেনি। পুলিশ ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে একের পর এক মানুষ পরিবারের নিখোঁজ সদস্যদের নাম নিবন্ধন করছেন। প্রিয়জনেরা বেঁচে আছেন—এ আশায় হাসপাতালের ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শত শত আহত ব্যক্তির তালিকায় চোখ বুলিয়ে কেউ খুঁজছেন বাবা, কেউ সন্তান, কেউ স্বামী কিংবা ভাইকে।

দুর্গত অনেক এলাকার যোগাযোগ প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। কোনো খবর পৌঁছাচ্ছে না। তাই নিখোঁজদের তথ্যের সন্ধানে মানুষের শেষ ভরসা হয়ে উঠেছে দেয়ালে সাঁটানো ছবি।

নেপালের উত্তরাঞ্চলের দুর্যোগকবলিত রাসুয়া জেলার জায়দাদা গ্রামে থাকতেন ইয়াভরাজ লামার বোন, তাঁর স্বামী ও তাঁদের দুই সন্তান। পুরো গ্রাম ঢলের পানিতে ভেসে গেছে। সেই সময় থেকে নিখোঁজ লামার চার স্বজন।

হাসপাতালের দেয়ালে এক বছর বয়সী শিশু সিজান তাওয়াংয়ের ছবি আঠা দিয়ে লাগানোর সময় চোখে পানি চলে আসে লামার। ছবিতে শিশু সিজান তার মায়ের কোলে। পাশেই সাঁটানো তার ১২ বছর বয়সী ভাই সাহিলের ছবি।

রোগীদের তালিকায় পরিচিত কোনো নাম বা ছবিতে স্বজনের মুখ খুঁজছে শিশুটি। কাঠমান্ডু, নেপাল, ২৮ আগস্ট ২০২৬
ছবি: এএফপি

‘আমরা স্তব্ধ হয়ে গেছি। আমরা কতটা দুঃখিত ও বিধ্বস্ত, তা বলার মতো ভাষা নেই। আমাদের প্রধান লক্ষ্য এখন ছোট্ট সিজানকে খুঁজে বের করা। সে ছিল এত মিষ্টি আর নিষ্পাপ; সে আর আমাদের সঙ্গে নেই—এ কথা ভাবাও আমাদের পক্ষে অসম্ভব’, স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে এভাবেই বলছিলেন লামা।

একটু থেমে লামা আবার বলেন, ‘কিন্তু তাদের পুরো গ্রামটাই হাওয়া হয়ে গেছে। তাই তাদের কেউ বেঁচে আছে, এমন কোনো আশাই আমাদের আর অবশিষ্ট নেই।’

তাদের পুরো গ্রামটাই হাওয়া হয়ে গেছে। তাই তাদের কেউ বেঁচে আছে, এমন কোনো আশাই আমাদের আর অবশিষ্ট নেই।

পাশের দেয়ালে একটি ছবি সাঁটানোর সময় শোকে বিলাপ করছিলেন ২২ বছর বয়সী মনিতা নেপালি। ছবির মানুষটি তাঁর স্বামী বিশাল নেপালি, বয়স ৩০ বছর। মাত্র ছয় মাস আগে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল।

উদ্ধারের পর ছোট্ট এই মেয়েকে তার পরিবারের সদস্যরা জড়িয়ে ধরছে। ত্রিশূলী ক্যাম্প, নুয়াকোট, নেপাল, ২৮ আগস্ট ২০২৬
ছবি: এএফপি

বিশাল নেপালি চালক হিসেবে কাজ করতেন। কাজের প্রয়োজনে তাঁকে প্রায়ই নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এলাকায় যেতে হতো। দুর্যোগ আঘাত হানার এক ঘণ্টা আগে রাসুয়ায় সকালে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন তিনি। সে সময় স্ত্রী মনিতার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল তাঁর। সেদিন সন্ধ্যায় আবার ফোন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু এর পর থেকে তাঁর ফোন বন্ধ।

চার দিন কেটে গেছে। তবু স্বামীর ফিরে আসার আশা ছাড়েননি মনিতা। তিনি বলেন, ‘ওকে ছাড়া আমি এ পৃথিবীতে বাঁচতে চাই না। আমার হৃদয় বলছে, সে ফিরে আসবে।’

আরও পড়ুন

কিছু পরিবারের জন্য ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ৩৬ বছর বয়সী তুলমায়া তামাং হাসপাতালে এসেছেন তাঁর পরিবারের ১২ সদস্যের কয়েকজনের ছবি নিয়ে। তাঁদের মধ্যে আছে তাঁর পাঁচ মাস বয়সী ভাতিজিও। সবাই রাসুয়ার একটি গ্রামে থাকতেন। দুর্যোগের পর থেকে তাঁদের কারও খোঁজ নেই।

জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে পড়া এক ব্যক্তিকে উদ্ধার করছেন নেপালের সেনাবাহিনীর সদস্যরা। রাসুয়া, নেপাল, ২৮ আগস্ট ২০২৬
ছবি: এএফপি

তুলমায়া বলেন, ‘আমাদের পরিবার ভয়াবহ মানসিক চাপের মধ্যে আছে। এত মানুষ চলে গেছে, আর আমরা যারা বেঁচে আছি, তারাও সংগ্রাম করছি।’

স্বজনদের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা যখন ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে, তখন তুলমায়ার চাওয়া বদলে গেছে। এখন অন্তত প্রিয়জনদের মরদেহ ফিরে পাওয়ার আকুতি তাঁর।

‘আমরা যদি মরদেহগুলো পেতাম, তাহলে অন্তত শান্তি পেতাম। তা না হলে পরিবার কখনোই এ ভাবনা থেকে বের হতে পারবে না। এই যন্ত্রণা অনেক দীর্ঘ সময় ধরে চলবে,’ বলেন তুলমায়া।

নিখোঁজ মানুষের তালিকায় আছেন হিমালয়ের উঁচু এলাকায় ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর শ্রমিকেরাও। এসব প্রকল্পে কাজ করা অন্তত ৯০০ জন এখনো নিখোঁজ। তাঁদের অনেকেই কম মজুরির শ্রমিক। অন্তত ৬৩ জন ভারতের নাগরিক। কাদার স্রোতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নেপালের সেনাবাহিনীর ধারণা, অন্তত আরও ১০০ জন এখনো সুড়ঙ্গগুলোর ভেতরে আটকা পড়ে আছেন। রাসুয়া, নেপাল, ২৮ আগস্ট
ছবি: এএফপি

২৮ আগস্টের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, নেপালি সেনারা ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গের ভেতর ঘন কাদা ভেদ করে জীবিত কয়েকজনকে উদ্ধার করছেন। নেপালের সেনাবাহিনীর ধারণা, অন্তত আরও ১০০ জন এখনো প্রকল্পের সুড়ঙ্গগুলোতে আটকা পড়ে আছেন। ত্রিশূলী-৩ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ভূগর্ভেও আরও কয়েক ডজন মানুষ আটকা পড়েছেন।

নিখোঁজদের একজন ২৪ বছর বয়সী সুজন নেপালি। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে রাতের শিফট শেষ করে বিছানায় ঘুমাচ্ছিলেন। এমন সময় পানির দেয়ালের মতো প্রবল স্রোত নেমে আসে উপত্যকা দিয়ে। তার পর থেকে তাঁর খোঁজ নেই।

দুর্গত অনেক এলাকার যোগাযোগ প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। কোনো খবর পৌঁছাচ্ছে না। তাই নিখোঁজদের তথ্যের সন্ধানে মানুষের শেষ ভরসা হয়ে উঠেছে দেয়ালে সাঁটানো ছবি।

কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালের ট্রমা সেন্টারে প্রতিদিন উদ্বেগ নিয়ে আসছেন সুজনের বোন সুশিশা মালুওয়ার। আহত ব্যক্তিদের তালিকায় ভাইয়ের নাম আছে কি না, খুঁজে দেখেন তিনি। হাসপাতালগুলোতে ভাইয়ের নাম লিখে দিচ্ছেন, বিভিন্ন জায়গায় সাঁটিয়ে দিচ্ছেন ভাইয়ের ছবি।

আরও পড়ুন

চার দিন পরও আশা হারাননি সুশিশা। বলেন, ‘আমরা আশা হারাইনি। হাসপাতালগুলোতে তাঁর নাম লিখে দিচ্ছি, সবখানে তাঁর ছবি সাঁটিয়ে দিচ্ছি। হয়তো কোথাও তাঁকে খুঁজে পাব। হয়তো তাঁকে ইতিমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। হয়তো তিনি পালিয়ে যেতে পেরেছেন। হয়তো এখনো বেঁচে আছে।’

নেপালের কাঠমান্ডুর বীর হাসপাতালের ট্রমা সেন্টারের বাইরে আহত ব্যক্তিদের তালিকা দেখছেন পরিবারের সদস্যরা। কাঠমান্ডু, নেপাল, ২৬ আগস্ট ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

একই আশায় হাসপাতালের দেয়ালে একের পর এক ছবি সাঁটানো হচ্ছে। কারও বাবা, কারও সন্তান, কারও সদ্য বিয়ে করা স্বামী, কারও ভাইয়ের খোঁজে। প্রতিটি ছবির পাশে অপেক্ষা করছে একেকটি পরিবার। তাঁদের কারও বিশ্বাস, প্রিয় মানুষটি ফিরে আসবেন। আর কেউ শুধু অপেক্ষা করছেন—অন্তত একটি খবরের জন্য।

আরও পড়ুন