যুক্তরাষ্ট্রকে না চটিয়ে জাপানের ইরান-কূটনীতি

জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোতেগি তোশিমিৎসুফাইল ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ উভয় সংকটে ফেলেছে জাপানকে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র আহ্বান জানাচ্ছে ইরানে হামলায় যোগ দিতে; অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরান তেল সরবরাহ বন্ধ করায় ভুগতে হচ্ছে জাপানকে। যুদ্ধে না জড়িয়ে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায়ই সংকট উতরে যেতে চাইছে টোকিও।

এর মধ্যই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোতেগি তোশিমিতসু। এর মধ্যে ইরানে সম্প্রতি আটক হওয়া দুজন জাপানি নাগরিকের মধ্যে একজনকে মুক্তও করা গেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাপানের জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে তেহরানের সহায়তার আশ্বাসও মিলেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে হামলা চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের সূত্রপাত। এরপর ইরানও ওই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাঘাঁটিতে হামলা শুরু করলে যুদ্ধ ব্যাপকতা পায়। পাল্টাপাল্টি হামলায় আক্রান্ত হচ্ছে তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ক্ষেত্রগুলো। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধই বলা যায়।

এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে এশিয়া-আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নত দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর। বিশ্বের প্রায় ২০ ভাগ জ্বালানি সরবরাহের পথ হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কড়া নিয়ন্ত্রণ তেলের বিশ্ববাজার অস্থির করে তুলেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম ইউক্রেন যুদ্ধের পর এই প্রথম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে।

জ্বালানি–সংকটের প্রভাব জাপানে এখন দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। মিতসুবিশি গাড়ি ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির প্লাস্টিক উৎপাদন এবং খাদ্যমোড়ক তৈরিতে ব্যবহার করা পেট্রোকেমিক্যালের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আবার জেএফই স্টিল তাদের ইস্পাত কারখানার পাঁচটি তাপবিদ্যুৎ জেনারেটরের মধ্যে একটি অস্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।

গত সপ্তাহে সাধারণ পেট্রলের গড় দাম বেড়ে দাঁড়ায় প্রতি লিটার ১৯০ দশমিক ৮ ইয়েন বা ১ দশমিক ২০ ডলারে, যা ১৯৯০ সালের পর সর্বোচ্চ। এই পরিস্থিতিতে জাপান সরকার গত বৃহস্পতিবার থেকে পেট্রলের দামের ওপর ভর্তুকি দিতে শুরু করেছে। পেট্রলের খুচরা মূল্য লিটারপ্রতি ১৭০ ইয়েনের কাছাকাছি রাখাই যার লক্ষ্য। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বা আইইএর সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে জাতীয় রিজার্ভ থেকে মোট ৮০ মিলিয়ন ব্যারেল তেলও বাজারে ছাড়তে শুরু করেছে জাপান।

যুদ্ধ থামার কোনো ইঙ্গিত না থাকায় জ্বালানি সরবরাহের সংকট কাটাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে জাপান সরকার। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রসহ জি-৭ দেশগুলোর পাশাপাশি সৌদি আরব, কাতার, জর্ডান, কুয়েত ও ইসরায়েলের মতো দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছে টোকিও।

এর মধ্যে প্রায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে দুবার টেলিফোনে কথা বলেছেন জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোতেগি তোশিমিতসু। তিনি এই আলোচনায় ইরানের প্রতি জ্বালানিবাহী জাহাজগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। জাপানি নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।

ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে এসেছে জাপান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি তাঁর সাম্প্রতিক ওয়াশিংটন সফরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধে যোগদানের আহ্বানে সাড়া দেননি; যদিও হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার বিষয়ে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন।

দৃশ্যত ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে কূটনৈতিকভাবে সংকট মোকাবিলার পথটিই চালু রেখেছে জাপান সরকার। ইরানের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির একসময় (২০০৮-২০১১) জাপানে রাষ্ট্রদূতের দয়িত্বে ছিলেন। সেই সম্পর্কই কাজে লাগাতে চাইছে টোকিও।

জাপানের বার্তা সংস্থা কিয়োদোকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, ‘আমরা প্রণালিটি (হরমুজ) বন্ধ করিনি। এটি উন্মুক্ত আছে।’ তিনি বলছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলসংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোই এই প্রণালি অতিক্রমে বাধা দিচ্ছে।

গত শনিবার প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারে তিনি এটাও বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাপানসহ অন্য দেশগুলোর জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে সহায়তা দিতে প্রস্তুত তেহরান। টোকিওতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, জাপান সরকার আরাগচির মন্তব্য সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করছে।

জাপানের অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তাই হরমুজ প্রণালি নিয়ে পাল্টাপাল্টি হুমকির মধ্যে এই সংবাদ জাপানের জন্য আপাতত স্বস্তির।

আরও পড়ুন
হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়া তাকাইচি। ১৯ মার্চ, ওয়াশিংটন
ছবি: জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

জাপান সরকারের একজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে কিওদো জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার জন্য ইরানি পক্ষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করাই ‘সবচেয়ে কার্যকর উপায়’। তবে যুক্তরাষ্ট্র যাতে এতে অসন্তুষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

এদিকে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনায় অন্য যে প্রসঙ্গটি উত্থাপিত হয়েছিল, তা হচ্ছে ইরানে সম্প্রতি আটক হওয়া দুজন জাপানি নাগরিকের মুক্তি।

জাপান সরকার চলতি মাসের শুরুতে ইরানে দুজন জাপানি নাগরিকের আটকের খবর জানিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোতেগি গতকাল এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে একটি সুখবর দিয়েছেন জাপানিদের। তিনি বলেছেন, ইরানে আটক দুই জাপানি নাগরিকের মধ্যে একজনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। গত বুধবার মুক্তি পাওয়া ওই ব্যক্তি আজারবাইজান থেকে একটি বিমানে চড়ে গতকাল সকালে জাপানে পৌঁছেছেন এবং তিনি সুস্থ আছেন।

আটক অন্যজনকে দ্রুত মুক্তির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথাও বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোতেগি। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট বা সিপিজে জানিয়েছে, ইরানে আটক অন্যজন হলেন জাপানের সম্প্রচারকেন্দ্র এনএইচকের একজন সাংবাদিক। তিনি গত ২০ জানুয়ারি ইরানে আটক হয়েছিলেন।

সার্বিক পরিস্থিতিতে বলা যায়, যুদ্ধকালীন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে কূটনীতিই জাপানের জন্য উত্তম পথ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহের আশ্বাস এবং নিজের নাগরিকের মুক্তি যার দৃশ্যমান সুফল।

তবে এখানে একটি সতর্কবার্তাও আছে। ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সাবেক কমান্ডার হোসাইন কানানি মোগাদ্দেম সম্প্রতি তেহরান থেকে এনএইচকেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানের ওপর হামলায় জাপানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো ব্যবহৃত হলে সেগুলোও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। জাপানকে এই যুদ্ধে না জড়ানোর আহ্বানও জানান তিনি।

জাপান গতকাল জি-৭ দেশগুলোর সঙ্গে এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানকে সংঘাত বিস্তৃত না করার জন্য সতর্ক করলেও এখন পর্যন্ত যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার কোনো আগ্রহ দেখায়নি; বরং এই সংঘাত থামলে প্রয়োজনে মাইন অপসারণের মতো কাজে ভূমিকা রাখার কথা বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোতেগি।

এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনগুলোয় জাপানের দেখানো শান্তিপূর্ণ আলোচনার পথেই কি মিটবে বিশ্বের ওপর জেঁকে বসা এই মহাসংকট, নাকি অব্যাহত থাকবে নিত্যনতুন মারণাস্ত্রের গর্জন, সেই সঙ্গে ভুক্তভোগী অসহায় মানুষের আর্তনাদ!