আইসেনহাওয়ার থেকে বুশ: পাকিস্তানকে কখন কখন কাছে টেনেছিল যুক্তরাষ্ট্র
সপ্তাহের শেষ লগ্নে এসে সবার নজর এখন পাকিস্তানে। বিশ্বের সংকটময় এক সময়ে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ একটি যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করছে। এই আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা ইতিমধ্যে ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন।
আজ শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই আলোচনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যই নয়, বাকি বিশ্বের ভাগ্য অনেকটাই নির্ধারণ করে দিতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠক আয়োজনে পাকিস্তান সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। ইসলামাবাদে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে, নিরাপত্তার জন্য নগরজুড়ে ১০ হাজারের বেশি নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং রাজধানীতে প্রবেশের সব পথ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানের জন্য এটি তাদের কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্টসহ কোনো উচ্চপর্যায়ের মার্কিন প্রতিনিধিদল পাকিস্তান সফর করেনি। সে বিচারে জেডি ভ্যান্স গুরুত্বপূর্ণ অতিথি হয়েই এখন রয়েছেন ইসলামাবাদে।
তবে এই প্রথম নয়, অতীতেও নানা সময়ে পাকিস্তানের শরণ নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। নানা প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট গিয়েছিলেন পাকিস্তানে। দেখে নেওয়া যাক, তাঁরা কারা ছিলেন, আর কেনই–বা গিয়েছিলেন।
সেদিন করাচি ভরে গিয়েছিল সুঘ্রাণে
সালটি ১৯৫৯, ডিসেম্বরের এক শীতের সকালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খানের আমন্ত্রণে করাচিতে পৌঁছান যুক্তরাষ্ট্রের ৩৪তম প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি আইসেনহাওয়ার। সেটাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টের প্রথম পাকিস্তান সফর।
দুই নেতা আলোচনা করেন পূর্ব–পশ্চিম সম্পর্ক, মধ্যপ্রাচ্যে সোভিয়েত কৌশল, পাকিস্তান–ভারত সম্পর্ক, সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশন, পাকিস্তানের সামরিক প্রয়োজন এবং আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে।
ডন পত্রিকায় লেখা একটি কলামে ওই স্মৃতি স্মরণ করে শিক্ষাবিদ পারভেজ হুদবয় বলেন, তখন যাঁরা ছিলেন, তাঁরা কখনো আইসেনহাওয়ারের সেই সফরের কথা ভুলতে পারবেন না।
পারভেজ হুদবয় বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে শহরের সব সরকারি ও বেসরকারি ভবন সুন্দর করে সাজানো হয়েছিল। নতুন কার্পেটিং আর আলোকসজ্জায় সড়কগুলোর চেহারা বদলে গিয়েছিল। স্কুল স্কুলে ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানানোর মহড়া। বিশাল আকারের একটি ফোয়ারা তৈরি করা হয়েছিল, বাজনার তালে তালে সেখানে পানির নাচন হতো। পরে সেই ফোয়ারাটি ভেঙে ফেলা হয়।
সেদিন করাচি উপকণ্ঠ কীভাবে সুগন্ধির সুঘ্রাণে ভরে উঠেছিল, তা এখনো মনে করতে পারেন পারভেজ হুদবয়।
তাঁর কথায়, আইসেনহাওয়ারের উড়োজাহাজটি মউরিপুর বিমানঘাঁটিতে অবতরণের কথা ছিল। সে সময়ে সেখান থেকে শহরের কেন্দ্রের দিকে যেতে সড়কে তিন থেকে চার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি অংশ ছিল একটি কলোনির পাশ দিয়ে। যেখানে গরিব মানুষ থাকত। খোলা নর্দমা ও রাস্তার ওপর শৌচাগারের দুর্গন্ধে কলোনির আশপাশের বাতাস ভারী হয়ে থাকত।
তিনি লেখেন, ‘ওই দুর্গন্ধ নাকে ঢুকে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যেন কোনো অস্বস্তিতে ফেলতে না পারে, তাই প্যারিস থেকে ড্রামভর্তি সুগন্ধি আনা হয়েছিল এবং রাস্তার দুই পাশে তা ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল।’
মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওই সফর পাকিস্তানের জন্য অনেক সুবিধা বয়ে এনেছিল। পরের দুই থেকে তিন বছর যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দ্বিগুণ করে এবং পাকিস্তানকে ‘একটি সম্পূর্ণ বিমানবাহিনী’ উপহার দেয় বলে জানান এই শিক্ষাবিদ।
পাকিস্তান হয়ে উঠেছিল যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র’।
অপ্রত্যাশিত বন্ধুত্ব
১৯৬১ সালের ২০ মে, করাচির উটের গাড়ির চালক বশির আহমেদ সারবেনের জীবন চিরতরে বদলে যায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যিনি প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির পক্ষে শুভেচ্ছা সফরে গিয়েছিলেন পাকিস্তানে।
জনসনের গাড়িটি সেদিন করাচির যানজটে আটকে গিয়েছিল, সে সময় তিনি বশিরকে দেখতে পান এবং গাড়ি থেকে নেমে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে যান।
বহু বছর পর বশিরের ছেলে সেদিনের কথা মনে করে বলেন, ‘লিন্ডন জনসন যখন আমাদের বাবাকে উটের গাড়িসহ দেখেন, তিনি থেমে যান। এরপর তিনি আমাদের বাবার সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁর সঙ্গে হাত মেলান। জনসন আমাদের বাবাকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি তাঁর বন্ধু হতে চান কি না। আমার বাবা বলেছিলেন, হ্যাঁ।’
বশিরকে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের আমন্ত্রণও জানানো হয়েছিল। পরবর্তীকালে বশিরের যুক্তরাষ্ট্র সফর একটি আজীবন সম্পর্কের সূচনা করে, যা দুজনের মৃত্যুর আগপর্যন্ত অটুট ছিল।
এর কয়েক বছর পর ১৯৬৭ সালে জনসন একটি সংক্ষিপ্ত সফরে আবার পাকিস্তানে গিয়েছিলেন, তবে এবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে, এক ঘণ্টার জন্য। তিনি তাঁর ওয়ার্ল্ড ট্যুরের অংশ হিসেবে করাচি বিমানবন্দরে জেনারেল আইয়ুব খানের সঙ্গে দেখা করেন।
চিঠি পৌঁছানো
১৯৮৪ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ (সিনিয়র বুশ) পাকিস্তানের একটি ঘন পাইনবনের ভেতর দেশটির সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউল হকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনালের (ইউপিআই) একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুশ সেখানে গিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের একটি চিঠি পৌঁছে দিতে। চিঠির বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি।
তবে মার্কিন সরকারের একজন মুখপাত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, চিঠিতে বক্তব্যে ভূরাজনৈতিক ও আঞ্চলিক বিষয়, পাকিস্তান–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং বিশ্ব অর্থনীতি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
দূতিয়ালি
বৈশ্বিক কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করা পাকিস্তানের জন্য নতুন কিছু নয়। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এই উদ্দেশ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশটি সফর করেন। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যেন তিনি বেইজিংকে এই বার্তা পৌঁছে দেন যে ওয়াশিংটন চীনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে চায়।
ওয়াশিংটন ও বেইজিং—উভয়ের সঙ্গেই কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার কারণে পাকিস্তানকে এই কূটনৈতিক ভূমিকার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল।
বহু বছর পর এক সাক্ষাৎকারে চীনে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইনস্টন লর্ড বলেছিলেন, ‘আমরা শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানকেই বেছে নিয়েছিলাম। পাকিস্তানের সুবিধা ছিল, তারা দুই পক্ষেরই বন্ধু ছিল।’
ইসলামাবাদ সফলভাবে সেই দায়িত্ব পালন করেছিল। পাকিস্তানের সহায়তায় দুই বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র–চীন পরোক্ষ যোগাযোগ চলার পর, ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তান সরকারের একটি উড়োজাহাজে বেইজিং সফর করেন।
কোনো ছবি নয়!
পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে নওয়াজ শরিফকে অপসারণের অল্প সময় পরে ২০০০ সালে বিল ক্লিনটন যান পাকিস্তান সফরে। রিচার্ড নিক্সনের পর ক্লিনটনই পাকিস্তান সফরকারী প্রথম প্রেসিডেন্ট।
তিনি মাত্র পাঁচ ঘণ্টা পাকিস্তানে অবস্থান করেছিলেন। কিন্তু নানা ঘটনার কারণে তাঁর সেই সংক্ষিপ্ত সফরও সে সময়ে বেশ আলোচিত ছিল।
পাকিস্তানের সাবেক অর্থমন্ত্রী শওকত আজিজ তাঁর লেখা বইয়ে উল্লেখ করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন সেবার পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সঙ্গে করমর্দনের ছবি তুলতে অস্বীকৃতি জানান। মোশাররফের সামরিক অভ্যুত্থানকে তিনি সমর্থন দিচ্ছেন, এমন ধারণা মার্কিন প্রেসিডেন্ট দিতে চাননি।
শুধু তা–ই নয়, ক্লিনটন ওই সফরে সব ধরনের কূটনৈতিক প্রথাও উপেক্ষা করেছিলেন, যা অনেকের ভ্রু কুঁচকে দিয়েছিল। তিনি টেলিভিশনে পাকিস্তানিদের উদ্দেশে ভাষণ দেন।
অঘোষিত সফর
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একের পর এক উচ্চপর্যায়ের সফরের কারণে সে সময় পাকিস্তান ছিল বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এমনই একটি সফর ছিল ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে। সেবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি পাকিস্তান সফরে যান।
যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ককে দীর্ঘ মেয়াদে আরও জোরদার করতে চায়—জেনারেল মোশাররফের সঙ্গে বৈঠকে ডিক চেনি এ কথা বলেছিলেন বলে দাবি করা হয়।
২০০৭ সালে একটি অঘোষিত সফরে তিনি আবারও পাকিস্তানে যান। বলা হয়, ‘অঘোষিত’ ওই সফরে চেনি নাকি পারভেজ মোশাররফকে এমন একটি সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, যা পাকিস্তানে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ওই সতর্কবার্তা ছিল আল–কায়েদার বিরুদ্ধে আরও জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণে পাকিস্তানকে চাপ দেওয়া।
লকডাউন ও ক্রিকেট
২০০৬ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ (জুনিয়র বুশ) গভীর রাতে পাকিস্তানে পৌঁছান। তিনি একটি সামরিক ঘাঁটিতে অবতরণ করেন, যেখানে আলো কমিয়ে রাখা হয়েছিল এবং যাত্রীদের জানালার পর্দা টেনে দিতে বলা হয়েছিল।
অন্ধকারের আড়াল সত্ত্বেও প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানাতে একটি দল সেখানে উপস্থিত ছিল—ছয়জন স্থানীয় টিভির ক্রু এবং একটি ব্যানার, যেখানে লেখা ছিল ‘প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ পাকিস্তানের বন্ধু’, পাশাপাশি বুশ ও মোশাররফের ছবিও ছিল।
টাইম ম্যাগাজিন জানায়, সেখানে ছিল একাধিক হেলিকপ্টার। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের মতে, বুশ কোন হেলিকপ্টারে উঠেছিলেন, তা বোঝা কঠিন ছিল। সম্ভবত সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা থেকে বিভ্রান্তি তৈরি করতে এমনটা করা হয়েছিল।
বুশ–মোশাররফ বৈঠক উপলক্ষে আগে এবং বৈঠক চলাকালে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসলামাবাদ পুরোপুরি লকডাউন করে ফেলা হয়েছিল, সেখানে মোতায়েন করা হয়েছিল কয়েক হাজার সেনা।
বৈঠকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, ২০০৫ সালের ভূমিকম্প দুর্গতদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তাসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
ওই সফরে বুশ পাকিস্তানের ক্রিকেটার ইনজামামুল হকের সঙ্গে করমর্দন করেছিলেন।
পুরস্কার এবং শাস্তি
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেন ২০০৯ ও ২০১১ সালে দুইবার পাকিস্তান সফর করেন।
প্রথম সফরে বাইডেন পাকিস্তানকে ‘অত্যন্ত মূল্যবান মিত্র ও অংশীদার’ হিসেবে তুলে ধরেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন, ইসলামাবাদের সমস্যাগুলো নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আঞ্চলিক এজেন্ডায় উচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। তিনি প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী খান জারদারি এবং প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানির সঙ্গেও বৈঠক করেন।
প্রেসিডেন্ট জারদারি বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাইডেনকে হিলাল-ই-পাকিস্তান পদকে ভূষিত করেন।
তবে ২০১১ সালে তাঁর দ্বিতীয় সফরে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। বাইডেন সেবার পাকিস্তানকে একদিকে প্রলোভন, অন্যদিকে শাস্তির ভয় দেখাতে এসেছিলেন।