বেইজিংয়ে ট্রাম্প–সি বৈঠক থেকে কে কী পেল
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বৈঠক ছিল জাঁকজমক, প্রশংসা আর নানা প্রতিশ্রুতিতে ভরপুর। তবে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এই শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক থেকে শেষ পর্যন্ত দুই নেতা আসলে কী অর্জন করলেন, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
প্রায় এক দশকের মধ্যে প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে চীনের রাজধানী বেইজিং সফর করেন ট্রাম্প। গত শুক্রবার তিনি সফর শেষ করেন। তার দুই দিন আগে শুরু হওয়া এই সফর এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন ট্রাম্পের চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ এবং ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ—দুটি বড় সংকটই আপাতত ঝুলে রয়েছে। আর এ দুটি বিষয়ই চীনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বৈঠকের পর দুই নেতা সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতির কথা বললেও ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের আলাদা আলাদা বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলছে যে এগুলোসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে।
ট্রাম্পকে রাজকীয় অভ্যর্থনা
গত বুধবার বেইজিং পৌঁছানোর পর সামরিক সম্মাননা ও লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়ে ট্রাম্পকে স্বাগত জানান চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। গত শুক্রবার সকালে নিজের সরকারি বাসভবন ঝংনানহাই কমপ্লেক্সের বাগানও ঘুরিয়ে দেখান তিনি। সফরজুড়েই ট্রাম্পের প্রতি আন্তরিক আতিথেয়তা দেখান সি।
গত বৃহস্পতিবার আয়োজিত জাঁকালো ভোজসভায় সি বলেন, ‘চীনা জাতির মহান পুনর্জাগরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রকে আবার মহান করে তোলার লক্ষ্য পাশাপাশি এগিয়ে যেতে পারে।’
ট্রাম্পও সি এর পাল্টা প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, এই অভ্যর্থনা ছিল ‘জীবনে দেখা সবচেয়ে সম্মানজনক আয়োজনগুলোর একটি’। ঝংনানহাইয়ের গোলাপ নিয়ে ট্রাম্প বলেন, এগুলো বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর গোলাপ।
মদ্যপান থেকে দূরে থাকা ট্রাম্প ভোজসভায় সির অনুরোধে সামান্য পানও করেন।
শুক্রবার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আগে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি ও সি এমন অনেক সমস্যার সমাধান করেছেন, যেগুলো অন্য কেউ করতে পারত না। তিনি আরও বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এখন ‘খুবই শক্তিশালী’।
তাইওয়ান নিয়ে কি কোনো অগ্রগতি হলো
জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের আড়ালেও ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হচ্ছে তাইওয়ান, যে প্রশ্নে বড় কোনো অগ্রগতির আশা খুব কমই করেছিলেন বিশ্লেষকেরা।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বরাবরই বলে আসছেন, তাইওয়ানের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের ‘পুনঃএকত্রীকরণ অনিবার্য’। অন্যদিকে ১৯৭০-এর দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ নীতি অনুসরণ করছে; অর্থাৎ ওয়াশিংটন তাইওয়ানের বিষয়ে বেইজিংয়ের অবস্থান স্বীকার করলেও সরাসরি সমর্থন দেয় না।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে সি ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেন, ‘তাইওয়ান প্রশ্নই চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’ তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে দুই দেশ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে।
শুক্রবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, তিনি ও সি তাইওয়ান নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। এ বছর তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অস্ত্র বিক্রির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি কোনো দিকেই প্রতিশ্রুতি দিইনি।’ তিনি আরও জানান, সি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাইওয়ানকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনী ব্যবহার করবে কি না? যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ নীতির সঙ্গে মিল রেখে ট্রাম্প জবাব দেন, ‘আমি এ বিষয়ে কথা বলি না।’
শুক্রবার ফক্স নিউজে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি কাউকে স্বাধীন হতে দেখতে চাই না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কি ৯ হাজার ৫০০ মাইল দূরে গিয়ে যুদ্ধ করতে হবে? আমি সেটা চাই না। আমি চাই পরিস্থিতি শান্ত হোক। আমি চাই চীন শান্ত থাক।’
ইরান নিয়ে কী আলোচনা হলো
বৈঠকের পর ট্রাম্প ইরান বিষয়ে নিজেকে কূটনৈতিকভাবে সফল দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য এবং হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, বেইজিং এমন একটি সমঝোতার পক্ষে কাজ করতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূল হবে।
শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ইরান নিয়ে আলোচনা করেছি। কীভাবে এই সংঘাত শেষ হওয়া উচিত, সে বিষয়ে আমাদের অবস্থান প্রায় একই। আমরা চাই না, ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকুক। আমরা চাই, হরমুজ প্রণালি খোলা থাকুক।’
হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সি চিন পিং হরমুজ প্রণালিকে সামরিকীকরণের বিরোধিতা করেছেন এবং এই জলপথ ব্যবহারে কোনো ধরনের টোল আরোপেরও বিরোধিতা করেছেন। পাশাপাশি চীনের হরমুজ নির্ভরতা কমাতে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি তেল কেনার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন তিনি।
চীনের সরকারি বিবৃতিতে পারমাণবিক অস্ত্র, টোল আদায় বা যুক্তরাষ্ট্রের তেল কেনার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। শুক্রবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘এই সংঘাতের কোনো প্রয়োজন ছিল না। যত দ্রুত সম্ভব, পরিস্থিতির সমাধান হওয়া শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নয়, বরং পুরো অঞ্চল এবং বিশ্বের স্বার্থে জরুরি।’
বর্তমানে চীনের মোট তেল আমদানির প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইরান থেকে। ইরান কিছু চীনা জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। সংঘাত নিরসনে চীন ও পাকিস্তান পাঁচ দফা প্রস্তাবে জলপথটিতে দ্রুত ‘স্বাভাবিক নৌ চলাচল’ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে সম্ভাব্য একটি বড় অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়ে শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, ইরানের তেল কেনা চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি তিনি বিবেচনা করছেন।
বাণিজ্যযুদ্ধ নিয়ে কি কোনো সমঝোতা হলো
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। তবে আপাতত একধরনের বিরতি চলছে। চীনা পণ্যের ওপর ট্রাম্পের বাড়তি শুল্ক আগামী নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত রয়েছে।
বেইজিং সফর শেষে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি সি চিন পিংয়ের সঙ্গে ‘দারুণ বাণিজ্যচুক্তি’ করেছেন। এর মধ্যে চীনের ২০০টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টিও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারও বলেন, আগামী তিন বছরে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি’ কৃষিপণ্য কিনবে বলে তিনি আশা করছেন।
তবে বোয়িং এখনো এই উড়োজাহাজ চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। আর চুক্তি বাস্তবায়ন হলেও সফরের আগে বাজার বিশ্লেষকেরা যে ৫০০ উড়োজাহাজ কেনার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন, তার তুলনায় এটি অনেক কম।
অন্যদিকে কৃষিপণ্যসহ কোনো বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি চীন সরকার।
বেইজিং সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে যাওয়া মার্কিন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেন সি চিন পিং। এ দলে ছিলেন ইলন মাস্ক ও জেনসেন হুয়াং। বৈঠকের পর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘চীন-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক পারস্পরিক লাভজনক এবং উভয়ের জন্যই ইতিবাচক।’
মাদক ও বিরল খনিজ নিয়ে কী আলোচনা হলো
ট্রাম্প বহুবার চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণঘাতী মাদক ফেন্টানিল ও এর কাঁচামাল প্রবেশে সহায়তা করার অভিযোগ তুলেছেন। এ ইস্যুতে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ এনে গত বছর চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্কও আরোপ করেছিলেন তিনি।
বেইজিং বরাবরই বলে আসছে, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
শুক্রবার হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, ট্রাম্প ও সি চিন পিং যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিল তৈরির কাঁচামালের প্রবাহ বন্ধে অগ্রগতি এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হয়েছেন।
বৈঠকের পর প্রকাশিত কোনো বিবৃতিতেই ফেন্টানিলের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেনি চীন।
অন্যদিকে বিরল খনিজ বা ‘রেয়ার আর্থ’ ইস্যুও যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য বিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, ক্ষেপণাস্ত্র এবং নানা উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রাংশ তৈরিতে এসব খনিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এই খনিজের বাজারে চীনের প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে।
গত বছর চীন এসব খনিজ রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। তবে অক্টোবর মাসে বাণিজ্যযুদ্ধ সাময়িক স্থগিত হওয়ার পর আবার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়।
বৈঠকের পর ট্রাম্প বা সি—কেউই বিরল খনিজ ইস্যু নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেনি। বিশ্লেষকদের মতে, এতে বোঝা যায়, এই প্রশ্নে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি।
শেষ পর্যন্ত কী পাওয়া গেল
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিরোধগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। তবু দুই পক্ষই বেইজিং সফরকে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরেছে। ট্রাম্প সফরকে ‘খুব সফল’ বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে সি চিন পিং এটিকে ‘ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ’ সফর হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হতে পারে—ট্রাম্পের দেওয়া হোয়াইট হাউস সফরের আমন্ত্রণ। ট্রাম্প সি চিন পিংকে আগামী সেপ্টেম্বরে ওয়াশিংটন সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। শুক্রবার চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই নিশ্চিত করেছেন, সি সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন।
এর আগে সর্বশেষ ২০১৫ সালে হোয়াইট হাউস সফর করেছিলেন সি চিন পিং।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্পের বাড়তি শুল্ক আবার কার্যকর হওয়ার আগেই সির ওয়াশিংটন সফরে সম্মত হওয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে—ওয়াশিংটন ও বেইজিং উভয়ই মনে করছে, বাণিজ্য নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব। একই সঙ্গে অন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও কিছু অগ্রগতি হতে পারে।