ঘুটঘুটে অন্ধকার। চারপাশে কাদাপানি। এর মধ্যেই পড়ে থাকা কবির মহরজন কখনো জ্ঞান হারাচ্ছেন, আবার কখনো ক্ষীণ চেতনা ফিরে পাচ্ছেন। নেপালে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যায় ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া একটি সুড়ঙ্গে আটকে পড়ে এভাবেই টানা ৯ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছেন এ নেপালি।
প্রায় অলৌকিকভাবে উদ্ধার পাওয়ার পর অবশেষে হাসপাতালে যখন মহরজনের চেতনা ফিরল, তখন তিনি স্ত্রীকেও চিনতে পারেননি। বিভ্রান্ত অবস্থায় তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, এতক্ষণ কেন তাঁকে একটি বিছানা দেওয়া হয়নি।
গত ২৬ আগস্ট নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকার ওপর একটি হিমবাহের অংশবিশেষ ধসে পড়ে। এতে কাদা ও পানির বিশাল ঢল নামে। ঢলে চাপা পড়ে যাওয়া কয়েক শ জলবিদ্যুৎকর্মীর একজন কবির মহরজন। এ ঘটনায় নেপাল ও প্রতিবেশী দেশ চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বতজুড়ে ১ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এখনো কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ।
মহরজনের সঙ্গে একটি কক্ষে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক বিভাগের ফোরম্যান সঞ্জয় শাহও আটকা পড়েন। কক্ষটিতে বাতাস থাকায় তাঁরা বেঁচে যান বলে জানান উদ্ধার তৎপরতায় নেতৃত্ব দেওয়া অভিজ্ঞ টানেল প্রকৌশলী ও আইনপ্রণেতা শ্রী রাম নেউপানে।
ভয়ংকর সেই দুর্যোগের দিন সকাল সাড়ে ৭টায় (জিএমটি ০১: ৪৫) স্ত্রীকে ফোন করেছিলেন কবির মহরজন। বলেছিলেন, সুড়ঙ্গের ভেতরে যাবেন। তাই ফোনে নেটওয়ার্ক থাকবে না। সেদিন আপার ত্রিশূলী-৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে তাঁর দায়িত্ব পড়েছিল।
প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও কবির মহরজন ও সঞ্জয় শাহকে উদ্ধারের ঘটনা ধ্বংসস্তূপে পরিণত উপত্যকাটির বিভিন্ন স্থানে কাজ করা উদ্ধারকারী দলগুলোকে নতুন করে আশাবাদী করে তুলেছে।
গতকাল সোমবার পর্যন্ত ১২১ জন জলবিদ্যুৎকর্মী এখনো বিভিন্ন সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল। তাঁদের কেউ কেউ হয়তো এখনো জীবিত আছেন, এমন আশা উদ্ধারকর্মীদের উদ্ধার তৎপরতায় নতুন গতি এনেছে।
সেদিন সকালে
ভয়ংকর সেই দুর্যোগের দিন সকাল সাড়ে ৭টায় (জিএমটি ০১: ৪৫) স্ত্রীকে ফোন করেছিলেন কবির মহরজন। সেদিন আপার ত্রিশূলী-৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে তাঁর দায়িত্ব পড়েছিল। তিনি কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে নিতে স্ত্রীকে ফোন করেছিলেন। ফোনে মহরজন বলেছিলেন, ‘আমাকে সুড়ঙ্গের ভেতরে যেতে হবে। ভেতরে কোনো নেটওয়ার্ক থাকবে না।’
এক গভীর হতাশা ধীরে ধীরে আমাকে গ্রাস করছিল। কিন্তু ১৫ ও ১০ বছর বয়সী দুই ছেলের সামনে সাহস ধরে রাখার ভান করে যাচ্ছিলাম।
তার মাত্র ঘণ্টাখানেক পর, প্রায় ২৫ মাইল উজানে লাংটাং লিরুং পর্বতে একটি হিমবাহ ধসে পড়ে। এর ফলে এত শক্তিশালী ভূমিধসের সৃষ্টি হয় যে পানির একটি বিশাল দেয়াল তৈরি হয়ে ভাটির গ্রামগুলো মাটিতে মিশিয়ে দেয়। সঙ্গে ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক কাদাপানিতে তলিয়ে, প্রায় ৯০০ কর্মী-শ্রমিক আটকা পড়েন।
সে সময় রাজধানী কাঠমান্ডুতে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা স্ক্রিনে প্রকল্পগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। হঠাৎ স্ক্রিনে একের পর এক ঘরগুলো অন্ধকার হতে শুরু করে, কন্ট্রোল প্যানেল থেকে স্টেশনগুলো একে একে অদৃশ্য হয়ে যায়।
উদ্ধার তৎপরতার কয়েকটি অংশে নেতৃত্ব দেওয়া নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের প্রকৌশলী সুরজ দহল বলেন, শুরুতে তিনি খুব একটা উদ্বিগ্ন হননি। কারণ, নেপালে বন্যা একটি স্বাভাবিক ঘটনা।
তবে শিগগিরই কর্মকর্তারা বুঝতে পারলেন, পরিস্থিতি মোটেও স্বাভাবিক নয়। ত্রিশূলী ৩ এ প্রকল্পের স্টেশন ম্যানেজার সে সময় বিদেশে থাকায় সুড়ঙ্গের ভেতরে থাকা আনুমানিক ৪০ জন কর্মীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করতে বিদ্যুৎ কর্মকর্তাদের আরও মিনিট দুই লেগে যায়। ততক্ষণে উজানে থাকা অন্তত দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ঢল আঘাত হেনেছে।
হীরা শোভা যখন প্রথম ঢলের কথা শুনলেন, তখন তিনি ধরে নিয়েছিলেন, পাওয়ার হাউসটি নিরাপদেই থাকবে। তিনি স্বামীকে ফোন করলেন, স্বামীর সহকর্মীদের নম্বর ধরে ধরে তাঁদের ফোন করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কেউ ধরলেন না।
সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে মহরজনের স্ত্রী হীরা শোভা স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার ঠিক দুই মিনিট পর কর্মকর্তারা ৩ এ প্রকল্পে চূড়ান্ত নির্দেশ দেন: ‘সরে যান!’
পাওয়ার হাউসের নিয়ন্ত্রণকক্ষে কাজ করা সঞ্জয় পরে উদ্ধারকারীদের বলেন, তিনি এক তলা থেকে আরেক তলায় দ্রুত ছুটে গিয়ে সহকর্মীদের ধরে ধরে সতর্ক করতে থাকেন।
সুড়ঙ্গের বাইরে থাকা শ্রমিকেরা ঢলের পানি থেকে বাঁচতে ছুটে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পানির গতির সঙ্গে পেরে ওঠেননি। কর্মকর্তারা এমন একটি ভিডিও ফুটেজের কথা জানিয়েছেন, যেখানে দেখা যায়, প্রায় ৩০ জন শ্রমিককে তাঁদের উচ্চতার চেয়ে বহু গুণ উঁচু একটি ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
উদ্ধারকাজ শুরুর পর উদ্ধারকর্মীরা ওই সুড়ঙ্গ থেকে বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য একটি মইয়ের সন্ধান পান। দহল বলেন, কর্মীরা সেটির কথা জানলে ভেতরে থাকা দুই-তৃতীয়াংশ কর্মীই প্রাণে বেঁচে যেতেন।
রয়টার্স একটি প্রকৌশল নকশা দেখেছে। তাতে দেখা গেছে, সুড়ঙ্গটির চারটি প্রবেশপথের একটি ১৮০ মিটারেরও বেশি দীর্ঘ হয়ে ভূগর্ভস্থ পাওয়ার হাউসে গিয়ে পৌঁছেছে। উদ্ধারকারীরা শুরুতে ধারণা করেছিলেন, সুড়ঙ্গটি পানিতে পুরোপুরি তলিয়ে গেছে। ফলে সেখানে কেউ বেঁচে থাকতে পারেন, এমন আশা তাঁরা করেননি।
আমরা চিৎকার করে বলতাম, আপনারা কোথায়? এখানে কি কেউ আছেন? কখনো কখনো মনে হতো, সুড়ঙ্গের ভেতরে কেউ জীবিত আছেন এবং আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন।
টানেল প্রকৌশলী শ্রী রাম নেউপানে বরং তুলনামূলক ছোট একটি কেবল ডাক্ট সুড়ঙ্গের দিকে নজর দেন। সুড়ঙ্গটি ঢালু হয়ে ওপরে উঠে গেছে এবং তাতে বন্যার পানি তুলনামূলক কম ছিল। সেখানেই আশ্রয় নিয়েছিলেন কবির মহরজন ও সঞ্জয় শাহ। সুড়ঙ্গটির মুখ থেকে ১৬০ মিটার দূরে ছিল তাঁদের অবস্থান। মহরজন পরে স্ত্রীকে তাঁদের আটকে থাকার জায়গার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘একেবারে কোণায়, সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে।’
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কা
বন্যা ও ভূমিধসের পর ৯ দিন বাতাসভর্তি ওই কক্ষে কবির ও সঞ্জয় বন্দী ছিলেন। সঞ্জয় বলেন, মনোবল ধরে রাখতে তিনি সেখানে প্রার্থনা করতেন। আর কবির তাঁর স্ত্রীকে বলেছেন, কাদাপানির ভেতর শুয়ে থাকার সময় তিনি প্রাণ বাঁচাতে মাঝেমধ্যে সেই পানি অল্প অল্প করে পান করতেন।
হীরা শোভা যখন প্রথম ঢলের কথা শুনলেন, তখন ধরে নিয়েছিলেন, পাওয়ার হাউসটি নিরাপদেই থাকবে। তিনি স্বামীকে ফোন করলেন, স্বামীর সহকর্মীদের নম্বর ধরে ধরে তাঁদের ফোন করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কেউ ফোন ধরলেন না।
পরে কর্মকর্তারা হীরাকে ঘটনাস্থলের ছবি দেখান। একসময় প্রকল্পের প্রবেশপথ যেখানে ছিল, সেটি পলিমাটিতে চাপা পড়েছে। দেখে নদীর খালি তীর মনে হচ্ছে। ছবি দেখে হীরার মনে হয়েছিল, এখানে তাঁর স্বামী কোনোভাবেই বেঁচে থাকতে পারবেন না।
হীরা শোভা বলেন, ‘এক গভীর হতাশা ধীরে ধীরে আমাকে গ্রাস করছিল।’ কিন্তু ১৫ ও ১০ বছর বয়সী দুই ছেলের সামনে তিনি সাহস ধরে রাখার ভান করে যাচ্ছিলেন।
পাহাড়ের বিপক্ষে লড়াই
কর্মকর্তাদের বিশ্বাস ছিল, ধ্বংসস্তূপের নিচে সুড়ঙ্গের ভেতর বিভিন্ন জায়গায় আটকে থাকা বাতাসের পকেট কিছু কর্মীকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান ধরম রাজ উপ্রেতির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুরো উপত্যকাজুড়ে ৭ হাজার ৫০০টিরও বেশি বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে উদ্ধারকারীদের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছিল-কোথায় আগে খনন করে উদ্ধারকাজ শুরু করবেন। এর মধ্যে একটাকে বেছে নেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল।
বৃষ্টি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল। কয়েক রাত ধরে মুষলধারে বৃষ্টিতে খনন করে তৈরি করা গর্ত আবার নতুন করে পানি ও ধ্বংসাবশেষে ভরে যায়। এতে পরিশ্রম মাত্র কয়েক মিনিটে ভেস্তে যায়।
তবে ৩ এ প্রকল্পটি প্রথমেই উদ্ধারকাজ শুরু করার তালিকার ওপরের দিকে ছিল। কারণ, কর্মকর্তারা আশা করছিলেন, বহুতল কাঠামোটির ভেতরে বাতাসের কিছু পকেট তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
দুর্যোগের পর প্রথম তিন দিন ধ্বংসস্তূপ সরাতে জোরেশোরে খননকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। চারটি সুড়ঙ্গই কাদা, পাথর, কাঠ ও নানা ধরনের ধ্বংসাবশেষে নিচে চাপা পড়েছিল। এমনকি ভূমিধসের কারণে সুড়ঙ্গের কিছু অংশ ১৫ থেকে ৩০ মিটার (৪৯ থেকে ৯৮ ফুট) পুরু কাদামাটির স্তরে চাপা পড়ে। উদ্ধারকারীরা ড্রিলিং, নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ও ভারী যন্ত্রপাতির সাহায্যে ধীরে ধীরে সামনে এগোনোর পথ তৈরি করতে শুরু করেন।
ওপর থেকে ড্রিল করে করা ৫ ইঞ্চি ব্যাসের একটি গর্ত সুড়ঙ্গটির সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করলে প্রথম বড় সাফল্য আসে। এতে উদ্ধারকারীরা ঠিক কোন জায়গার দিকে খনন করতে হবে, তার একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবিন্দু পেয়ে যান।
বৃষ্টি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল। কয়েক রাত ধরে মুষলধারে বৃষ্টিতে খনন করে তৈরি করা গর্ত আবার নতুন করে পানি ও ধ্বংসাবশেষে ভরে যায়। এতে পরিশ্রম মাত্র কয়েক মিনিটেই ভেস্তে যায়।
নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির বোর্ড সদস্য আমশু কিরণ শাহি বলেন, সুড়ঙ্গটির চাপা পড়া প্রবেশমুখে পৌঁছাতেই উদ্ধারকারীদের প্রায় ছয় দিন লেগে যায়। সেখানে পৌঁছে তাঁরা জীবিত কেউ আছেন কি না, জানতে চিৎকার করে ডাকাডাকি করেন। কিন্তু কোনো সাড়া পাননি।
বড় সাফল্য
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের খুঁজে পাওয়ার আগের রাতে উদ্ধারকারীরা কাদা আর ধ্বংসস্তূপ আটকে তৈরি হওয়া এমন একটি দেয়ালের সামনে পড়েন, যেটি তাঁরা সরাতে পারছিলেন না। তখন প্রকৌশলী সুরজ দহলের দল নতুন একটি উপায় বের করে। প্রথমে তাঁরা পরীক্ষামূলকভাবে সুড়ঙ্গের প্রায় ১৫ মিটার ওপরে থাকা একটি প্রাকৃতিক জলপথ দিয়ে উচ্চ চাপে পানি প্রবাহিত করেন। এতে মাত্র কয়েক মিনিটে ৪ থেকে ৫ মিটার অংশ পরিষ্কার হয়ে যায়।
এরপর আবার বৃষ্টি নামে। এতে সুড়ঙ্গের একটি অংশ ধসে পড়ে এবং কিছু সময়ের জন্য উদ্ধারকারীরাই সেখানে আটকা পড়েন। কয়েক ঘণ্টা উদ্ধারকাজ বন্ধ থাকে। পরে সহকর্মীরা তাঁদের আবার ভেতরে ফিরে যেতে রাজি করান। এরপর উদ্ধারকারীরা পথটি ধসে পড়া আটকাতে ধাতব পাত ও গ্যাবিয়ন তারের জাল ব্যবহার করেন।
এ জাল হলো মোটা ও শক্ত ধাতব তার দিয়ে তৈরি এক কাঠামো, যা সাধারণত পাথর বা অন্যান্য উপকরণ আটকে রেখে মাটি বা ঢালকে স্থিতিশীল করতে এবং ধস ঠেকাতে ব্যবহার করা হয়।
দুর্যোগের ১০ম দিন ভোর ৪টার দিকে দহলের কাছে একজন অপারেটরের ফোন আসে। তিনি বলেন, উদ্ধারকারীরা কিছু একটা শুনেছেন—একটি শব্দ। সেটা হয়তো কোনো জীবিত মানুষের আওয়াজ। আবার এমনও হতে পারে, অন্ধকারের দিকে ডাকতে থাকা উদ্ধারকারীদের নিজেদের কণ্ঠেরই প্রতিধ্বনি।
ঘটনাস্থলে উদ্ধারকারী দলের নেতৃত্বে থাকা গঙ্গা বরাল বলেন, তাঁরা সুড়ঙ্গে ড্রিল করতে করতে শব্দ শুনতে শুরু করেন। বারবার তাঁরা যন্ত্রগুলোর ইঞ্জিন বন্ধ করে কান পেতে সেই শব্দ শোনার চেষ্টা করেন।
বরাল বলেন, ‘আমরা চিৎকার করে বলতাম, আপনারা কোথায়? এখানে কি কেউ আছেন? কখনো কখনো মনে হতো, সুড়ঙ্গের ভেতরে কেউ জীবিত আছেন এবং আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন।’
উদ্ধারকারীরা কোনো কথাই স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন না। কিন্তু তাঁরা ধারণা করলেন, হয়তো শব্দের উৎস মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিটার দূরেই। এরপর একফালি আলোর মধ্যে তাঁরা একটি হাত দেখতে পেলেন। তাঁদের আর জীবিত ব্যক্তির মাঝখানে তখনো কাদায় আটকে থাকা আরও ৫ থেকে ১০ মিটার সুড়ঙ্গপথ। সকাল ৭টার মধ্যে উদ্ধারকাজে যুক্ত সেনারা সুড়ঙ্গের দেয়ালে একটি ছোট গর্ত তৈরি করতে সক্ষম হন।
ভেতর থেকে ভেসে এল একটি মাত্র শব্দ ‘হুনুহুনচা। মোটামুটি এর অর্থ, ‘আমরা এখানে আছি।’
আলোর পথে
উদ্ধারকারীরা শেষ পর্যন্ত যখন দুজনকে সুড়ঙ্গ থেকে বের করে আনেন, তখন তাঁদের কেউই দাঁড়াতে পারছিলেন না। মুখে কাদা লেগে থাকা সঞ্জয়কে একজন উদ্ধারকারী পিঠে করে বাইরে নিয়ে আসেন। তিনি কোনোভাবে ক্যামেরার দিকে একটি হাত তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। কবিরের আঘাত ছিল গুরুতর। তাঁকে স্ট্রেচারে করে বাইরে আনা হয়।
‘মাম্মি, পাপা ফিরে এসেছে!’—হীরা শোভার দুই ছেলে খবর শুনে এভাবেই চিৎকার করে উঠেছিল।
পরদিন আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নামে আলাদা একটি স্টেশনের একটি সুড়ঙ্গ থেকে চীনা নাগরিক লু হাইতাওকে উদ্ধার করা হয়।
কবিরের পায়ে থাকা গভীর ক্ষতে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। ক্ষতটিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানান তাঁর স্ত্রী।
হীরা শোভা যখন হাসপাতালের কক্ষে ঢোকেন, মহরজন তাঁকে চিনতে পারেননি। তাতে হীরার কিছু যায়-আসে না। স্বামীকে জীবিত ফিরে পেয়েই তিনি ভীষণ খুশি। বলেন, ‘ও নতুন জীবন পেয়েছে।’