স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করে সিডনির পুলিশকে ফোন করেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অভিবাসী

লাশপ্রতীকী ছবি

অস্ট্রেলিয়ার সিডনির দক্ষিণ-পশ্চিমের শহর ক্যাম্পবেলটাউনের এক বাড়িতে গত সোমবার রাতে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে খুন করেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক ব্যক্তি। দুই সন্তানই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু। কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনার পর এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে স্থানীয় পুলিশ বলছে।

আজ মঙ্গলবার বিকেলে ঘটনাস্থল ক্যাম্পবেলটাউনের রেমন্ড অ্যাভিনিউতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটির সামনে পুলিশ অবস্থান করছে। ফরেনসিক তদন্তকারীরা ভেতরে-বাইরে ব্যস্ত। পাশের বাড়িগুলোর বাসিন্দারা নির্বাক, নিশ্চুপ। কেউ কেউ ফুল এনে রাখছেন বাড়ির সামনে। তাঁদের চোখে-মুখে অবিশ্বাসের ছায়া।

পুলিশ জানায়, সোমবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিটের দিকে ক্যাম্পবেলটাউন পুলিশের কাছে জরুরি সেবা নম্বরে একটি ফোন আসে। ফোনে অপর প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি অপারেটরকে বলেন, ‘আমি আমার সন্তান আর স্ত্রীকে ছুরি দিয়ে হত্যা করেছি।’

সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাড়ির বিভিন্ন কক্ষে তিনটি মরদেহ খুঁজে পায়। তাঁদের একজন ৪৬ বছর বয়সী এক নারী এবং তাঁর ১২ ও ৪ বছর বয়সী দুই সন্তান। তিনজনের শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল।

পুলিশের ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট মাইকেল মোরোনি বলেন, এটি ছিল তাঁর কর্মজীবনে দেখা অন্যতম ভয়াবহ নৃশংস অপরাধ। নিহত নারী ও শিশুদের শরীরে যে মাত্রার জখম, তার বিস্তারিত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।

ঘটনাস্থল থেকেই ৪৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। পরে পারিবারিক সহিংসতার তিনটি হত্যা মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়েছে। আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার গণমাধ্যম তাঁর নাম প্রকাশ করছে না। তবে বাংলাদেশি কমিউনিটির সূত্র থেকে ওই ব্যক্তির নাম–পরিচয় জানা গেছে। ফেসবুকেও তাঁর ছবি ছড়িয়ে পড়েছে।

কয়েক মাসের পরিকল্পনা

পুলিশ বলছে, এই হত্যাকাণ্ড কোনো আকস্মিক ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ছিল না। অভিযুক্ত ব্যক্তি বেশ কয়েক মাস ধরে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় স্ত্রী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন দুই সন্তানকে হত্যা সংঘটিত করেছেন বলে পুলিশের অভিযোগ।

পুলিশ জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পার্থে একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল। একজোড়া দম্পতি তাঁদের দুই প্রতিবন্ধী সন্তানকে হত্যার পর নিজেরাও আত্মহত্যা করেন। সেই সংবাদটি পড়ার পর থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিও একই পথে যাওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেন।

পুলিশ এ–ও উল্লেখ করেছে, ২০২৪ সালে ওই ব্যক্তির ক্যানসার ধরা পড়েছিল। ২০২৫ সালের শুরুতে তিনি সুস্থ হলেও বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। নিহতদের মা একজন কর্মজীবী ছিলেন এবং পরিবারটি প্রায় এক দশক আগে বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিল।

আদালতে সংক্ষিপ্ত শুনানি

মঙ্গলবার সকালে ক্যাম্পবেলটাউন স্থানীয় আদালতে সংক্ষিপ্ত শুনানি হয়। সেখানে আসামিকে সশরীর হাজির করা হয়নি। তাঁর পক্ষ থেকে জামিনের কোনো আবেদনও করা হয়নি। আগামী জুলাই মাসে পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। যৌথভাবে তদন্ত পরিচালনা করছে ক্যাম্পবেলটাউন গোয়েন্দা বিভাগ ও রাজ্যের হোমিসাইড স্কোয়াড।

আদালত প্রাঙ্গণে অভিযুক্তের আইনজীবী জাওয়াদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক পরিস্থিতি। আমার মক্কেল পুলিশি হেফাজতে চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন। মামলা নিয়ে এই মুহূর্তে আমরা কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমার মক্কেল দোষী প্রমাণিত হওয়া পর্যন্ত নিরপরাধ থাকার অধিকার রাখে।’

আরও পড়ুন

বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোক

ক্যাম্পবেলটাউন এলাকায় বাংলাদেশিদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। শহরের সিটি কাউন্সিলে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তিনজন কাউন্সিলরও রয়েছেন। মঙ্গলবার সারা দিন তাঁদের ফোনে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। কমিউনিটির কাছ থেকে, গণমাধ্যম থেকে, সবার একই প্রশ্ন—কীভাবে এ ঘটনা ঘটল?

কাউন্সিলর মাসুদ চৌধুরী এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে আমরা অত্যন্ত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করি। তবু এমন ঘটনা ঘটল। আমি মনে করি, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক না টিকলে বিচ্ছেদ অনেক ভালো সমাধান। কিন্তু এভাবে পরিবারের সবাইকে শেষ করে দেওয়া—এটা কোনো সমাধান নয়।’

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মনোবিজ্ঞানী জন মার্টিন প্রথম আলোকে বলেন, অভিবাসীদের জীবনের সংগ্রামটা অনেকেই বোঝেন না। নতুন দেশ, নতুন ভাষা, নতুন সামাজিক নিয়মকানুন—এই চাপ সামলাতে গিয়ে অনেকেই একসময় ভেতর থেকে ভেঙে পড়েন।

আরও পড়ুন

মার্টিন বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় সাধারণ চিকিৎসক থেকে শুরু করে সমাজকর্মী, মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শদাতা—বিনা মূল্যে নানা ধরনের সহায়তা পাওয়া যায়। কিন্তু অনেকে লোকলজ্জায় কিংবা অজ্ঞতায় এই সাহায্য নেন না। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের সার্বক্ষণিক পরিচর্যার চাপ যেকোনো মানুষকেই ভেঙে দিতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিউনিটির এক ব্যক্তি বলেন, এটা শুধু একটা পারিবারিক বিপর্যয় নয়, এটা এনডিআইএস এবং প্রতিবন্ধী সেবাব্যবস্থার চরম ব্যর্থতাও। অটিজমে আক্রান্ত দুটি শিশু নিয়ে একা একজন মানুষ বছরের পর বছর লড়াই করেছেন। তাঁর আরও পরিচর্যা প্রয়োজন ছিল।

অন্যদিকে নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রিমিয়ার ক্রিস মিন্স এই হত্যাকাণ্ডে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, মানুষ যেমন স্তম্ভিত, তিনিও তেমনই মর্মাহত। আগামী জুনের রাজ্য বাজেটে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে আরও বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

আরও পড়ুন