উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে কিম পরিবার কি আবারও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে
উত্তর কোরিয়া সম্ভবত একটি উত্তেজনাপূর্ণ পারিবারিক দ্বন্দ্বের দিকে এগোচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার দাবি অনুযায়ী, শিগগিরই দেশটির সম্ভাব্য উত্তরসূরি বা পরবর্তী নেতা হিসেবে কিম জং–উনের কিশোরী মেয়ে কিম জু আয়ের নাম ঘোষণা করা হতে পারে।
যদি তা–ই হয়, তবে ভবিষ্যতে ক্ষমতার লড়াইয়ে আয়েকে তার প্রভাবশালী ফুফু কিম ইয়ো জংয়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে হতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনআইএস) গত সপ্তাহে দেশটির পার্লামেন্ট সদস্যদের বলেছিল, কয়েক দিনের মধ্যেই বাবার উত্তরসূরি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে কিম জু আয়ের নাম ঘোষণা হতে চলেছে। কিশোরী আয়ের বয়স ১৩ বছরের আশপাশে।
এ মাসের শেষ দিকে উত্তর কোরিয়ার দলীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জু আয়ে ওই কংগ্রেসে উপস্থিত হয় কি না, তার ওপর নজর রাখছে এনআইএস। উত্তর কোরিয়ায় এটাই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সমাবেশ, প্রতি পাঁচ বছর পরপর সেখানে দলীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়।
সাধারণত দলীয় কংগ্রেসে পিয়ংইয়ং পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য নিজেদের বৈদেশিক নীতি, যুদ্ধ পরিকল্পনা, পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাসহ অগ্রাধিকারমূলক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
২০২২ সালে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জু আয়েকে প্রথম দেখা যায়। সেবার তাকে বাবার হাত ধরে উত্তর কোরিয়ার সর্বাধুনিক আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরিদর্শন করতে দেখা গিয়েছিল।
এর পর থেকে বাবা কিম জং–উনের সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে আয়েকে দেখা গেছে। এমনকি গত বছর সেপ্টেম্বরে কিম জং–উনের চীন সফরের সময়ও সঙ্গী হয়েছিল আয়ে।
রক্ষণশীল ও পুরুষপ্রধান নেতৃত্বের দেশ উত্তর কোরিয়ার একজন মেয়ে নেতা হতে পারেন কি না, তা নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা বহুদিন ধরেই সংশয় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু কিম জু আয়ের ঘন ঘন প্রকাশ্যে আসা তাঁদের সেই ধারণাকে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে।
এর আগে এনআইএস তাদের একটি মূল্যায়নে বলেছিল, কিম জু আয়েকে চীনে নিয়ে যাওয়া সম্ভবত উত্তরসূরি হিসেবে জনমনে তার গ্রহণযোগ্যতা গড়ে উঠতে সহায়তা করেছে।
যে চ্যালেঞ্জ আসতে পারে
কিম জু আয়েকে উত্তরসূরি করার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ আসতে পারে কিম জং–উনের বোন কিম ইয়ো জংয়ের পক্ষ থেকে। ৩৮ বছর বয়সী কিম ইয়ো জং উত্তর কোরিয়ায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হন। রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে তাঁর পক্ষে শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে।
কিম ইয়ো জং বর্তমানে কোরিয়ার ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে একটি উচ্চ পদে আছেন এবং ভাইয়ের ওপর তাঁর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে বলে জানা গেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক উচ্চপদস্থ গোয়েন্দা কর্মকর্তা রাহ জং ইল উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতার ‘সম্ভাব্য’ লড়াই নিয়ে আগেই সতর্ক করেছিলেন। নিউইয়র্ক পোস্ট তাঁর বরাত দিয়ে বলেছিল, যদি কিম ইয়ো জং মনে করেন তাঁর সুযোগ আছে, তিনি শীর্ষ পদ দখলের চেষ্টা করবেন।
রাহ দ্য টেলিগ্রাফকে বলেছিলেন, ‘এটা সময়ের ওপর নির্ভর করছে। তবে আমার বিশ্বাস, যদি কিম ইয়ো জং মনে করেন যে শীর্ষ নেতা হওয়ার সুযোগ তাঁর আছে, তবে তিনি সে সুযোগ নেবেন। তাঁর জন্য নিজের রাজনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোনো বাধা নেই।’
উত্তর কোরিয়ার ভেতরে ও বাইরে কিম ইয়ো জংয়ের কঠোর ও আপসহীন একটি ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। প্রতিপক্ষকে নিয়ে তীক্ষ্ণ মন্তব্য করার জন্য তিনি পরিচিত এবং মাঝেমধ্যেই নিজের নামে বিবৃতি দেন।
উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের ওয়েবসাইট ‘৩৮ নর্থ’–এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে সম্ভাব্য ‘অস্থিরতায়’ কিম জং উনের হঠাৎ মৃত্যুর ক্ষেত্রে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল।
বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনটিতে গুরুত্ব দিয়ে আরও বলা হয়েছিল, কিম জং–উন ও তাঁর সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘কিম জং–উনের হঠাৎ মৃত্যু বা গুরুতর অসুস্থতার মতো পরিস্থিতিতে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও কিম ইয়ো জংয়ের মতো রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রার্থীদের সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’
বিপরীতে অন্যান্য সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীর মধ্যে কিম জু আয়ে ও তাঁর দুই ভাই (ধরা হচ্ছে) আছে বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল। তবে সে সঙ্গে এটাও বলা হয়েছিল, তারা এখনো খুবই ছোট এবং রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই আগামী ৫ থেকে ১৫ বছর বাস্তবসম্মতভাবে উত্তরাধিকারী হিসেবে তাদের বিবেচিত হওয়া সম্ভব নয়।
রক্তাক্ত পারিবারিক ইতিহাস
উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে পরিবারের ভেতর রক্তপাতের ইতিহাস পুরোনো। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর কিম জং–উন তাঁর চাচা ও একসময়ের পরামর্শদাতা (মেন্টর) জাং সং থাকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেন। ২০১৩ সালে তাঁকে ‘পার্টিবিরোধী, বিপ্লববিরোধী ও দলবিরোধী কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ‘ফায়ারিং স্কোয়াডে’ তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
কিম জং–উনের সৎভাই কিম জং–নমকেও হত্যা করা হয়েছে। একসময় কিম জং–নমকে উত্তর কোরিয়ার ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী বিবেচনা করা হতো। ২০১৭ সালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুই নারী কিম জং–নমের মুখে মারাত্মক বিষাক্ত নার্ভ এজেন্ট ‘ভিএক্স’ মেখে দেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়।