বিজ্ঞাপন

চীন সাধারণত তাদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিষয়ে কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে থাকে। কিংবা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের কোনো পক্ষ ভূমিকা রাখলে, হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করলে চীনের জবাব বেশ রূঢ় হয়। তবে দেশটির এমন কঠোর অবস্থান, রূঢ় ভাষা ইদানীং নিজ সীমানা ছাড়িয়ে অন্য দেশগুলোর প্রতিও দেখা যাচ্ছে। যার সাম্প্রতিক উদাহরণ কোয়াড নিয়ে বাংলাদেশের প্রতি সতর্কবার্তা।

সত্তরের দশকের শেষের দিকে যখন দেং জিয়াওপিং চীনে অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করেন, ধীরে ধীরে অর্থনীতি উন্মুক্ত করতে থাকেন, তখন থেকে দেশটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় জোর দিতে শুরু করেছিল। ওই সময় থেকে বেইজিংয়ের কূটনীতির অন্যতম লক্ষ্য ছিল বন্ধুত্বের বিস্তার। বন্ধুর মন জয় করা এবং মানুষের মধ্যে প্রভাব বাড়ানো। তবে বর্তমান প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের হাত ধরে চীনা কূটনীতিকেরা বেইজিংয়ের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়, এমন কিংবা সাম্প্রতিক কোনো বৈশ্বিক ইস্যুতে কড়া প্রতিক্রিয়া জানানোর সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট পেয়েছেন।

দেং জিয়াওপিংয়ের ওই তুলনামূলক কোমল কূটনীতি থেকে সরে এসে সি চিন পিংয়ের বর্তমান চীনা প্রশাসন একুশ শতকে ‘উলফ ওয়ারিয়র ডিপ্লোমেসি’ এগিয়ে নিচ্ছে। এ কূটনৈতিক ধারার অন্যতম একক হলো, স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার সম্ভাবনা দেখলেই প্রকাশ্যে কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানানো। এর আগে ভারত সরকারও চীনের পক্ষ থেকে রূঢ় প্রতিক্রিয়া শুনেছে। বিশেষত দোকলাম ও লাদাখে সাম্প্রতিক সীমান্ত সংঘাতে বেইজিং এ কূটনৈতিক কৌশলের প্রয়োগ করেছে। ওই সময় চীনা সরকারি গণমাধ্যম নতুন ও সৃজনশীল উপায়ে ভারতের সমালোচনায় মেতেছিল।

তবে দিল্লির এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকলেও উপমহাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর তা ছিল না। ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলো বেইজিংয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে, চলছে। এখন তারাও বেইজিংয়ের এমন রূঢ় কূটনৈতিক আচরণের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করেছে। লি জিমিং নিশ্চিত জানতেন, কোয়াড বাংলাদেশকে জোটের সদস্য হতে আমন্ত্রণ জানায়নি। কেননা, চীন সরকার এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো নীতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে থাকে। কাজেই কোয়াডের কার্যক্রম বেইজিংয়ের নিয়মিত নজরদারিতে থাকার কথা। এরপরও কড়া ভাষায় সতর্ক করার মধ্য দিয়ে চীনা রাষ্ট্রদূত কোয়াড নিয়ে ঢাকার সামনে একটি সীমারেখা (রেড লাইন) টেনে দিয়েছেন।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো দীর্ঘদিন থেকে চীনকে মূলত আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারতের প্রভাবে ভারসাম্য আনতে দেখেছে। দিল্লির বিপরীতে কার্যত বিনা মূল্যে সহায়তার ডালা নিয়ে হাজির হয়েছে বেইজিং। এখন যদি চীন এ অঞ্চলে আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করতে শুরু করে, তবে বেইজিংয়ের ওপর ভরসা করার আরও দৃশ্যমান মূল্য দিতে হতে পারে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে।

সাম্প্রতিক সময়ের ঈর্ষনীয় অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা এবং বঙ্গোপসাগর ঘিরে কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের প্রতি চীনের সচেতন নজর রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক সংযুক্তি, ক্রমবিকাশমান কৌশলগত সহযোগিতামূলক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক চীন পর্যবেক্ষণে রেখেছে। এমনকি ঢাকার সঙ্গে ওয়াশিংটন ও টোকিওর সহযোগিতা বৃদ্ধির মনোভাব চীনের দৃষ্টি এড়ায়নি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও চীনের উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে সমর্থন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও জাপানের জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগের দুয়ার খুলে রেখেছে ঢাকা।

কোয়াডে অংশ নেওয়া নিয়ে লি জিমিংয়ের মন্তব্য ভবিষ্যতে ইন্দো-প্যাসিফিক সহযোগিতার পথে পা বাড়াতে বাংলাদেশকে নতুন করে ভাবাবে। এমন আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা চীনের কৌশলগত কূটনীতির অন্যতম অংশ। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। ওই সময় বঙ্গোপসাগরে চার দেশের (যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুর) উদ্যোগে মালাবার মহড়ার বার্ষিক আসর বসেছিল। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু হওয়া এই মহড়ায় ২০০৭ সালে প্রথমবারের মতো যুক্ত হয় ভারত। ওই মহড়াকে ‘এশিয়ান ন্যাটো’ গঠনের সূচনা বলে আগাম মন্তব্য করেছিল চীনের গণমাধ্যম।

কূটনৈতিক চ্যানেলে সংশ্লিষ্ট পাঁচটি দেশের কাছে ওই সামরিক মহড়া নিয়ে নিজেদের আপত্তির বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল বেইজিং। ভারতে চীন–সমর্থিত বাম দলগুলো বিক্ষোভ দেখিয়েছিল। চাপের মুখে তখনকার ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে অ্যান্টনি অন্য দেশের সঙ্গে বহুপক্ষীয় সামরিক মহড়া সাময়িক বাতিল করার পথে হেঁটেছিলেন।
চীনের আপত্তি ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক নীতিতে প্রভাব ফেলে। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরের পরবর্তী সময়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করে দিল্লি। মালাবার মহড়া অনেকটা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে চলে যায়। যদিও মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১৫ সালে জাপান ও ২০২০ সালে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও সামরিক সহযোগিতার সম্পর্ক জোরদার করে ভারত।

রাষ্ট্রদূত লির বক্তব্যে বেইজিংয়ের মনের কথাই প্রকাশ পেয়েছে। সেটা হলো, কোয়াড একটি ক্ষুদ্র ভূরাজনৈতিক জোট এবং এ জোট চীনকে আলাদা রেখে এশিয়ায় বিভক্তি আনতে চায়। এ কারণে কোয়াডের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সম্পৃক্ততা চীন ভালো চোখে দেখে না। এমন তৎপরতা প্রতিরোধ করাকে সর্বোচ্চ কৌশলগত অগ্রাধিকার দেয় বেইজিং।

এখন প্রশ্ন হলো, সি চিন পিংয়ের এমন আগ্রাসী কূটনীতি দক্ষিণ এশিয়ার জন্য কী অর্থ বহন করছে? উপমহাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও কূটনীতিতে দুটো বড় পক্ষ চীন ও ভারত। প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি ভারত অনেকটাই রাখঢাক রেখে কর্তৃত্বপূর্ণ আচরণ করে। ঐতিহাসিকভাবে ভারত এ নীতি বাস্তবায়ন করে আসছে। তবে এ অঞ্চলে চীনা কূটনীতির কৌশল পর্দার বাইরে আসতে শুরু করেছে, যা তুলনামূলক নতুন পরাশক্তি হিসেবে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ রক্ষায় চীনকে অনেকটাই এগিয়ে দেবে।

default-image

দিল্লি বরাবর দক্ষিণ এশিয়ায় বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মধ্যস্থতা করে—আঞ্চলিক অভিজাতদের মধ্যে এমন একধরনের চাপা ক্ষোভ রয়েছে। এর বিপরীতে চীনের হস্তক্ষেপবিরোধী মনোভাব তুলনামূলক ভালো বিকল্প হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলেন তাঁরা। তবে ঢাকার প্রতি চীনের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তা তাঁদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে চীনের কৌশলগত কূটনীতি এ অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি কত দিন ধরে রাখবে, সেটাও ভাবার বিষয়।

ভারতের প্রতিবেশীদের একটি সাধারণ অভিযোগ রয়েছে—অর্থনৈতিক প্রকল্প এগিয়ে নিতে দিল্লির সক্ষমতা সীমিত। এ ক্ষেত্রে চীনের সম্পৃক্ততা তুলনামূলক দ্রুত ও কার্যকর। তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনা সহযোগিতা শর্তহীন নয়। অনেক সময়ই শর্তের বেড়াজাল সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর স্বার্থের বিপরীতে যায়। তবে দক্ষিণ এশিয়ার অভিজাতদের জন্য ভারতের রাজনৈতিক মহলে প্রবেশের অনেক বিকল্প রাস্তা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে প্রতিবেশীদের নিয়ে দিল্লির মনোভাব ও নীতির ধরন বোঝা অনেকটা সহজ হয়। এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলো অচিরেই বুঝতে পারবে, সি চিন পিংয়ের আমলে চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের জন্য সেই সুযোগ রাখেনি।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো দীর্ঘদিন থেকে চীনকে মূলত আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারতের প্রভাবে ভারসাম্য আনতে দেখেছে। দিল্লির বিপরীতে কার্যত বিনা মূল্যে সহায়তার ডালা নিয়ে হাজির হয়েছে বেইজিং। এখন যদি চীন এ অঞ্চলে আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করতে শুরু করে, তবে বেইজিংয়ের ওপর ভরসা করার আরও দৃশ্যমান মূল্য দিতে হতে পারে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে।

ভারত কিংবা চীনের সঙ্গে শক্তিশালী মিত্রতার পরও দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলোকে নিজ প্রভাবে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, রাশিয়া দর–কষাকষি বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বিতর্ক এটা মনে করিয়ে দিয়েছে যে এ প্রক্রিয়াকে খুব একটা সহজ হতে দেবে না বেইজিং। বিষয়টি এই অঞ্চলের দেশগুলোকে নিজেদের মতো করে নতুনভাবে ভাবার খোরাক জুগিয়েছে।

* সি রাজা মোহন: ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের পরিচালক এবং কন্ট্রিবিউটিং এডিটর অন ফরেন অ্যাফেয়ার্স, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

সংক্ষেপিত অনুবাদ: অনিন্দ্য সাইমুম।

চীন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন