দ্য গার্ডিয়ানের এক্সপ্লেইনার
চাগোস দ্বীপপুঞ্জ কোথায়, যুক্তরাজ্য কেন দ্বীপগুলো মরিশাসকে ফিরিয়ে দিচ্ছে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালের এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, মরিশাসের কাছে চাগোস দ্বীপপুঞ্জ ফিরিয়ে দিলে সেটা যুক্তরাজ্যের জন্য ‘চরম বোকামির’ কাজ হবে। তিনি দাবি করেন, এতে ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড নেওয়াটা তাঁর জন্য আরও জরুরি হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাজ্যের বিরোধী দলীয় নেতা কেমি ব্যাডেনক ও নাইজেল ফারাজ মরিশাসের সঙ্গে এই চুক্তির ব্যাপারে ট্রাম্পের সমালোচনাকে সমর্থন জানিয়েছেন। চুক্তিটি এখন অনুমোদনের জন্য যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে তোলা হবে। ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখল চেষ্টার বিরোধিতা করায় তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের যে হুমকি দিয়েছেন, এই দুজন নেতা অবশ্য সেটার সমালোচনা করেছেন।
চাগোস দ্বীপপুঞ্জ কী
চাগোস দ্বীপপুঞ্জ ভারত মহাসাগরে অবস্থিত। যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল থেকে ৫ হাজার ৮০০ মাইল দূরে এর অবস্থান আর মরিশাস থেকে দ্বীপটির দূরত্ব ১ হাজার ২৫০ মাইল। ফরাসি সেনাপতি নেপোলিয়নের পরাজয়ের পর ১৮১৪ সালে প্যারিস চুক্তির আওতায় মরিশাস ও চাগোস দ্বীপপুঞ্জ যুক্তরাজ্যের অধীন আসে।
১৯৬৫ সালে দ্বীপপুঞ্জটি ব্রিটিশ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়। মরিশাস থেকে এটাকে আলাদা করা হয়। এর তিন বছর পর ১৯৬৮ সালে যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে মরিশাস। তখন চুক্তি হয়েছিল প্রতিরক্ষার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে যুক্তরাজ্য দ্বীপপুঞ্জটি মরিশাসের কাছে ফিরিয়ে দেবে।
চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে বড় দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়া। সেখানে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি যৌথ সামরিক ঘাঁটি আছে। এটি তৈরির সময় অনেক বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হন, যাঁদের মরিশাস ও সেশেলসে পুনর্বাসন করা হয়। ২০০২ সালে কিছু মানুষকে যুক্তরাজ্যেও স্থানান্তর করা হয়।
দ্বীপগুলো কেন এখন মরিশাসকে ফেরত দেওয়া হচ্ছে
চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে মরিশাসের বিরোধ অর্ধশতাব্দীর বেশি পুরোনো। ১৯৮০-এর দশক থেকে মরিশাস দ্বীপগুলোর ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি জানিয়ে আসছে। বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য মরিশাস আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের (আইসিজে) শরণাপন্ন হয়েছিল।
২০১৯ সালে জাতিসংঘের প্রধান বিচারিক সংস্থা আইসিজে একটি রায় দেন, যেটি মানা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। এতে বলা হয়, ১৯৬৮ সালে মরিশাসকে স্বাধীনতা দেওয়ার সময় উপনিবেশমুক্ত করার প্রক্রিয়া আইনগতভাবে সম্পূর্ণ হয়নি। রায়টি বলে, যথাসম্ভব দ্রুত চাগোস দ্বীপপুঞ্জের শাসনভার ছেড়ে আসতে যুক্তরাজ্য দায়বদ্ধ।
চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে বড় দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়া। সেখানে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি যৌথ সামরিক ঘাঁটি আছে।
তারপর কী হলো
ঋষি সুনাকের নেতৃত্বাধীন কনজারভেটিভ সরকার ২০২২ সালে ঘোষণা দেয়, যুক্তরাজ্য ও মরিশাস চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব–সংক্রান্ত আলোচনা শুরু করতে একমত হয়েছে। বলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক আদালতে ক্রমাগত মামলার ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষার জন্য সবচেয়ে ভালো হবে চাগোস দ্বীপপুঞ্জের আইনি অধিকারের নিশ্চিয়তা।
যুক্তরাজ্য সরকার বলেছিল, এই বোঝাপড়া দিয়েগো গার্সিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি কার্যকরভাবে চালু রাখার নিশ্চয়তা দেবে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসের সাধারণ নির্বাচনের আগে মরিশাসের সঙ্গে ১১ দফা বৈঠক করে কনজারভেটিভ সরকার। ওই বছরের গ্রীষ্মের নির্বাচনে লেবার পার্টি জয়ী হওয়ার পর ৩ অক্টোবর দুই দেশ একটি যৌথ বিবৃতি দেয়। এতে বলা হয়, তারা একটি রাজনৈতিক চুক্তি গঠনে একমত হয়েছে।
২০২৫ সালের ২২ মে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও মরিশাসের প্রধানমন্ত্রী নাভিন রামগুলাম আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটি অনুমোদন ও স্বাক্ষর করেন।
স্টারমার বলেন, চুক্তিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মরিশাস যদি আইনগত ব্যবস্থা নিত, তাহলে যুক্তরাজ্যের সফল হওয়ার সম্ভাবনা থাকত না। যুক্তরাজ্যকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নিতে আদেশ দেওয়া হতে পারত।
যুক্তরাজ্য এমন আদেশ উপেক্ষা করতেই পারত, কিন্তু চীন বা অন্য কোনো দেশকে পাশের দ্বীপগুলোতে ঘাঁটি স্থাপন করা অথবা দিয়েগো গার্সিয়ার কাছে যৌথ মহড়া করা থেকে বিরত করতে পারত না। চুক্তি ছাড়া তেমনটা করার আইনি ভিত্তি তাদের থাকত না, এমনটাই দাবি করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া কী হলো
ট্রাম্প প্রশাসন প্রথমে চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, চুক্তিটি বিস্তারিত পর্যালোচনা করে তারা মনে করছে এটি দিয়েগো গার্সিয়ায় যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক ঘাঁটির দীর্ঘমেয়াদি, স্থিতিশীল এবং কার্যকরী তৎপরতা নিশ্চিত করেছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওভাল অফিসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, তিনি চুক্তিটিকে সমর্থন করার পক্ষে আছেন। তাঁর কাছে মনে হচ্ছে এটি খুব ভালো সমাধান হবে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসের সাধারণ নির্বাচনের আগে মরিশাসের সঙ্গে ১১ দফা বৈঠক করে কনজারভেটিভ সরকার।
ব্যাডেনকের নেতৃত্বাধীন কনজারভেটিভ পার্টি এ চুক্তির সমালোচনা করেছে। তারা এটিকে যুক্তরাজ্যের আত্মসমর্পণ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের যুক্তি, সরকার চাগোসকে মরিশাসের কাছে হস্তান্তর করছে এবং ৩০ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি অর্থ দিয়েছে। অথচ মরিশাস প্রকাশ্যেই চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ।
চুক্তির শর্তগুলো কী
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব মরিশাসের কাছে হস্তান্তর করবে। তবে শর্ত হলো যুক্তরাজ্য আগামী ৯৯ বছরের জন্য দিয়েগো গার্সিয়ার ইজারা পাবে, যেটা আরও বাড়ার সুযোগ থাকবে। এই প্রথম পর্বের জন্য বার্ষিক ইজারামূল্য দাঁড়াবে ১০১ মিলিয়ন পাউন্ড। যুক্তরাজ্য এটা মরিশাসকে দেবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন অবস্থান বদলালেন
গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে গ্রিনল্যান্ড দখলে বিরোধিতা করা ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ায় ট্রাম্পের সমালোচনা করেন কিয়ার স্টারমার। তিনি বলেন, মিত্রদেশগুলোর বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়া ভুল কাজ। স্টারমার তারপর ট্রাম্পকে ফোনও করেছিলেন, তবে মনে হচ্ছে আলাপটা সুবিধার হয়নি। কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে, কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রুথ সোশ্যালে চাগোস প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্য সম্পর্কে মন্তব্যটি করেন ট্রাম্প।